যে অফিসাররা আমাকে এই রিপোর্ট দিলেন তাঁরা এই বলিয়া আমাকে তসল্লি দিলেন, লোকটা স্বভাবতঃই অমন গাল-গল্পী; ওর কথা যেন আমি সিরিয়াসলি না নেই। তাঁদের তসল্লির দরকার ছিল না। সিরিয়াসলি নিবার কোনও উপায় ছিল না। মিনিস্টাররা কি সত্যই অমন নিরুপায়?
কথায় বলে ‘নিরুপায়ের উপায় আল্লা’। আমার বেলায় তাই হইল। এই সময় আমি পরপর কতকগুলি বেনামী পত্ৰ পাইলাম। তার মধ্যে নামে-যাদে জাহাজের মালিকদের শয়তানির বিস্তারিত বিবরণ থাকিত। উহাদের বিরুদ্ধে স্টেপ নেওয়ার অনুরোধ থাকিত। অতীতে কোনও মন্ত্রী বা অফিসার এসব শয়তানি রোধ করিতে পারেন নাই, আমিও পারিব কিনা, সে সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করিয়া আমাকে রাগাইবার চেষ্টা থাকিত। এইসব পত্রের মধ্যে দুইটির কথা আমার আজও মনে আছে। একটিতে ছিলঃ উক্ত বড় মালিকের ফলানা নামে একটি জাহাজ করাচি বন্দরে বহুদিন অকেজো পড়িয়া আছে, যদিও কাগযে-পত্রে মাঝে-মাঝেই উহাকে চালু দেখান হইয়াছে। তদন্তু কমিশনের খবর পাইয়া এই জাহাজখানাকে মেরামতের নামে ফলানা তারিখে করাচি বন্দর ত্যাগ করিয়া বোম্বাই মুখে রওনা করান হইবে। আর ফিরিয়া আসিবে না। পথে সমূদূরে আত্মহত্যা (স্কাটল) করিয়া জাহাজ ডুবির রিপোর্ট দিবে এবং সরকার ও ইনসুরেন্স কোম্পানির কাছে বিপুল ক্ষতিপূরণ আদায় করিবে। এটা বন্ধ করা দরকার। খুব গোপনীয়ভাবে কাজ করিতে হইবে। জানাজানি হইলে সব ব্যর্থ হইবে। নির্ধারিত দিনের আগেই ওটাকে সরান হইবে। ইহাই পত্রের সারমর্ম। পত্রখানি ‘ব্যক্তিগত’ মার্ক করিয়া আমার নামে দেওয়া হইয়াছিল। কাজেই অফিসারেরা কেউ খোলেন নাই।
আমি নৌবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এ্যাডমিরাল চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করিয়া ইতিমধ্যে একটা তদন্ত কমিশন বসাইয়াছিলাম। কমিশনের রিপোর্টের আশায় অপেক্ষা করিতেছিলাম। যথাসাধ্য গোপনীয়তা রক্ষা করিয়া বাণিজ্য দফতরের সেক্রেটারি মিঃ আযিয় আহমদের সহিত গোপনে পরামর্শ করিলাম। সব ব্যাপারে আমরা একমত হইলাম। তিনি সেখানে বসিয়াই একটি অর্ডার শিটে কন্ট্রোলার-অব-শিপিং-এর উপর একটি যাত্রী অর্ডার লিখিলেন। তাতে উক্ত জাহাজের নামোল্লেখ করিয়া পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে করাচি বন্দর ত্যাগ করিতে না দেওয়ার আদেশ দেওয়া হইল এবং তাতে আমার অনুমোদন লইয়া সেক্রেটারি সাহেব আমার পার্সনাল স্টাফ ডাকিয়া ‘আর্জেন্ট ইমিডিয়েট’ ‘মোস্ট ইমিডিয়েট’ ‘স্ট্রিক্টলি কনফিডেনশিয়াল’ ‘স্পেশ্যাল ম্যাসেঞ্জার’ ইত্যাদি অনেক রকমের বড় বড় স্ট্যাম্প মারিয়া গালামোহর করাইয়া ‘স্পেশাল ম্যাসেঞ্জার’ মারফত ডেলিভারি দিবার ব্যবস্থা করিলেন। আমি সেক্রেটারি সাহেবের ক্ষিপ্র নিপুণতার তারিফে প্রশংসমান দৃষ্টিতে তাঁর দিকে চাহিয়া রহিলাম।
