বাণিজ্য-দফতর সম্বন্ধে এই ব্যবস্থা করিয়া আমি পূর্ব-পাকিস্তান সফরে আসিলাম। পূর্ব-পাকিস্তানের সিমেন্ট ও চিনি-শিল্প পরিদর্শন এবারের সফরের আমার বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। পূর্ব-পাকিস্তানের আমদানি-রফতানি কন্ট্রোলার পদের জন্য একজন উপযুক্ত অফিসার তালাশও এ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। এই নূতন পদটি সৃষ্টি করিয়া অবধি এ বিষয়ে খুবই চিন্তাযুক্ত ছিলাম। পদটি যে কত বড় বিশাল দায়িত্বপূর্ণ পদ সেটা আমি ভাল করিয়াই বুঝিলাম। যাকে-তাকে এ পদ দেওয়া যাইবে না। সততা, সাধুতা ও সাহস এ পদের জন্য অত্যাবশ্যক। আমি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সুহরাওয়ার্দী ও প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান উভয়ের সংগেই আলোচনা করিয়াছিলাম। তাঁরা বিভিন্ন অফিসারের নাম করিয়াছিলেন। মনে-মনে তাঁদেরই তালিকা করিয়া নিজে দেখিবার জন্যই এবারে পূর্ব-পাকিস্তানে আসিলাম।
সিমেন্ট সম্পর্কে পূর্ব-পাকিস্তানের চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সংগে পরামর্শ করিয়া ঢাকা-সিলেট বসিয়াই সিদ্ধান্ত করিলাম ও আদেশ দিলাম। সাপ্লাই এণ্ড ডিভেলাপমেন্ট-এর ডিরেক্টর জেনারেল মিঃ বি. এ. কোরেশীকে সংগে লইয়াই আসিয়াছিলাম। তাঁকে সংগে নিয়াই ছাতক সিমেন্ট ফেক্টরিতে গেলাম। ফেক্টরি কর্তৃপক্ষের সংগে আলাপ করিয়া বুঝিলাম, এই পরিমাণ টাকার মেশিনারি আমদানি লাইসেন্স পাইলে ছয় মাসের মধ্যে তাঁদের ফেক্টরিতে সাতচল্লিশ হাজারের জায়গায় এক লক্ষ টন সিমেন্ট উৎপাদন করিতে পারেন। তাঁরা বলিলেন : দুই-তিন বৎসর ধরিয়া তাঁদের দরখাস্ত কেন্দ্রীয় সরকারের দফতরে পড়িয়া আছে। মিঃ কোরেশীকে জিগাসা করিয়া ওঁদের অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পাইলাম। তৎক্ষণাৎ আমি প্রয়োজনীয় পরিমাণে লাইসেন্স ইস্তর আদেশ দিয়া দিলাম। সে লাইসেন্স তাঁরা পাইয়াছিলেন। সিমেন্ট উৎপাদনও প্রায় একলক্ষ টন করিয়াছিলেন। কিন্তু মন্ত্রী হিসাবে তা দেখিয়া আসিতে পারি নাই।
কনট্রোলার পদের জন্য উপযুক্ত অফিসারও আমি এই সফরেই পাইয়াছিলাম। ইনি ছিলেন মিঃ শফিউল আযম। তিনি তখন খুলনার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। আমি তাঁর সাথে কথা বলিয়া তাঁর কাজ-কর্ম দেখিয়া এতই সন্তুষ্ট হইলাম যে তাঁকে আমার কাজের জন্য সবচেয়ে যোগ্য লোক মনে করিলাম। তৎক্ষণাৎ সেইখানে বসিয়াই তাঁকে আমার অভিপ্রায় জানাইলাম। তিনি স্বভাবতঃই খুশী হইলেন। কিন্তু আপত্তি জানাইলেন এবং আপত্তির কারণও প্রকাশ করিলেন। চাটগাঁয় কনট্রোলার অফিস। চাটগাঁ তাঁর বাড়িও। কাজেই আত্মীয়-স্বজনের চাপ পড়িবে। চাকরিটাও ত চাপের চাকরি। কাজেই তিনি অসুবিধায় পড়িবেন। আমি মনে মনে ভাবিলাম। এই রকম বিবেকবান লোকই ত আমি চাই। বলিলাম : ‘তোমার আপত্তি আমি মানিলাম না। তুমি প্রস্তুত হও।’ তিনি প্রস্তুত হইয়াছিলেন। আমি করাচি ফিরিয়াই তাঁকে সেখানে কয়েকদিন ট্রেনিং দেওয়াইলাম। আমার পরিকল্পনা ও চিন্তাধারার সাথে তাঁকে পরিচিত করিয়া চাটগাঁ কনট্রোলার করিয়া পাঠাইয়া দিলাম। তিনি পরম যোগ্যতা ও সাধুতার সাথে সে কাজ চালাইলেন।
