যা হোক কাশির-প্রশ্ন সম্পর্কে আমার মতামত আমি পণ্ডিতজীকে সরলভাবে স্পষ্ট ভাষায় বলিতে কিছুমাত্র দ্বিধা করিলাম না। তিনি আমার কোন কথাই মানিলেন না বটে কিন্তু জোরে প্রতিবাদও করিলেন না।
কিন্তু প্রশ্ন এই যে কাশির সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমরা কি এ সবের সমাধান করিব না? যতই নীতিগত প্রশ্ন হউক, চল্লিশ লক্ষ কাশ্মিরীর জন্য কি পাকিস্তানের এক-এক অঞ্চলের চার কোটি লোককে মারিয়া ফেলিব? কাজেই, কি জনগণের সুবিধা, কি সমাধানের পন্থা, উভয় দিক বিচার করিয়াই পাকিস্তানী নেতাদের এই অবাস্তব অনমনীয় মনোভাব ত্যাগ করিয়া বাস্তববাদী হইতে হইবে। কাশ্মির বাদ দিয়া নয়, কাশ্মির বিরোধ বাকী থাকিল এই মূলসূত্র ধরিয়া, উভয় দেশের অন্যান্য ছোট সমস্যার সমাধানে হাত দেওয়া উচিৎ। এইসব কথা নানাভাবে আমি আমাদের বিভিন্ন নেতা ও মন্ত্রীকে বলিয়াছি। আমাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও কর্মী ভাইদেরে আমি বুঝাইয়াছি। আমার বিশ্বাস, আমার সহকর্মীরা সকলেই আমার এই মতের পোষকতা করেন। আমি যতদূর বুঝিতে পারিয়াছি, আমার নেতা শহীদ সাহেবেরও এই মত। পাক-ভারত সম্প্রীতি সম্বন্ধে তীর আস্থা এমন দৃঢ় ছিল যে তিনি উভয় দেশের মধ্যে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের মত ভিসা-প্রথা উঠাইয়া অবাধ যাতায়াতের পক্ষপাতি ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তাঁর এই মত বদলায় নাই। এই মূলসূত্র হইতেই আমাদের ‘নো ওয়ার’-চুক্তিতে সই করা উচিৎ। ‘নো ওয়ার’-চুক্তির প্রস্তাবটা আসিয়াছে ভারতের পক্ষ হইতে। কেন আসিয়াছে? যেহেতু, ভারত সত্যসত্যই আশংকা করে পাকিস্তান যুদ্ধ বাধাইতে পারে। দেশ বিভাগে পাকিস্তানের উপর যে সব অন্যায় ও চক্রান্তমূলক অবিচার হইয়াছে, তার প্রতিকারের জন্য পাকিস্তান যদি যুদ্ধ বাধায় তবে যুদ্ধনীতি, রাজনীতি, এমনকি ন্যায়-নীতির দিক হইতেও তা অন্যায় হইবে না। ভারত এটা জানে, বুঝে এবং হৃদয়ংগম করে। পক্ষান্তরে ভারতের পাকিস্তান আক্রমণের কোনও যুক্তি ও কারণ নাই। বাটোয়ারায় ভারত জিতিয়াছে এবং অন্যায় রূপেই জিতিয়াছে। তবু যদি বিনা-কারণে পাকিস্তান আক্রমণ করিবার ইচ্ছা তার থাকিত, তবে ১৯৪৭-৪৮ সালেই তা করিত। ঐটাই তার পক্ষে পূর্ণ সুযোগ ছিল। হায়দরাবাদ কাশ্মির জুনাগড় মানবাদাড় আক্রমণ ও দখল করিয়া সে সুযোগ পুরাপুরিই ভারত গ্রহণ করিয়াছে। ঐ সব জায়গা দখল করিয়া ভারত দখলই স্বত্বের দশ ভাগের নয় ভাগ এই নীতিতে বিশ্বাসী বুদ্ধিমানের মতই অতঃপর চুপ করিয়া আছে এবং দখল-করা দেশগুলিতে নিজের স্থিতিশীলতার চেষ্টা করিতেছে। এর পরেও যদি তার পূর্ব ও পশ্চিম সীমায় আরও কিছু জায়গা দখল করিবার ইচ্ছা ভারতের থাকিত, তবে ঐ সূযোগেই-ভারত তা করিয়া ফেলিত। যদি তা করিত, তবে জাতিসংঘে মামলা দায়ের করা ছাড়া আমরা আর কিছুই করিতে পারিতাম না। তা করিয়া আমরা কাশ্মিরের চেয়ে বেশি কিছু প্রতিকারও করিতে পারিতাম না। সুতরাং কোনও সীমান্তেই ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করিতে চায় না। এ বিশ্বাস আমার খুবই দৃঢ়।
