৫. নির্বোধের প্রতিবাদ
কিন্তু পাক-ভারত সমঝোতা যে কঠিন কাজ, এটা দিলি বসিয়াই আমি টের পাইলাম। নয়াদিল্লিতে আমার মধু লইয়া আসা ও পাকিস্তান-হিন্দুস্থানকে ভারত মায়ের যমজ সন্তান বলায় ‘মর্নিং নিউয’ ও অন্যান্য মুসলিম লীগবাদী খবরের কাগ আমার বিরূপ সমালোচনা করিতেছেন, তা আমি দিল্লিতেই পড়িলাম। অপর দিকে কলিকাতার একটি ইংরাজী দৈনিক চুক্তি সম্পাদনের পরেপরেই এক জোরালো সম্পাদকীয়তে লিখিলেন : আমরা আগেই বলিয়াছিলাম, নয়াদিল্লির কর্তাদেরে হুশিয়ার করিয়াছিলাম যে আবুল মনসুর মুখে মধু লইয়া আসিয়াছেন বটে, কিন্তু অন্তরে আনিয়াছেন বিষ। আবুল মনসুরের মধু দেখিয়া ভারতীয় নেতারা এমন বিভ্রান্ত হইয়াছিলেন যে আবুল মনসুর তাঁদের পিঠে হাত বুলাইয়া চোখে ধুলি দিয়া সবগুলো অধিকার আদায় করিয়া নিলেন। ভারতের কর্তারা টেরই পাইলেন না।
ভাবখানা এই যে ভারতের যেন সিন্দুক মারা দিয়াছে। একটা বাণিজ্য-চুক্তি মাত্র। উভয় পক্ষের লাভ-লোকসান বিবেচনা করিয়াই এটা করা হইয়াছে। উভয় পক্ষের অভিজ্ঞ অফিসাররাই এ সবের খুটি-নাটি ভাল-মন্দ বিচার করিয়াছেন। কোনও এক বিষয়ে এক পক্ষকে এক-আধটুক বিশেষ সুবিধা দেওয়া হইয়া থাকিলেও অন্য দিকে নিশ্চয়ই তা পোষাইয়া নেওয়া হইয়াছে। তা নাও যদি হইয়া থাকে তবু দেশের সর্বনাশ হইয়া যাইবে না। এটা জানিয়াও ভারতের ঐ কাগটি শুধু আমাকে ‘বিষকুম্ভ পয়েমুখ বলিলেন না। নিজের দেশের সরকারকে নির্বোধ প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করিলেন।
এরাই ভারতে পাকিস্তানের ‘মর্নিং নিউয’-ওয়ালাদের জবাব, প্রতিবিম্ব, কাউন্টার পার্ট। এরা পাক-ভারত মৈত্রী চায় না। এরা বিশ্বাস ও অনুভব করে যে পাক-ভারত সম্প্রতি স্থাপিত হইয়া গেলে এদের এডিটরিয়াল লিখিবার বিষয় থাকিবে না। স্বাধীনতার আগে এক পক্ষ মুসলিম লীগ, তার আদর্শ ও নেতৃবৃন্দকে, অপর পক্ষ কংগ্রেস, তার আদর্শ ও নেতৃবৃন্দকে, গালদিয়া সাংবাদিকতা করিত। হিন্দু-মুসলিম, কংগ্রেস-লীগ বা গান্ধীজিন্না মিলনের কথা শুনিলেই এরা আঁকিয়া উঠিত। গেল গেল বুঝি এদের দম আটকাইয়া। হায়াত ফুরাইয়া। প্রধানতঃ এদের চেষ্টাতেই সকলের বাঞ্ছিত ও প্রার্থিত সমঝোতা হয় নাই। এদেরই প্রচার-ফলে পাকিস্তানে শেখ আবদুল্লা ও আবদুল গফফার খাঁকে এবং হিন্দুস্থানে শহীদ সুহরাওয়ার্দীকে বরাবর ভুল বুঝা হইয়াছে। উপমহাদেশ ভাগ হইয়া দুইটি সার্বভৌম রাষ্ট্র যে স্থাপিত হইয়াছে, সেটাও মূলতঃ হইয়াছে হিন্দু-মুসলিম কংগ্রেস-লীগ ও গান্ধীজিন্নার ঐক্যেরই ফল স্বরূপ। যে দাবির জন্য দুই দলে ঝগড়া হয়, সেটা মিটিয়া গেলে দুই দলে প্রীতি স্থাপিত হইবার কথা। কিন্তু দশ বছরেও আমাদের মধ্যে তা হয় নাই। কেন হয় নাই? কারণ উভয় দেশেই ‘মনিং নিউয’ শ্রেণীর সংবাদপত্র আছে। কংগ্রেস ও লীগকে হিন্দু ও মুসলমানকে গাল দেওয়ার অভ্যাস এরা ছাড়িতে পারে নাই। তাই পরিবর্তিত পরিবেশেও এরা ভারত ও পাকিস্তানকে গাল দিয়া চলিয়াছে। আগে হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলমানের, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের অভিযোগ ও রাগ-বিদ্বেষের কারণ ছিল। অপর পক্ষেরও ছিল। এখন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অভিযোগের ও রাগ বিদ্বেষের কারণ আছে। অপর পক্ষেরও আছে। আগে ঐগুলি খোঁচাইয়া, বিদ্বেষে ইন্ধন যোগাইয়া এরা সাংবাদিকতা ও রাজনীতি করিত। বর্তমানে এইগুলো খোঁচাইয়া বিদ্বেষে ইন্ধন যোগাইয়া সাংবাদিকতা ও রাজনীতি করে। আগের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ সবারই ভাল জানা আছে। এখনকার অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগও কম না। এপক্ষ হইতে বলা চলে : ‘আমরা দাবি মত জমি পাই নাই; ভারত পাকিস্তান ধ্বংস করিবার চেষ্টা করিতেছে। তাঁরা অন্তর দিয়া দেশ-বিভাগ মানিয়া লয় নাই।