ব্যাপারটা সত্যই আমাকে চিন্তায় ফেলিল। আমি লাহোর প্রস্তাবের দুই পাকিস্তানে বিশ্বাসী। আসলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দুইটা পৃথক দেশ, দুইটা পৃথক জাতি। তাদের অর্থনীতি সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে দুইটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হইলেই ঠিক হইত। কিন্তু তা হয় নাই। পাকিস্তান এক রাষ্ট্র হইয়াছে। সেই জন্য এক পাকিস্তান কায়েম রাখিয়া উভমু অঞ্চলকে সমানভাবে উন্নত করার পন্থা হিসাবেই আমি একুশ দফার ১৯ দফা রচনা করিয়াছিলাম। সকল শ্রেণীর পূর্ব পাকিস্তানবাসী, বিশেষতঃ যুক্তফ্রন্ট এবং আওয়ামী লীগ, লাহোর-প্রস্তাব-নির্ধারিত পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্ত শাসনে বিশাসী। এই হিসাবে ১৯৫৬ সালের শাসন ঘোরতর কুটি পূর্ণ। তবু এই শাসন অনুসারে কাজ করিতে রাযী হইয়াছি এবং মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়াছি। আশা এই যে শাসনতান্ত্রিক পন্থার দ্বারাই আমরা এই শাসনন্ত্রকে সংশোধন করিয়া পূর্ব আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করিতে পারি। আমরা বিপ্লব করিয়া সে পরিবর্তন আনিতে চাই না। তা করিলে পরিণামে পাকিস্তানের অনিষ্ট হইতে পারে। সে জন্য আমরা সারা প্রাণ দিয়া সাধারণ নির্বাচন করিতে চাই। বস্তুতঃ এই একটি মাত্র উদ্দেশ্যেই আমাদের নেতা শহীদ সাহেব মাইনরিটি দলের নেতা হইয়াও মন্ত্রিসভা গঠনের দায়িত্ব নিয়াছিলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সাধারণ নির্বাচন হইলেই তিনি মেজরিটি লাভ করিবেন এবং মেজরিটি দলের নেতা হিসাবে জাতিগঠনমূলক কাজে হাত দিতে পারিবেন। নেতার সহিত আমিও সম্পূর্ণ একমত ছিলাম। আমিও আগামী নির্বাচনে মেজরিটি লাভ করিয়া শাসনতন্ত্র সংশোধনের আশা করিতেছিলাম।
কিন্তু ইতিমধ্যে শাসনতন্ত্রের আওতার মধ্যে থাকিয়া যত বেশি প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা বাড়ান যায় তার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। এই সত্য স্বীকার করিতে আমার লজ্জা নাই যে প্রধানতঃ পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার বাড়াইবার চেষ্টাতেই আমি সব করিয়াছি। কিন্তু ঐ সংগে পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের অধিকার বাড়াইতেও ক্রটি করিনাই। প্রাদিশেক সরকারের এলাকা বাড়াইবার উদ্দেশ্যে যা-কিছু করিয়াছি, সে সবেই স্বভাবতঃই পূর্ব পাকিস্তানের সাথে-সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকারও বাড়িয়াছে। এমনকি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার, পি.আই.ডি.সি.এবং এস,এন্ড ডি, প্রভৃতি কেন্দ্রীয় সংস্থার সাথে পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের বিরোধ বাধিলে আমি প্রায়শঃ পশ্চিম পাকিস্তানকে সমর্থন করিয়াছি এবং পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের পক্ষে রায় দিয়াছি। এ কাজ শাসনতন্ত্রের বিধানকে যথাসম্ভব টানিয়া মোচড়াইয়া প্রাদেশিক সরকারের পক্ষে নিতে কসুর করি নাই।
