স্টেশন হইতে সোজা হাসপাতালে নেওয়া হইল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ যত্ন নিলেন। বিশেষতঃ ডাঃ শামসুদ্দিন ও ডাঃ আসিরুদ্দিন দিন-রাত খাঁটিলেন। চারদিনের দিন অপরের কাঁধে ভর করিয়া দাঁড়াইতে পারিলাম। প্রাইম মিনিস্টার যরুরী বার্তা পাঠাইলেন : ‘অসম্ভব না হইলে এখনি চলিয়া আস’। ডাক্তাররা সম্মতি দিলেন বটে কিন্তু বলিলেন, আর কয়েকটা দিন থাকিয়া গেলে সম্পূর্ণ সারিয়া উঠিতাম।
অপরের কাঁধে অ করিয়া বিমান বন্দরে গেলাম। ধরাধরি করিয়া বিমানে তোলা হইল। করাচিতেও সেইভাবে পৌঁছিলাম। ধরাধরি করিয়া বাসার দুতলায় ভোলা হইল। আমার অবস্থা দেখিয়া প্রধানমন্ত্রী আমার দূতালায় কেবিনেট মিটিং নিলেন। ভ্রমণের ঝাঁকিতে আমার অবস্থা খারাপ হইয়াছিল। বিছানায় শুইয়া আমি কেবিনেট করিলাম। অর্থাৎ আমার শোবার ঘরেই কেবিনেট মিটিং হইল। বিছানা ছাড়িবারও আমার শক্তি ছিল না।
অথচ ঘটনাচক্রে এটাই সেই কেবিনেট-সভা যাতে অন্যান্য ব্যাপারের সাথে পাক-ভারত বাণিজ্য চুক্তির পাকিস্তানের পক্ষের দাবি-দাওয়া স্থিরীকৃত হইবে। সেইজন্যই প্রধানমন্ত্রী আমাকে যরুরী তাগাদা দিয়া ঢাকা হইতে আনিয়াছেন এবং আমার উপস্থিতির ব্যবস্থা হিসাবে আমার শোবার ঘরেই কেবিনেট মিটিং দিয়াছেন। আমি বাণিজ্য সেক্রেটারি মিঃ আযিয আহমদকে আগেই তৈয়ার করিয়া রাখিয়াছিলাম। কেবিনেট সেক্রেটারিয়েট হইতে প্রচারিত হইবার আগেই মিঃ আযিয় আহমদের রচিত কাজের কাগযপত্র (ওয়ার্কিং পেপার) আমাকে দেখাইয়া নেওয়া হইয়াছিল। কাজেই আমার বিশেষ কিছু বলিতে হইল না। মাঝে-মাঝে মিঃ আযিয় আহমদের কথার ঈষৎ সংশোধন করিয়া আমার মনোভাব প্রকাশ করিতে হইয়াছিল মাত্র। কেবিনেট আমার সবগুলো প্রস্তাব গ্রহণ করিল। কিন্তু সংকট দেখা দিল আমার দিল্লি যাওয়া লইয়া। আমি বর্তমানে দিল্লি যাওয়ার সম্পূর্ণ অযোগ্য। এটা মন্ত্রী স্তরের আলোচনা। শুধু সেক্রেটারি দিয়া হইবে না। মন্ত্রী একজনকে পাঠাইতেই হইবে। অথচ অন্য কোনও মন্ত্রী দিয়া আমার ভরসা নাই। প্রধানমন্ত্রীও আর কাহাকেও পাঠাইতে রাযী নন। মিঃ আযিয আহমদেরও মত তাই। আমাকেই যাইতে হইবে। তবেই দিল্লির বৈঠক পিছাইতে হয়। এদিকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হইতেও বেশি বাকী নাই। আমাকে আরোগ্য হইয়া দিল্লি যাওয়ার যোগ্য হওয়াতক বর্তমানে চুক্তির মেয়াদ বাড়ান দরকার। ডাক্তারদের মত নেওয়া হইলঃ পনর দিনের কমে আমাকে খাড়া করা। যাইবে না। ভারত সরকারকে সব অবস্থা বলিয়া চলতি বাণিজ্য-চুক্তি এক মাস বাড়াইয়া দেওয়া হইল। পনর-বিশ দিন পরে একদিন দিল্লি যাওয়ার দিন তারিখ করা হইল।
২৪. ভারত সফর
ভারত সফর
চবিশা অধ্যায়
১. পাক-ভারত বাণিজ্য চুক্তি
যথাসময়ে এক হাতে লাঠিতে অপর হাতে অন্যের কাঁধে ভর করিয়া দিল্লি গেলাম বোধ হয় ১৯৫৭ সালের ১৭ই জানুয়ারি। অফিসারদের এক বাহিনী সাথে গেলেন। তার উপর গেলেন আমার স্ত্রী ও ছোট ছেলে মহফুয আনাম ওরফে তিতু মিয়া। তার বয়স তখন মাত্র ন বছর। দিল্লি বিমান বন্দরে ভারতের শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রী মিঃ মুরারজী দেশাই আমাদের অভ্যর্থনা করিলেন। আমার থাকার ব্যবস্থা হইল নিয়াম-ভবনে। বিরাট ও বিশাল শাহী বালাখানা। এলাহি কারখানা। অফিসারদেরে স্থান দেওয়া হইল অশোক হোটেলে। কূটনৈতিক জগতে বিস্ময় সৃষ্টি করিয়া আমি রাষ্ট্রপতি ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ ও প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরুর জন্য দুই হাড়ি মধুপুরের মধু লইয়া গিয়াছিলাম। বক্তৃতায় বলিলাম : পাকিস্তানের জনগণ ভারতের জনগণের সাথে যে প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন করিতে চায় তারই প্রতীক এই মধু। পাকিস্তান ও ভারত উভয়েই ভারত মাতার যমজ-সন্তান। দুই সহোদর। ভারতীয় কাগযে ’সাধু সাধু’ রব ধ্বনিত হইল।
