আমি পন্ডিতজীর চোখে-মুখে অপলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া গম্ভীর সুরে বলিলাম : পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু।‘ পন্ডিতজী হাসিয়া বলিলেন : ‘ওঃ তুমি। তামাশা করিতেছ?’ আমি সে হাসিতে যোগ না দিয়া গভীর ভাবেই বলিলাম : ‘জি না, আমি ঠাট্টা করিতেছি না। সারা অন্তর দিয়াই কহিতেছি। আপনে রাযী হন। আমি আজই আমার প্রধানমন্ত্রীকে দিয়া এই মর্মে ঘোষণা করাইতেছি।‘ পন্ডিতজী তাঁর হাসি থামাইয়া বলিলেন : তোম বড়া বদমায়েশ হো। আমি আগ্রহ দেখাইয়া বলিলাম : ‘এতে বদমায়েশির কি হইল? আপনে বিশ্বাস করুন, আমার প্রধানমন্ত্রী, এমনকি গোটা পাকিস্তানবাসী, এক বাক্যে আপনাকে সালিশে মানিয়া লইবেন। আপনে রাযী হোন।‘ এতক্ষণে পন্ডিতজীর হাসি বন্ধ হল। তিনি গম্ভীর মুখে কিন্তু রসিকতার ভংগিতে হাত জোড় করিয়া বলিলেন : ‘হাম কো মাফ করো। মুঝসে ইয়ে কাম নেহি হোগা।’ আমি যিদ করিয়া বলিলাম : ‘কেন হইবে না? পাকিস্তানের পক্ষ হইতে আপনাকে মানা হইতেছে। ভারতের পক্ষ হইতে আপনাকে মানা হইবে না, এটা হইতে পারে না। তবে আপনার দ্বারা হইবে না একথা কেন বলিতেছেন?’ পন্ডিতজী আরো গম্ভীর হইয়া বলিলেন : ‘তুমি জান, কেন আমার দ্বারা এটা সম্ভব নয়।‘ কথাটা এইখানে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এ সুযোগ আমি ছাড়িলাম না। কারণ মস্তবড় ঝুঁকি আমি লইয়াছিলাম। যদি পন্ডিতজী বলিয়া বসিতেন : বহুৎ আচ্ছা! তবে আমার অবস্থা কি হইত? পন্ডিতজী শেষবারের মত না বলার পর আমার গলার জোর বাড়িয়া গেল। এতক্ষণ পন্ডিতজীই বেশির ভাগ কথা বলিতেছিলেন। এইবার আমার পালা শুরু। বলিলাম : আপনাকে আমি আজো আমার নেতা বলিয়া মানি। আপনি শুধু ভারতের নেতা নন। এই উপমহাদেশের এমনকি সারা বিশ্বের নেতা। মহাত্মাজীর মৃত্যুর পর তাঁর দায়িত্বও আপনার ঘাড়ে পড়িয়াছে। যে মহান উদ্দেশ্যে আপনারা দেশ বিভাগ মানিয়া লইয়াছিলেন, তা আজো সম্পন্ন হয় নাই। আমার ভাবিতে লজ্জা হয় যে আপনেরা একটা বিবাদ মিটাইতে মূল গাছটা দুই ভাগ করিয়া শাখা-প্রশাখা পাতা পুতুড়ি লইয়া ঝগড়া জিয়াইয়া রাখিয়াছেন। আপনাকে এটা বুঝান অনাবশ্যক যে আপনি জীবিত থাকিতে-থাকিতে যদি পাক-ভারত বিরোধ মিটাইয়া না যান, তবে এ বিরোধ চিরস্থায়ী হইতে পারে। অতঃপর পন্ডিতজীর সুরে বেদনা ফুটিয়া উঠিল। তিনি বলিলেন : প্রশ্নটা দুইটা জাতির, দুই রাষ্টের। ব্যক্তির ক্ষমতা এখানে কতটুকু? পরিবেশ সৃষ্টি আগে দরকার। তোমরাও পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা কর।
অতঃপর আমাদের মধ্যে যে সব কথাবার্তা হইল তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কথা এই যে তিনি শহীদ সাহেবের সাথে বৈঠক করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। আমাকে আয়োজন করার উপদেশ দিলেন।
অতঃপর গবর্নর মিঃ শ্রীপ্রকাশের শাহী আতিথেয়তায় তাঁর আয়োজিত সম্বর্ধনা ও গানের জলসার আনন্দ উপভোগ করিয়া কায়েদে-আযমের বাড়ি-সহ বোম্বাইর দর্শনীয় স্থানগুলি দেখিয়া তিন-চার দিন পর পি, আই. এ. বিমানে করাচি ফিরিয়া আসিলাম। করাচি বিমানবন্দরে সাংবাদিকরা ভিড় করিলেন। বাণিজ্য-চুক্তিতে জিতিয়া আসিয়াছি স্বীকার করিয়াও তাঁরা মধু ও যমজ ভাইর জন্য এমন ভাব দেখাইলেন যে আরেকটু হইলে কালানিশান দেখাইতেন আর কি?