পক্ষান্তরে বাটোয়ারায় পাকিস্তানের উপর অন্যায় ও চক্রান্তমূলক অবিচার হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান যুদ্ধ করিয়া তার সীমা প্রসারিত করিতে চায় না। এটা পাকিস্তানের সকল দলের নেতাদের মত বলিয়াই আমার ধারণা ও বিশ্বাস। কাজেই ‘নো-ওয়ার’ চুক্তি করিতে পাকিস্তানের পক্ষে কোনও আপত্তির বাস্তব কারণ নাই। তবু কাশ্মির মীমাংসা না হইলে ‘নো-ওয়ার’-চুক্তি করিব না যাঁরা বলেন, তারা নিশ্চয়ই ভারতকে ডর দেখাইবার জন্যই তা বলেন। কিন্তু প্রশ্ন এই যে সেই ডরে ভারত কাশ্মির ত্যাগ করিবে কিনা? তা যদি না করে, তবে পাকিস্তান যুদ্ধ করিয়া কাশ্মির উদ্ধার করিবে কিনা? ন বছরের অভিজ্ঞতায় এই উভয় প্রশ্নের না-বাচক উত্তর পাওয়া গিয়াছে।
পন্ডিত নেহরু তাঁর কথাবার্তায় সুস্পষ্ট আন্তরিকতার সাথে যে সব কথা বলিলেন, মোটামুটি তা উপরের কথাগুলির অনুরূপ। সুতরাং এসব ব্যাপারে তাঁর মতের সহিত আমার মতের মিল ছিল। তবু আমি বলিলাম : আপনার সব কথা সত্য হইতে পারে, কিন্তু আপনেরাই বা কাশির সমস্যাটা আগে মিটাইতে রাযী হন না কেন? জবাবে তিনি বলিলেন : ‘মিটাইতে আমরা সব সময়েই রাযী। কিন্তু প্রশ্ন এই যে কিভাবে মিটান যায়? কোন একটি ব্যাপারেই ত ভারত-পাকিস্তান, একমত হয় না। আমি কথার পিঠে কথা বলিলাম কোন পন্থাতেই যদি তারত-পাকিস্তান একমত হইতে না পারে, তবে শেষ পন্থা সালিশ মানা! সালিশের মাধ্যমেই এ ব্যাপারটা মিটাইয়া ফেলেন না কেন? পন্ডিতজী সরলভাবে বলিলেন : সেটাও সম্ভব হইতেছে না। কারণ উভয় দেশের গ্রহণযোগ্য কোনও সালিশই পাওয়া যাইবে না। ইনি পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্য হইলে ভারতের অগ্রহণযোগ্য। আর উনি ভারতের গ্রহণযোগ্য হইলে পাকিস্তানের অগ্রহণযোগ্য। দুই পক্ষ একই ব্যক্তিকে কখনো গ্রহণ করিবে না। মুশকিল হইয়াছে ত এইখানেই। পন্ডিতজীর মুখে সত্যই বিষণ্ণতা ফুটিয়া উঠিল। আমার মাথায় হঠাৎ একটা ফন্দি জুটিল। বলিলাম : ‘না পন্ডিতজী, আমি আপনের সাথে একমত নই। উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য লোক চেষ্টা করিলে পাওয়া যাইবে। খুব জোরের সাথে মাথা নাড়িয়া তিনি বলিলেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা হইতে আমি বুঝিয়াছি, সারা দুনিয়া তালাশ করিয়াও তুমি এমন একজন লোক পাইবে না যাঁকে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ে সালিশ মানিবে। আমিও সমান জোর দিয়া বলিলাম : আপনের কথা সত্য হইতে পারে না। কারণ আমি অন্ততঃ একজনের কথা জানি যিনি ভারত ও পাকিস্তানের নিকট সমান গ্রহণযোগ্য হইবেন। পণ্ডিতজী আরো জোরে প্রতিবাদ করিলেন। বলিলেন : ‘অসম্ভব। এমন লোকের অবস্থিতি অসম্ভব। কারণ এরা দুইপক্ষ কথিত ব্যক্তির গুণাগুণ নিরপেক্ষতা বিচার করিবে না। একপক্ষ যাঁকে বলিবে ‘হ’, অপর পক্ষ নির্বিচারে তাকেই বলিবে না। বিচারের এদের আর কোন মাপকাঠি নাই।‘ আমি ঠেটামি করিয়া বলিলাম : ‘আপনের কথা ঠিক। কিন্তু আমি যে ব্যক্তির কথা ভাবিতেছি তাঁর বেলা ঐ নিয়ম চলিবে না। তিনি উভয় দেশের গ্রহণযোগ্য হইবেন। উভয় দেশ সমান আগ্রহে তাঁকে গ্রহণ করিবে।‘ পন্ডিতজী হাসিয়া বলিলেন : ‘দুনিয়ায় এমন একজন লোকও নাই জানিয়াও তোমাকে প্রশ্ন করিতেছি : ঐ অদ্ভুত ভদ্রলোকটি কে?’