প্রেসিডেন্ট ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ ও প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরুর পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ সহানুভূতির ফলে আমাদের সমস্ত দাবি-দাওয়াই চুক্তিতে গৃহীত হইল। চুক্তির মেয়াদ আমাদের দাবি মত তিন বছর করা ছাড়াও তিনটি বিষয়ে ভারত আমাদের প্রতি বিশেষ বন্ধুত্বের পরিচয় দিল : (১) প্রচলিত ছয় লক্ষ বেলের জায়গায় আঠার লক্ষ বেল পাট আমদানি করিতে রাযী হইল; (২) ৫০ হাজার টন ভারতীয় সিমেন্ট পূর্ব পাকিস্তানে দিয়া তার বদলা ঐ পরিমাণ সিমেন্ট পশ্চিম পাকিস্তান হইতে নিতে রাযী হইল। (৩) পূর্ব-পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সমস্ত কয়লা সরবরাহ করিতে এবং রেলযোগে পূর্ব-পাকিস্তান রেল-মুখে পৌঁছাইয়া দিতে রাযী হইল। জিরাতিয়াদের সমস্যার সমাধান হইল। একবার প্রীতির ভাব প্রতিষ্ঠিত হইয়া গেলে উদারতার দরজাও প্রসারিত হয়। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের তাই হইল। উভয় পাকিস্তানের মধ্যে স্থলপথে যোগাযোগের জন্য ভারতের মধ্যে দিয়া থুরেল চালাইবার যে স্বপ্ন আমরা দেখিয়াছিলাম, ভারতের নেতৃবৃন্দ সে প্রস্তাবও বিবেচনা করিতে রাযী হইলেন। কথা হইল উভয় দেশের রেল মন্ত্রীদ্বয় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন।
২. পাক-ভারত সম্পর্কে নূতনত্ব
আমাদের আলোচনার মধ্যে যে প্রীতি-সদ্ভাবের আবহাওয়া বিরাজ করিতেছিল, তা শুধু কূটনৈতিক ভাষার প্রতি সদ্ভাব ছিল না। অনেকটা আন্তরিক সদ্ভাব ছিল। বাণিজ্য চুক্তি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় বিষয় হইলেও আমি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান সরকারদ্বয়কে গোড়া হইতেই পাক-ভারত বাণিজ্য আলোচনায় শামিল করিয়াছিলাম। এই উদ্দেশ্যে আমার বিশেষ আমন্ত্রণে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব আতাউর রহমান খাঁ ও শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রী মিঃ মোযাফফর হুসেন কিযিলবাস তাঁদের অফিসার দলসহ দিল্লিতে উপস্থিত হইয়াছিলেন। দিল্লি পৌঁছিয়াই আমি প্রথম কাজ করি পণ্ডিত নেহরুর সংগে সাক্ষাৎকার। জনাব আতাউর রহমান ও জনাব মুজিবুর রহমান এ সাক্ষাৎকারে শামিল ছিলেন। জনাব সুহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বর্তমান পাকিস্তান সরকার যে ভারতের সাথে সত্যিকার বন্ধু ভাবে যার-তার আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে শান্তি ও প্রীতিতে বাস করিতে চান, সে কথা আমরা পণ্ডিত নেহরুকে বুঝাইবার চেষ্টা করি। পাক-ভারত সম্পর্ক সম্বন্ধে মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগের মতাদর্শের বুনিয়াদী পার্থক্য আমরা তাঁকে বুঝাইয়া দেই। এটা বিশেষভাবে দরকার হয় এইজন্য যে ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের এক প্রভাবশালী শ্রেণীর মনোভাব আমাদের নেতা সুহরাওয়ার্দীর প্রতি অতিশয় বিরূপ ছিল। পাকিস্তান সংগ্রামের সময়ের এবং পাকিস্তান হাসিলের পরের ভূমিকায় জনাব সুহরাওয়ার্দী এপ্রোচের পার্থক্য গণতান্ত্রিকতা যৌক্তিকতা ও নির্ভুলতার দিকে আমরা পণ্ডিত নেহরুর দৃষ্টি আকর্ষণ করি। আমরা দেখিয়া পুলকিত হই যে জনাব সুহরাওয়ার্দীর প্রতি পণ্ডিত নেহরুর মনোভাব সাধারণ হিন্দু-মনোভাব হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তিনি স্পষ্টই বলেন যে, সুহরাওয়ার্দী-নেতৃত্বে পাক-ভারত সম্পর্কের মধ্যে উভয় পক্ষ হইতে বাস্তববাদী দৃষ্টিভংগির উন্মেষ হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। জনাব আতাউর রহমান ও জনাব মুজিবুর রহমান বিশেষভাবে পূর্ব-পাকিস্তানের অভাব-অভিযোগঞ্জর উল্লেখ করেন। পূর্ব-পাকিস্তান চার দিক দিয়া ভারত-বেষ্টিত। পূর্ব-পাকিস্তানবাসীর শান্তিপূর্ণ নিরাপত্তা-বোধ অনেকখানি নির্ভর করে ভারত সরকার এবং পশ্চিম বাংলা ও আসাম সরকারের নীতি ও মনোভাবের উপর। আমরা দেখিয়া সুখী হইলাম যে পণ্ডিত নেহরু পূর্ব-পাকিস্তানের অসুবিধা-অভিযোগের প্রতি সম্পূর্ণ সচেতন ও সহানুভূতিশীল। আমরা আন্তরিক সৌহার্দের মধ্যে আমাদের সাক্ষাৎকার সমাপ্ত করিলাম।
