আসিলে অনুমোদিত বলিয়া ধরিয়া লইবেন এবং কার্যে অগ্রসর হইবেন। আরও নিয়ম করা হইল যে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের টাকা কোন অবস্থাতেই ল্যাপস বা বাতিল হইবে না। কারণ পূর্ব-বাংলায় ছয় মাসের বেশি বর্ষার দরুন নির্মাণকার্য বন্ধ থাকে। প্রাকৃতিক কারণে কাজ বন্ধ থাকার দরুন টাকা খরচ না করা গেলে তার জন্য কর্তৃপক্ষকে দোষ দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। পূর্ব-বাংলার ঋতুর সাথে সম্পর্ক রাখিয়া পাকিস্তানের আর্থিক বছর এপ্রিলের বদলে জুলাই হইতে শুরু করার প্রস্তাব পূর্ব পাকিস্তানের আতাউর রহমান মন্ত্রিসভাই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে করিয়াছিলেন। আমাদের আমলে সব গোছাইয়া ইহা করিয়া উঠিতে পারি নাই। ফিরোয় খ মন্ত্রিসভার আমলে তা করা হইয়াছিল। বর্তমান সরকাও তা বজায় রাখিয়াছেন।
নিয়ম-কানুন বদলান ছাড়া শিল্প বাণিজ্য দফতরে কতকগুলি বিশেষ সংস্কার প্রবর্তন করিতে হইয়াছিল। তার মধ্যে এই কয়টির নাম বিশেষভাবে উল্লখযোগ্য : (১) সওদাগরি জাহাজ (২) আট সিল্ক-শিল্প (৩) ডবল লাইসেন্সিং, (৪) বোগাস লাইসেন্সিং, (৫) ফিল্ম লাইসেন্সিং এবং নিউকামার। এছাড়া আমার অধীনস্থ দুইটি দফতরেই যথাসাধ্য চাকুরি-গত প্যারিটি প্রবর্তনের চেষ্টা করিয়াছিলাম। চাকুরির ব্যাপারে দু-একটি চমকপ্রদ ঘটনার উল্লেখ পরে করিব। আগে সংস্কারের চেষ্টাতার প্রতিক্রিয়ার কথাটাই বলিয়া নেই।
৩. সওদাগরি জাহাজ
সওদাগরি জাহাজের কথাটাই সকলের আগে বলি। সওদাগরি জাহাজের দিকে আমার নযর পড়ে পূর্ব-পাকিস্তানের সুবিধা-অসুবিধার কথা বিচার করিতে গিয়া। পূর্ব-পাকিস্তান তার প্রয়োজনীয় চাউল সিমেন্ট সরিষার তেল লবণ সূতা কাপড় ইত্যাদি ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পশ্চিম পাকিস্তান হইতে আমদানি করিয়া থাকে। জাহাজ ছাড়া এসব আমদানির আর কোনও যান-বাহন নাই। কাজেই এসব আমদানির ব্যাপারে পূর্ব-পাকিস্তান সরকার ও ব্যবসায়ীদের একমাত্র জাহাজের দিকেই চাহিয়া থাকিতে হয়। পশ্চিম পাকিস্তানে এইসব জিনিসের দামের চেয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের দাম অনেক বেশি। এর একমাত্র কারণ জাহাজের মালিকরা গলাকাটা চড়া রেটে ভাড়া আদায় করিয়া থাকেন। আমি সরকারী কর্মচারী ও এক্সপোর্টারদের অভিমত লইয়া জানিতে পারিলাম, জিনিস-ভেদে করাচি হইতে চাটগা পর্যন্ত প্রতি টনে পঁয়তাল্লিশ হইতে পঞ্চাশ টাকার বেশি ভাড়া হইতে পারে না। কাজেই আমি প্রতি টন একান্ন টাকা বাঁধিয়া ফরমান জারি করাইলাম। জাহাজে স্থান বন্টন-বিতরণে দুর্নীতি মূলক পক্ষপাতিত্ব নিবারণের কড়া ব্যবস্থা করিলাম। কিন্তু অল্পদিনেই খবর পাইলাম