১৫. দুর্ঘটনায় আহত
কিন্তু চিনি-শিল্প সম্বন্ধে কিছুই সুবিধা করিতে পারিলাম না। প্রথম মিলদর্শনা শুগার মিল পরিদর্শন করিতে গিয়া সেখানেই দুর্ঘটনায় আহত হইলাম। দুর্ঘটনাও একেবারে অদ্ভুত এ্যাসিডেন্ট। সারা মিল ভন্ ভন্ করিয়া ঘুরিলাম। ষাট বৎসরের বুড়া তরুণ সাহেব ম্যানেজারদের আগে-আগে এক শ ফুট উঁচা লোহার রডের সিঁড়ি বাহিয়া সুউচ্চ ট্যাংকগুলির মাথায় উঠিলাম নামিলাম। তরুণ সাহেবরা বলিলেন : আমার চলাফেরা দেখিয়া তাঁরা পর্যন্ত ঘাবড়াইয়া যাইতেছেন। কিন্তু কিছু হইল না। সারা মিল দেখিয়া অবশেষে লেবার কোয়ার্টার দেখিতে গিয়াই বিপদে পড়িলাম। গরুর খুড়ের বর্ষাকালের গাতা শুকনার দিনে ‘গোস্পদ’ হইয়া আছে। এই গোস্পদই আগামী বর্ষায় ‘গোস্পদে বিম্বিত যথা অনন্ত, আকাশ’ হইবে। এই গোস্পদের একটিতে আমার ছেলেবেলার-ফুটবল-খেলায় ভাংগা পাটা পড়িল। হাঁটু মচকাইয়া গেল। আমি যে পড়িলাম, আর উঠিতে পারিলাম না। আমাকে ধরাধরি করিয়া সেলুনে আনা হইল। দেখিতে-দেখিতে হাঁটু ফুলিয়া ইয়া-বড় কলাগাছ হইয়া গেল। স্থানীয় সকল ডাক্তার সাধ্যমত চেষ্টা করিলেন। কিছুই হইল না। সেদিনকার সব প্রোগ্রাম ক্যানসেল হইল। ডাক্তাররা উপদেশ দিলেন, আগামী সব প্রোগ্রামও ক্যানসেল করিয়া ঢাকায় ফিরিয়া আসিতে। কিন্তু আমার কপালে আরও কষ্ট ছিল। কাজেই ডাক্তারদের এবং সংগীয় অফিসারদের উপদেশ মানিলাম না। বলিলাম : ‘শেতাবগঞ্জ ও গোপালপুরের কল দেখিয়া যাইব। কাল সকালেই ভাল হইয়া যাইব। এখানে যদি কোনও বিশ্বস্ত হোমিওপ্যাথিক ডিস্পেনসারি থাকে, তবে সেখান হইতে এক মাত্রা আর্নিকা ২০০ আনাইয়া খাওয়াইয়া দেন। তাই করা হইল। আনিকা খাইয়া আমি বাতি নিবাইয়া ঘুমাইয়া পড়িলাম। বলিলাম : ‘পার্বতীপুরের আগে আমাকে কেউ ডাকিবেন না।‘
পার্বতীপুরে আসিয়া দেখিলাম রাজশাহী বিভাগের কমিশনার সংশ্লিষ্ট জিলাসমূহের জিলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ উপস্থিত আছেন। তাঁরা সকলে একমত হইয়া বলিলেন আমার ঢাকায় ফিরিয়া যাওয়া উচিৎ। আমি বুঝিলাম আনিকা বরাবরের মত কাজ করে নাই। কাজেই রাযী হইলাম। তাড়াতাড়ি ঢাকা ফিরা দরকার। কিন্তু ফের ঈশ্বরদী-পোড়াদহ হইয়া ঘুরিয়া যাইতে অনেক সময় লাগিবে। কাজেই ফুলছড়ি হইয়া যাইতে হইবে। কিন্তু ঐ লাইন মিটার গজের। আমি বাহির হইয়াছি ব্রডগজের সেলুনে। সুতরাং সেলুন ছাড়িয়া সাধারণ গাড়ি ধরিতে হইল। শুধু টানা-হেঁচড়া। আর কোনও অসুবিধা না। তারপর ফুলছড়ি ঘাটে ট্রেন হইতে স্টিমারে নেওয়া হইল ইযি চেয়ারে শোওয়াইয়া। ইযিচেয়ার! শুনিতে বড় আরাম। কিন্তু চারজন কুলির কাঁধে যিন্দা লাশের মত প্রায় আধ মাইল যাওয়া, তারপর স্টিমার ঘাটের স্লোপে নামা, খাড়া সিঁড়ি দিয়া দুতলায় উঠা এমন সব কীর্তি-কাণ্ড বোধ হয় মৃত অবস্থায় খুব আরামের কিন্তু যিলা অবস্থায় খুব সুখের নয়।