২. কেন্দ্রীয় অনুমোদনের নামে
কেন্দ্রীয় সরকারী অনুমোদনের নামে প্রাদেশিক সরকারের প্রজেক্টগুলি নিষ্ঠুরভাবে অবহেলিত অবস্থায় কেন্দ্রীয় বিভিন্ন দফতরের পায়রার খোপে পড়িয়া থাকে। এই কারণেই প্রাদেশিক সরকারদ্বয় বিশেষতঃ পূর্ব-পাক সরকার তাঁদের ভাগের বরাদ্ধ টাকা সময় মত খরচ করিতে পারেন না, এটা বুঝিতে আমার সময় লাগিয়াছিল। প্রাদেশিক সরকার কোন বরাদ্দ-টাকা খরচ করিতে পারেন না, তার সন্ধান করিতে গিয়া আমি দেখিয়া তাজ্জব হইলাম যে পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের প্রস্তুত কোন-কোন প্রজেক্ট তিন-চার বছর ধরিয়া কেন্দ্রীয় সরকারের দফতরে পচিতেছে। কারণ বাহির করিতে গিয়া যা দেখিলাম তাতে আরও বিম্বিত ও লজ্জিত হইলাম। প্রাদেশিক সরকারের কোন বিভাগের একটি প্রজেক্ট কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনের জন্য প্রথমে ঐ প্রজেক্টের সব কাগপত্র কেন্দ্রীয় সরকারের করেসপন্ডিং দফতরে (অর্থাৎ শিল্প হইলে শিল্প দফতরে, শিক্ষা হইলে শিক্ষা দফতরে। পাঠাইতে হয়। কেন্দ্রীয় দফতর উহা সংশোধন-অনুমোদন করিলে পর উহা প্রাদেশিক সরকারে ফেরত যাইবে। প্রাদেশিক সরকার যদি সংশোধন না মানেন, তবে লেখালেখি শুরু হইবে। যদি সংশোধন মানিয়া লন, তবে ক্রমে ক্রমে (এক সাথে নয়) শিল্প, বাণিজ্য, প্লানিং ইকনমিক এফেয়ার্স এবং ফাইনান্স দফতরে পাঠাইতে হইবে। এক দফতরে অনুমোদন পাইয়া অপর দফতরে যাইতে হইবে। এক দফতরের বাধা পাইলে, সংশোধন করিতে চাইলে, ত কথাই নাই। তাতে যে ‘রথিডং বুথিডং’ ‘ওয়ান স্টেপ ফরওয়ার্ড টু স্টেপ ব্যাক’ শুরু হয় তাতে বছরকে-বছর চলিয়া যাইতে পারে। আর বাধা যদি কেউ না-ও দেন সংশোধন যদি কেউ না-ও করেন, তথাপি একটি প্রাদেশিক প্রজেক্টকে সাতটি সিংহদরজা পার হইয়া মণিকোঠায় ঢুকিয়া কেন্দ্রীয় অনুমোদনের রাজকন্যার সাক্ষাৎ পাইতে কয়েক বছর কাটিয়া যায়। ইতিমধ্যে বরাদ্দ টাকা ফিরিয়া যায়! সুতরাং দোষ কেন্দ্রীয় সরকারের। প্রাদেশিক সরকারের কোনও দোষ নাই। তবু দীর্ঘদিন ধরিয়া প্রাদেশিক সরকার বিশেষতঃ পূর্ব পাকিস্তান সরকার ও মন্ত্রীরা চুপ করিয়া এই মিথ্যা তহমত বরদাশত্ করিয়া আসিতেছেন। আমি এই অবস্থার প্রতিকারে উদ্যোগী হইলাম। প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন পাইয়া প্রসিডিওর সংক্রান্ত নিয়ম বদলাইলাম। নিজের সভাপতিত্বে কেবিনেটে এসব পাস করাইলাম। আশ্চর্য এই, পশ্চিম পাকিস্তানের মন্ত্রীরাও এর প্রতিবাদ করিলেন না। বরঞ্চ উৎসাহের সাথে সমর্থন করিলেন। পরিবর্তিত ও সংশোধিত নিয়মে এই ব্যবস্থা করা হইল যে প্রাদেশিক সরকার তাঁদের প্রজেক্টের সাত-আট কপি একই সময়ে সংশ্লিষ্ট সকল কেন্দ্রীয় দফতরে এক-এক কপি পাঠাইয়া দিবেন। ছয় সপ্তাহের মধ্যে অনুমোদন বা সংশোধন
