যথাসময়ে পণ্ডিতজীর সাথে আমরা প্লেইনে উঠিলাম। নাশতা খাওয়া-দাওয়া সারিয়াই উঠিয়াছিলাম। তবু আমার স্ত্রী ও পুত্রের খাতিরে পণ্ডিতজী ভদ্রতা করিয়া কিছু চা-নাস্তার ব্যবস্থা করিলেন। নিজ হাতে পরিবেশন করিলেন। বিশাল সুন্দর প্লেইনে শোওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা। অল্পক্ষণেই আমার স্ত্রী ও পুত্র ঘুমাইয়া পড়িলেন। পণ্ডিতজী নিজ হাতে তাদের গায়ের কম্বল টানিয়া-গুঁজিয়া দিয়া আমার সাথে আলাপে বসিলেন। বোম্বাই পৌঁছাইতে সাড়ে তিন ঘন্টা লাগিল। এই সাড়ে তিন ঘন্টায় আমরা কত কাপ চা ও কফি এবং কত কাঠি সিগারেট খাইয়াছিলাম, তার হিসাব নাই। কিন্তু এই সুযোগে রাজনৈতিক আলাপ যা করিয়াছিলাম, তা জীবনে ভুলিতে পারিব না। উপরে আমি যে সব কথা বলিয়াছি, ভাষান্তরে বা প্রকারান্তরে তার সবগুলিই আমাদের আলোচনায় আসিল। পণ্ডিতজী একজন অসাধারণ স্কলার-পলিটিশিয়ান। বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ স্টেটসমেনদের অন্যতম। তাঁর কথা শোনা একটা মস্তবড় প্রিভিলেজ। শিক্ষার একটা অপূর্ব সুযোগ। তিনি বলিয়া গেলেন। আমি শুনিয়া গেলাম। প্রশ্ন করা না করা পর্যন্ত কথা বলিলাম না। তাঁর সব কথার সারমর্ম ছিল দুইটি : ‘এক, ভারতের দিক হইতে পাকিস্তানের কোন বিপদ নাই। দুই, পাক-ভারত সমঝোতার পথে পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের মনোভাবই একমাত্র প্রতিবন্ধক। দৃষ্টান্তস্বরূপ তিনি বলিলেন, ভারত পূর্ব পাকিস্তান গ্রাস করিতে চায়, এটা ভুল ধারণা। ভারত নিজের স্বার্থেই দুই বাংলাকে একত্র করার বিরোধী। যে সাম্প্রদায়িক বিরোধ মিটাইবার উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষ বাটোয়ারা হইয়াছে, পূর্ব বাংলার চার কোটি মুসলমানকে ভারতে আনিলে সেই সমস্যাই পুনরুজ্জীবিত হইবে। পাক-ভারত সমঝোতায় পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের মনোভাবই যে অন্তরায় তার দৃষ্টান্ত দিতে গিয়া পণ্ডিতজী নো-ওয়ার চুক্তি প্রত্যাখ্যানের কথা তুলিলেন। তিনি আমাকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন যে কাশ্মির-প্রশ্ন মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত নো ওয়ার’ চুক্তি হইতে পারে না বলিয়া পাকিস্তানের নেতারা যে যুক্তি দিতেছেন, ওটা ভ্রান্ত। তিনি নিজের কথার সমর্থনে যে সব যুক্তি দিলেন, তার আবশ্যকতা ছিল না। কারণ আমার ব্যক্তিগত মতও তাঁর মতের অনুরূপ। তাঁর মত আমিও বিশ্বাস করি, কাশ্মির-প্রশ্ন অমীমাংসিত রাখিয়াও পাক-ভারতের মধ্যে ‘নো ওয়ার’ চুক্তি হইতে পারে। এ সব কথা আমি অনেক আগে হইতেই বলিতেছি। মোহাম্মদ আলী বগুড়া ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলেও আমি তাঁদেরে এবং আমার নেতা শহীদ সাহেবকে এ ধরনের কথা বলিয়াছি। প্রথমতঃ ভারতের সাথে আমাদের অনেক ব্যাপারে বিরোধ আছে। সবগুলি আমরা মিটাইতে চাই। সম্ভব হইলে সবগুলি এক সাথে মিটাইব। তা সম্ভব না হইলে একটা-একটা করিয়া মিটাইব। এক এক করিয়া মিটাইতে হইলে কোন্টা আগে ধরিব? কাণ্ডজ্ঞানের কথা এই যে সবচেয়ে সোজা যেটা সেইটাই আগে ধরিব। ব্যক্তিগত পারিবারিক ও বৈষয়িক ব্যাপারে আমরা যা করি, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও তাই করা বুদ্ধিমানের কাজ। পরীক্ষার হলে পরীক্ষার্থীদের যারা আগে সোজা প্রশ্নের উত্তর দিয়া সবার শেষে কঠিনটা ধরে, তারাই পরীক্ষায় পাস করে। দুনিয়াবী