সরকার-নির্ধারিত রেট অমান্য করিয়া মালিকেরা নব্বই-পচানব্বই টাকা টন প্রতি ভাড়া আদায় করিতেছেন। স্বয়ং ব্যাপারীরাই প্রতিযোগিতা করিয়া বেশি ভাড়া দিয়া থাকেন। জাহাজে জায়গার অভাব কেন? অফিসারদের লইয়া পরামর্শ করিতে বসিলাম। তাঁরা সবাই আমার চেয়ে অভিজ্ঞ লোক। তাঁরা খাতা-পত্রের হিসাব দেখাইয়া বলিলেন, উপকূল বাণিজ্যের জন্য আমাদের মোট উনচল্লিশটা জাহাজ আছে। অত জাহাজ থাকিতে জায়গার অভাব কেন, সে প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা যা বললেন, তাতে বুঝা গেল আসলে কাজের জাহাজ অত নাই। তদারক করিয়া দেখা গেল,মাত্র উনিশটা জাহাজ চালু আছে। বাকী বিশটাই মেরামতে আছে। মেরামতের দিন-তারিখ হিসাব করিয়া দেখা গেল, বহু বছর ধরিয়া ওদের মেরামত চলিতেছে। অভিজ্ঞ অফিসারেরা তাঁদের বহু অভিজ্ঞতার নযির দিয়া আমাকে বুঝাইয়া দিলেন, জাহাজের মালিকদের চালাকি ধরা খুব কঠিন। আসল ব্যাপার এই যে তারা বরাবর একই জাহাজ বিকল ও ‘আন্ডার রিপেয়ার’ দেখায় না। একটার পর আর একটা দেখায়। এই সমস্ত সওদাগরি জাহাজের মালিক মাত্র জন তিন-চারেক। কাজেই খুব প্রভাবশালী। ইচ্ছা করিলে তাঁরা গোটা কোস্টাল ট্রাফিক অচল করিয়া দুই পাকিস্তানের যোগাযোগ বন্ধ করিয়া দিতে পারেন। পরামর্শ সভার ফল বিশেষ কিছু হইল না। জাহাজ ভাড়ার ‘রেট’ এবং পরিণামে পূর্ব পাকিস্তানী কনফিউমারদের দুর্দশা আগের মতই চলিল। আমি নিরুপায় হইয়া দাঁতে হাত কামড়াইতে থাকিলাম।
ইতিমধ্যে সওদাগরি জাহাজের মালিকদের যিনি প্রধান তিনি অসুস্থতার অজুহাতে ইযি-চেয়ারে শুইয়া লোকের কাঁধে চড়িয়া আমার সাথে দেখা করিলেন। তিনি খোলাখুলি আমাকে বলিলেন : টন প্রতি একান্ন টাকা ভাড়া বাঁধিয়া দেওয়া সরকারের ঘোরর অন্যায় হইয়াছে। তথ্য ও বৃত্তান্তমূলক আমার সমস্ত যুক্তির জবাবে তিনি বলিলেন : তাঁরা সরকারের বাঁধা দর মানিতেছে না, মানিবেও না। তিনি সগর্বে আমাকে জানাইয়া দিলেন, তাঁরা বর্তমানে পচানব্বই টাকা ভাড়া আদায় করিতেছেন এবং সেজন্য রশিদ দিতেছেন। ইচ্ছা করিলে সরকার তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করিতে পারেন। সে ভয়ে কম্পিত নন তিনি।
আমি ভদ্রলোকের দুঃসাহস দেখিয়া অবাক হইলাম। এত সাহস তিনি পাইলেন কোথায়? অফিসার যাঁরা এই যোগাযোগের সময় হাযির ছিলেন তাঁরা আমাকে বুঝাইলেন, খুঁটির জোরেই ছাগল কুঁদে। অল্পদিন পরেই জানিতে পারিলাম, ঐ ভদ্রলোক করাচির সবচেয়ে বড় ক্লাবে বসিয়া (আমাদের বড়-বড় অফিসাররাও ঐ ক্লাবের মেম্বার) সগর্বে অফিসারদের বলিয়াছেন : ‘বলিয়া দিবেন আপনাদের মন্ত্রীকে, প্রেসিডেন্ট আমার ডান পকেটে। প্রধানমন্ত্রী আমার বাম পকেটে। অমন মন্ত্রীকে আমি থোড়াই কেয়ার করি।‘