‘ ইত্যাদি ইত্যাদি। অপর পক্ষ হইতে বলা চলে : ‘ইংরাজের পৃষ্ঠপোষকতায় কংগ্রেসের দুর্বলতায় এই অস্বাভাবিক দেশ বিভাগ হইয়াছে। ভারত-ভূমির বই দ্বিধাবিভক্তি কিছুতেই মানিয়া লওয়া যাইতে পারে না।’ ইত্যাদি। ভারতে মুসলমানদের এবং পাকিস্তানে হিন্দুদের উপর ভীষণ যুলুম চলিতেছে, এ কথা উভয় পক্ষই খুব জোরের সাথে বলিতে পারে। এসব কথা বলিয়া উভয় দেশের লোক ক্ষেপানো যাইতে পারে এবং এরা তাই করিতেছে। ফলে দেশ-বিভাগের আগে যেমন উভয় সম্প্রদায়কে সর্বদাই সাজ-সাজ যুদ্ধং দেহি ভাবে উদ্দীপিত করা যাইত এবং হইত, এখনও তেমনি উভয় দেশের সরকার ও জনতাকে সাজ-সাজ যুদ্ধং দেহি ভাবে উদ্দীপিত করা যায় এবং হয়। আগে মহল্লায়-মহল্লায় লাঠি-সোঁটা যোগাড় করিয়া সম্ভাব্য দাংগায় ‘আত্মরক্ষার আয়োজন করা হইত। এখন উভয় দেশের দেশ রক্ষা দফতরের খরচ বাড়াইয়া যুদ্ধাস্ত্র আমদানি ও প্রস্তুত করিয়া আত্মরক্ষার আয়োজন চলিতেছে। আগে গরিবের শ্রমের পয়সা বা ভিক্ষার চাউল দিয়া লাঠি-সোটা যোগাড় হইত শ্রমিক ও ভিক্ষুককে উপাস রাখিয়া। এখন জনসাধারণের অজ্ঞতার সুযোগে সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজ বন্ধ রাখিয়া ফরেন এইডে’ অস্ত্র যোগাড় করা হইতেছে দেশবাসীকে ভুকা রাখিয়া।
৬. নেহরুর সাথে নিরালা তিন ঘন্টা
এ সব কথাই আলোচনা হইয়াছিল পন্ডিত নেহরু ও মওলানা আযাদের সাথে। বাণিজ্য-চুক্তি-বৈঠক শেষে আমরা দেশে ফিরিবার আয়োজন করিতেছি। এমন সময়, প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু দাওয়াত দিলেন তাঁর সাথে বোম্বাই যাইতে। আমি রাজি আছি কি না। ব্যাপার এই যে বোষের নিকটবর্তী টোম্বে নামক স্থানে পাক-ভারতের প্রথম এটমিক রিসার্চ রিয়েক্টর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। উহাই উদ্বোধন করিবার জন্য পণ্ডিত নেহরু বোঝাই যাইতেছেন। করাচি হইতেই উহার দাওয়াত আমি পাইয়াছিলাম। কিন্তু দিল্লি আসার দরুন আমার সে দাওয়াত রাখার প্রশ্নই উঠিতে পারে না বলিয়া আমাদের এটমিক কমিশনের চেয়ারম্যান ডাঃ নাযির আহমদকেই পাকিস্তান সরকারের পক্ষে দাওয়াত রাখিতে বলিয়া আসিয়াছিলাম। বাণিজ্য-সেক্রেটারি মিঃ আযিয় আহমদকে সে কথা বলিলে তিনি ভারতীয় অফিসারদের সাথে পরামর্শ করিয়া বলিলেন ডাঃ নাযির আহমদ দাওয়াত রাখিলেও আমার যাওয়ায় কোনও অসুবিধা নাই। বরঞ্চ মন্ত্রী-স্তরে দাওয়াত রাখিলে ভারত-সরকার আরও খুশী হইবেন। আমি নেহরুজীকে আমার সম্মতি জানাইলাম। আমার সংগে আমার স্ত্রী ও ছোট ছেলে মহফুয় আনাম (তিতু মিয়া) যাইবে, সে কথাও জানাইলাম। বোম্বাই সরকারকে সে-মত এত্তেলা দেওয়া হইল। বোম্বাইর গবর্নর মিঃ শ্রীপ্রকাশের মেহমানরূপে গবর্নর হাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হইল। কথা হইল, আমি আমার স্ত্রী-পুত্রসহ প্রধানমন্ত্রীর সাথে প্রেসিডেন্টের ‘বিশেষ প্লেইনে’ যাইব। আমার অফিসাররা যাত্রীবাহী সার্ভিসের বিমানে যাইবেন।