তিনি ঐ কাজ শেষ করিলে আমি এই পত্ৰখানাও অমনভাবে স্পেশাল ম্যাসেঞ্জার মারফত এডমিরাল চৌধুরীর নিকট পাঠাইয়া দিবার অনুরোধ করিলাম। কথাটা তিনি খুব পসন্দ করিলেন। কিন্তু জানাইলেন এডমিরাল চৌধুরী সরকারী কাজে পাকিস্তানের বাহিরে গিয়াছেন। দুই-এক দিনের মধ্যেই তিনি ফিরিয়া আসিবেন। তখনই ওটা তাঁর কাছে ব্যক্তিগত ভাবে পৌঁছাইতে হইবে।
সমস্ত ব্যবস্থার পাকা-পুতিতে নিশ্চিন্ত হইয়া অন্যান্য কাজের চাপে ব্যাপারটা ভুলিয়াই গিয়ছিলাম। হঠাৎ একদিন আরেকখানা বেনামী পত্র পাইলাম। তাতে লেখা হইয়াছে? হাজার আসোস যথাসময়ে হুশিয়ার করা সত্ত্বেও আমি ‘ফলানা জাহাজ সম্পর্কে কোনও সতর্কতা অবলম্বন করি নাই। জাহাজখানা উল্লিখিত তারিখে কিম্বা তার একদিন আগেই মেরামতের পারমিশন লইয়া করাচি বন্দর ত্যাগ করিয়াছে। আমার মত মন্ত্রীর দ্বারা কোনও কাজ হইবে না, পত্র-লেখক আগেই সে সন্দেহ করিয়াছিলেন। তবু লোম্মুখে আমার তেজস্বিতার কথা শুনিয়া তিনি ঐ পত্র লিখিয়াছিলেন। ইত্যাদি। আমি পত্র পড়িয়া স্তম্ভিত হইলাম। সেক্রেটারি মিঃ আযিয আহমদকে ডাকিলাম। তিনিও পত্র পড়িয়া অবাক হইলেন। কন্ট্রোলার-অব-শিপিংকে তৎক্ষণাৎ টেলিফোন করিলেন। কন্ট্রোলার ঐ ধরনের কোনও নোট বা অর্ডার পান নাই। আযিয আহমদ সাহেব কড়া অফিসার বলিয়া মশহুর। সত্যই তাই। তিনি কয়দিন ধরিয়া সমস্ত বিভাগ তোলপাড় করিলেন। ডিসপ্যাঁচ বুক ডেলিভারি রেজিষ্টার পিয়ন বুক সব তন্নতন্ন করিয়া তদারক করিলেন। কোথায় সে অর্ডারশিটটা গায়েব হইয়াছে, তিনিও ধরিতে পারিলেন না।
কয়েকদিন পরে খবরের কাগয়ে পড়িলাম, ঐ ফলানা জাহাজ সত্য-সত্যই বোম্বাইর নিকটবর্তী স্থানে ডুবিয়া গিয়াছে। ব্যাপারটা যথারীতি তদন্ত কমিশনের কাছে পাঠান হইল।
আরও কয়দিন পরে আরেকটি জাহাজ সম্পর্কে এক-বেনামী পত্ৰ আসিল। তাতে লেখা হইয়াছে। ঐ বড়লোক জাহাজওয়ালা অস্ট্রেলিয়া হইতে একটি জাহাজ খরিদ করার জন্য সরকার হইতে তেত্রিশ লাখ টাকার বিদেশী মুদ্রা নিয়া সেখানে বড়জোর তিন-চার লাখ টাকা দামের একটি বড় জাহাজ কিনিয়াছেন। ওয়েলিংডন বন্দর হইতে উক্ত জাহাজ নামক লক্কড়টি অন্য একটি জাহাজের পিছনে বাঁধিয়া টোড করিয়া টানিয়া আনার ব্যবস্থা হইয়াছে। করাচি বন্দরে ইহা প্রবেশ করার আগে বিশেষ করিয়া রেজিস্ট্রেশন দিবার আগে যেন আমি এই জাহাজ সম্পর্কে গোপনীয় তদন্ত করাই। ইত্যাদি। মনে হইল, এই পত্রের লেখক আগের লেখক নন। কারণ এতে আগের পত্রের কোনও উল্লেখও নাই। আমার যোগ্যতা সম্পর্কে কোনও সন্দেহ প্রকাশও নাই।