ব্যাপারে আমাদের বিরোধসমূহ মিটাইবার বেলা যদি আগে সহজগুলি মিটাই, তবে কঠিনগুলি মিটাইবার সাইকলজিক্যাল পরিবেশ স্বতঃই সৃষ্টি হবে। পাক-ভারতের বেলাও এটা সত্য হইতে বাধ্য। কাশ্মির প্রশ্নটাই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জটিল সমস্যা। এই জটিলতম প্রশ্নটার মীমাংসা না হইলে, বা মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত, অপেক্ষাকৃত সহজগুলিও মীমাংসা করিব না, এটা কোনও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমাদের সীমা-সরহদ্দ আমাদের উভয় পাকিস্তানের মধ্যেকার যাতায়াত, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম বাংলা ও বিহারের বন্যা নিয়ন্ত্রণ সমস্যা, পশ্চিম-পাকিস্তান ও পূর্ব পাঞ্জাব ও রাজস্থানের মধ্যেকার সিন্ধু-অববাহিকার সেচ ও পানি সরবরাহ সমস্যা ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ের মীমাংসা পাকিস্তান ও ভারতের সমবেত চেষ্টা ব্যতীত হইতে পারে না।
খোদ কাশ্মির-সমস্যাটা লইয়াও পাকিস্তান সরকার বিশেষতঃ মুসলিম লীগ নেতারা বরাবর ভুল নীতি অবলম্বন করিয়া আসিয়াছেন। এটাই ছিল আমার বরাবরের মত। শেখ আবদুল্লার মত কাশ্মিরের জাতীয় জনপ্রিয় নেতার প্রতি মুসলিম লীগ নেতাদের নিতান্ত ভ্রান্ত ধারণাই এই ভুল নীতির মূলীভূত কারণ। শেখ আবদুল্লার সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস ও তাঁর স্বাধীনতা-প্রীতির যাঁরা বিস্তারিত খবর রাখেন, তাঁরাই জানেন যে শুধু ভারতের কেন কোনও শক্তিরই তিনি দালালি করিতে পারেন না। তদুপরি তিনি নিষ্ঠাবান খাঁটি মুসলমান। তিনি পাকিস্তান-বিরোধী বা পাকিস্তানের অহিতকামী হইতে পারেন না। বস্তুতঃ আমার বিশ্বাস করিবার যথেষ্ট কারণ আছে যে ১৯৫৮ সালের আগে শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে স্বাধীন-গণভোট হইলে কাশ্মিরী মুসলমানরা এক বাক্যে পাকিস্তানে যোগ দিবার পক্ষে ভোট দিত। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ অথবা মার্চ মাসের গোড়ার দিকে শেখ আবদুল্লার এক বিশ্বস্ত বন্ধু ও অনুচর আমাকে বলিয়াছিলেন যে শেখ আবদুল্লা মনের দিক দিয়া সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের সমর্থক এ কথা যেন আমি পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের গোচর করি। আমি তৎকালে পূর্ব-বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাযিমুদ্দিনকে এবং পরবর্তীকালে অন্যান্য নেতাকে সেকথা বলিয়াছিলাম। নেতারা আমার কথায় আমল দেন নাই। অবশেষে ১৯৫৪ সালে যখন ভারত সরকার প্রকাশ্যভাবে শেখ আব্দুল্লার বিরুদ্ধে একের-পর আরেকটা কর্মপন্থা গ্রহণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে ডিসমিস করিয়া জেলে পুরেন, এখনও পাকিস্তানী নেতাদের অনেকের কাছেই আমার মতামত প্রকাশ করি এবং শেখ আবদুল্লার প্রতি তাঁদের মনোভাব পরিবর্তনের অনুরোধ করি। কিন্তু তখনও তাঁদের হুশ হয় নাই। পরে বহুদিন পরে জেনারেল আইউবের দ্বারা পাকিস্তানে গণতন্ত্রের হত্যাকাণ্ডের পর বড় দেরিতে পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের কেউ-কেউ শেখ আবদুল্লাকে বুঝিতে পারিয়াছিলেন। বর্তমান সময়ে অনেকেই সে কথা স্বীকার করেন। কিন্তু আমার ক্ষুদ্র অভিমত এই যে পাকিস্তানে গণতন্ত্র হত্যার ফলে আমাদের কাশ্মির গণ-ভোটের দাবি অতিশয় দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে।