করাচি ফিরিয়া প্রথম সুযোগেই প্রধানমন্ত্রীকে আমার দিল্লি সফরের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করিয়া পন্ডিত নেহরুর সাথে আমার আলাপের কথাটা, সবিস্তারে বর্ণনা করিলাম। আমি যে পন্ডিতজীকে সালিশ মানিয়া কি সাংঘাতিক ঝুঁকিটা লইয়াছিলাম, বাহাদুরি দেখাইবার জন্য তার উপর বিশেষ জোর দিলাম। লিডার ফুৎকারে ওটা উড়াইয়া দিলেন। কোনও ঝুঁকিই তুমি নেও নাই’ তিনি অবহেলায় বলিলেন। ওতে কোনও ঝুঁকিই ছিল না। কারণ জওয়াহের লাল অমন দায়িত্ব নিতেই পারেন না। অমন অবস্থায় কেউ পারে না। তবে প্রস্তাবটি দিয়া তুমি মন্দ কর নাই। আমাদের প্রতি তাঁর ধারণা ভাল হইতে পারে। ঐ সংগে তিনি বলিলেন যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে মোলাকাতের খুবই ইচ্ছা তাঁর আছে। তিনি নিজেই ঐ লাইনে চিন্তা করিতেছিলেন। শীঘ্রই তিনি ঐ ব্যাপারটা হাতে লইবেন বলিয়া আশ্বাস দিলেন।
ভারত সফরের শ্রমে অতিরিক্ত নাড়াচাড়ায় আমার আহত হাঁটুটা আবার প্রদাহিত, ব্যথিত ও অচল হইল। পা আবার ফুলিয়া গেল। ফলে আবার বন্দী হইলাম। বাসা হইতেই অফিস করিতে লাগিলাম। কেবিনেট সভাও আমার বাসাতেই হইতে লাগিল। বাহিরে যাইতে না হওয়ায় অধিক চিন্তা করিবার ও ফাইলপত্র ডিসপোয় করিবার অনেক সময় পাইলাম।
২৫. কত অজানারে
কত অজানারে
পঁচিশ অধ্যায়
১. লালফিতার দৌরাত্ম্য
মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিয়া প্রথম সুযোগেই শিল্পকে প্রাদেশিক সরকারের হাতে হস্তান্তর করিয়া এবং লাইসেন্সিং-এর ব্যাপারে উভয় প্রদেশের জন্য স্বাধীন ও স্বতন্ত্র কন্ট্রোলার আফিস স্থাপন করিয়া দিয়াছিলাম বটে, কিন্তু অল্পদিনেই বুঝিলাম, ওতেই আমার কর্তব্য শেষ হয় নাই। প্রাদেশিক সরকারদ্বয় তাতেই পুরা অধিকার ও সুবিধা পান নাই। ধরুন আগে শিল্পের কথাটাই। শিল্প প্রাদেশিক বিষয় বটে, কিন্তু শিল্প প্রতিষ্ঠা করিতে এবং চালাইতে বিদেশী মুদ্রা লাগে। বিদেশী মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে। কেন্দ্র বিদেশী মুদ্রা দিবার আগে নিজে স্বাভাবতঃই দেখিয়া লইতে চায়, তার সদ্ব্যবহার হইবে কিনা। প্ল্যানিংটা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। কোনও শিল্প প্ল্যান-মোতাবেক হইতেছে কিনা, তাও দেখা কেন্দ্রীয় সরকারের এলাকা। এই সব কারণে প্রাদেশিক সরকারের সব শিল্পায়ন-প্রচেষ্টাই কেন্দ্রের দ্বারা অনুমোদিত হইতে হয়। এই অনুমোদন পাইতে অনেক সময় লাগে। প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে বিশেষতঃ পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করা হয় যে তাঁরা এলটেড টাকা খরচ করিতে পারেন না বলিয়া বছর শেষে টাকা ফেরত যায়। কথাটা সত্য। সত্যই পূর্ব পাকিস্তান সরকার অনেক সময় তাঁদের ভাগের টাকা খরচ করিতে পারেন নাই বলিয়া টাকা ফেরত গিয়াছে। বলা হয় এতে দুইটা কথা প্রমাণিত হইতেছে এক, পূর্ব-পাকিস্তানে এব্যবিং ক্যাপাসিটি (হম করিবার ক্ষমতা) নাই। দুই, প্রাদেশিক সরকারের পক্ষে শিলোয়তির মত বড় কাজ চালান সম্ভব না। সুতরাং যারা অধিকতর অটনমির দাবি করে তারা ভ্রান্ত।
