ভারত সফর এই পরিবেশে আমাদের বাণিজ্য-চুক্তির আলোচনা শুরু হইয়াছিল বলিয়াই আমাদের নয়া দিল্লি গমন এমন সফল হইয়াছিল। আমরা করাচি হইতে যেসব প্রস্তাব ও শর্ত যে আকারে লইয়া আসিয়াছিলাম, প্রায় সবগুলিই সেইরূপেই গৃহীত হইয়াছিল। বাণিজ্য সেক্রেটারি জনাব আযিয আহমদ খুটি-নাটি নির্ধারণে ও চুক্তির ভাষা রচনায় সম্পূর্ণ দক্ষতার পরিচয় দেন। ঐ দক্ষতার জন্য আমি তাঁর তারিফ করিতে গেলে তিনি হাসিয়া বলিয়াছিলেন : ‘সার, সব কৃতিত্ব আপনার। কারণ সর্বত্র আপনি মধু মাখাইয়া রাখিয়াছিলেন।‘ দেখিলাম, আযিয় আহমদ সাহেবের ভারতের প্রতি বিরূপ মনোভাবের অনেক পরিবর্তন হইয়াছে।
সরকারী কাজ ছাড়া নয়া দিল্লিতে আমি দুইটা বেসরকারী কাজ করিয়াছিলাম। একটা মওলানা আজাদ সাহেবের সংগে মোলাকাত। অপরটি মনের মত, বোধ হয় শেষবারের মত, পুরান দিল্লি দেখিয়া লওয়া। দ্বিতীয় কাজটির ব্যাপারে আমার স্ত্রী আরও বেশি করিয়াছিলেন। আমাদের সরকারী বৈঠকাদির ফাঁকে-ফাঁকে সব দর্শনীয় বস্তু মায় আগ্রার তাজমহলাদি দেখিয়া লইয়াছিলেন। ফলে সরকারী কাজের শেষে আমি যখন মোগল-পাঠান দিল্লির দর্শনীয় বস্তুসমূহ দেখিতে বাহির হইলাম, তখন তিনি আমার আগে-আগে চলিয়া এবং আমাকে এটা-ওটা বুঝাইয়া এমন ভাবখানা দেখাইলেন, যেন বাংগালকে তিনি হাইকোর্ট দেখাইতেছেন।
মওলানা আযাদের সাথে দেখা না করিয়া নয়াদিল্লি ছাড়িব না, একথা আগেই স্থির করিয়া রাখিয়াছিলাম। বন্ধুবর হুমায়ুন কবিরকে আগেই সেকথা বলিয়া রাখিয়া ছিলাম। হুমায়ুন কবির তখন মওলানার সেক্রেটারি হইতে স্টেট-মিনিস্টারের পদে উন্নীত হইয়াছেন। তবু যোগাযোগ আগের মতই আছে। কাজেই আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থার তিনি ভার নিলেন। একবেলা সেখানে খাওয়ার কথা উঠিলে অফিসাররা বলিলেন তার সময় হইবে না। কারণ আমাকে আমার প্রতিপক্ষ অর্থাৎ শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রী মিঃ মুরারজী দেশাইর ওখানে একটি পারিবারিক ডিনার খাইতে হইবে।
৩. দেশাইর ডিনার
সত্য-সত্যই মিঃ দেশাই একদিন মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষে আমাকে দাওয়াত করিলেন এবং আমার স্ত্রীকে দাওয়াত করিবার জন্য দরবার হল হইতে আমার সুইটে আসিলেন। আগেই বলিয়াছি নিযাম ভবনেরই একটি কনফারেন্স হলে আমাদের বাণিজ্য চুক্তির কনফারেন্স হইতেছিল। নির্ধারিত সময়ে মিঃ দেশাইর বাড়িতে গেলাম। দেখা গেল, পারিবারিক-ডিনার সত্য-সত্যই পারিবারিক। ছোট একটি ডিনার টেবিলে ছয়জনের বসিবার ব্যবস্থা। মিঃ ও মিসেস দেশাই, আমি ও আমার স্ত্রী। আমার নয় বৎসরের ছোট ছেলেটার প্রতিপক্ষ রূপে ঐ বয়সের তাঁদের একটি ছেলেকে টেবিলে বসান হইয়াছে। খানার আগে খানার পরে মোট ঘন্টা দুই আমরা নীরবে শান্তিতে অফিসার সংগহীন অবস্থায় একা-একা আলাপ করিতে পারিয়াছিলাম। তাতে দেশাই পরিবারের প্রতি আমরা সকলে এবং মিঃ দেশাইর প্রতি আমি আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছিলাম। তিনি ভয়ানক গোড়া ব্রাহ্মণ হিন্দু, একথা আগেই শুনিয়াছিলাম। পারিবারিক ডিনারের দাওয়াত কূটনৈতিক ব্যবস্থার কোন অংশ নয়। মিঃ দেশাই এ ধরনের পারিবারিক ডিনারের দাওয়াত আর কোনও বিদেশী শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রীকে করেন নাই বলিয়াও সকলে বলাবলি করিলেন। আমাকেই কেন তিনি এই ধরনের দাওয়াত করিলেন, তাও কেউ বুঝিলেন বলিয়া মনে হইল না। কাজেই আমি যথেষ্ট সংকোচ ও দ্বিধার মধ্যেই মিঃ দেশাইর বাড়িতে আসিয়াছিলাম। কিন্তু তাঁদের ব্যবহারে আদর-যত্নে আলাপে-আলোচনায় আমাদের সকল দ্বিধা-সংকোচ দূর হইয়া গেল। নিষ্ঠাবান হিন্দু ব্রাহ্মণের বাড়িতে ডিনার খাইয়া আমরা মুগ্ধ হইলাম। নিষ্ঠাবান গোড়া হিন্দু সত্যই। মাছ-গোশূতের কোনও বালাই নাই। কিন্তু মাছ-গোশত ছাড়াও কি উপাদেয় ডিনার হইতে পারে তা দেখাইয়া দিলেন মিসেস দেশাই। নিজ হাতে পাক করিয়াছেন; নিজ হাতে পরিবেশন করিলেন। নিজে আমাদের সাথে টেবিলে বসিয়া খাইলেন। আমার স্ত্রীর সাথে মিসেস দেশাইর বনিলও ভাল। উনার বোম্বাইয়া হিন্দী আর ইনার বাংগালী উর্দু। মিলিল ভাল। দুই ঘন্টা কাটাইতে তাঁদের কোনও অসুবিধা হইল না। ভাষা না বুঝিলেও বোধ হয় চলিত। নারীরা নাকি ভাষার চেয়ে চোখ-মুখ ও হাতের ইশারায়ই কথা বলে বেশি। মানুষ চিনিবার ও বন্ধু বাছিবার পক্ষে নাকি তাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আর আমরা পুরুষরা দুইজন আমাদের নিজস্ব দফতরের আলোচনাতেই বেশিক্ষণ কাটাইলাম। পাক-ভারতের সম্পর্কের কথা বিশেষ বলিলাম না বোধ হয় উভয় পক্ষ হইতে ইচ্ছা করিয়াই। কাজেই শিল্প ও বাণিজ্যের ব্যাপারে আমরা কে কি করিতে চাই তার আলোচনাতেই কাল কাটাইলাম।
৪. মওলানা আযাদের খেদমতে
পরদিনই গেলাম মওলানা আযাদ সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিতে। বন্ধুবর হুমায়ুন কবির আমাদের সংগে গেলেন। আর থাকিলেন সেখানে মওলানা সাহেবের প্রাইভেট সেক্রেটারি মিঃ খোরশেদ। আলাপ তিনজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় খুবই প্রাণখোলা হইল যাকে বলে হার্ট-টু-হার্ট। প্রায় এক ঘন্টা থাকিলাম। কাজেই অনেক কথা হইল। পাক-ভারত সম্পর্ক, ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা, পাকিস্তানের ভবিষ্যত ইত্যাদি ইত্যাদি। অত বড় পণ্ডিত অত বড় আলেম বিশ্ব-রাজনীতির এত সূক্ষ্মদর্শী বিচারক যেসব কথা বলিলেন, তার সবই শুনিবারও চিন্তা করিবার বস্তু। সুতরাং গোগ্রাসে গিলিলাম। কিন্তু আমাদের নিজেদের আশু বিচার্য ও কর্তব্য সম্বন্ধে তিনি যা বলিয়াছিলেন, সেটাই মাত্র সংক্ষেপে স্মরণ করিতেছি। তিনি যা বলিলেন তার সারমর্ম এই : ‘আমি সারা অন্তর দিয়া সমস্ত শক্তি দিয়া পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করিয়াছি। আজ তেমনি সারা অন্তর দিয়া পাকিস্তানের স্থায়িত্ব ও সাফল্য কামনা করিতেছি। শক্তি থাকিলে এ কাজে সহায়তাও করিতাম। পাকিস্তান না হইলে ভারতীয় মুসলমানদের ক্ষতি হইত, এটা আমি আগেও বিশ্বাস করিতাম না, এখনও করি না। কিন্তু পাকিস্তান যখন একবার হইয়া গিয়াছে, তখন ওটাকে টিকিতেই হইবে এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র হইতে হইবে। না হইলে শুধু পাকিস্তানের মুসলমানদের নয় ভারতের মুসলমানদেরও ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তোমরা পাকিস্তানীরা সর্বদা একথা মনে রাখিও। এ জন্য দরকার পাক-ভারতের মধ্যে বাস্তব বুদ্ধিজাত সম্মানজনক সমঝোতা। তার জন্য তোমরা তৈয়ার হও। আমি যতদিন আছি, নেহরু যতদিন আছেন, এদিকে সহানুভূতির অভাব ততদিন হইবে না।‘ চিন্তাভারাক্রান্ত মনে মওলানা সাহেবের নিকট হইতে বিদায় হইলাম।
