১২. বাণিজ্য-দফতরের সেক্রেটারি
বাণিজ্য সেক্রেটারি হিসাবে মিঃ আযিয আহমদের সাথে প্রথম-প্রথম খুব সাবধানে কথা বললাম। তিনি কিন্তু প্রথম হইতেই বিনয়-নম্রতা ও আনুগত্যের পরকাষ্ঠা দেখাইতে লাগিলেন। তথাপি তিনি যে পরিমাণে যত বেশি ভদ্রতা ও আনুগত্য দেখাইলেন, আমি সেই পরিমাণে ততবেশি সাবধান হইলাম।
কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই মিঃ আযিয আহমদের প্রতি আমার ধারণা বদলাইতে লাগিল। আমার প্রতি তাঁর ভক্তি ও আনুগত্যের মধ্যে কোনও চালাকি বা ভন্ডামির আঁচ পাইলাম না। কারণ যেসব ব্যাপারে তিনি আমার সাথে একমত হইতেন না, সেসব বিষয়ে খুব জোরের সংগেই আমার সাথে তর্ক করিতেন। আমাকে অনড় দেখিলে শেষ পর্যন্ত বলিতেন : ‘আমার উপদেশ যা দিবার ছিল, তা দিলাম। আমার কর্তব্য এখানেই– শেষ। এরপর আপনি যে আদেশ দিবেন, তাই বলবৎ হইবে এবং আমি অক্ষরে অক্ষরে তাই পালন করিব। বস্তুতঃ আমাদের শিক্ষা এবং বৃটিশ আমলাতান্ত্রিক ঐতিহ্যই তাই।
আমি তাঁর এই নীতি খুবই পসন্দ করিলাম। আমরা মন্ত্রীরা ভুল করিলে যেসব সেক্রেটারি আমাদের ভুল দেখাইয়া দেন, ভুলটাতেও সমর্থন দিয়া হাঁ হুযুর’ করিয়া আমাদেরে খুশী করেন না, তাঁদেরে আমি খুবই পসন্দ করি। একথা আমি তাঁকে খোলাখুলিই বলিলাম : নিজে কোনদিনই ‘হাঁ হুযুরি’ রাজনীতি করি নাই। অপরে আমার নিকট তা করুক, এটাও আমি চাই না।’
১৩. ভারত ও কমিউনিস্ট দেশের বাণিজ্য
কাজেই মিঃ আযিয আহমদের সহিত আমার বনিল ভাল! আমি ভারতের সাথে ও কমিউনিস্ট দেশের সাথে আমাদের দেশের বাণিজ্যের সম্ভাবনা ও তার ভাল দিক দেখাইলাম। ইতিমধ্যে আমার এক ঘোষণায় বলিয়াছিলাম : ‘আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক রাজনৈতিক সীমান্ত ডিংগাইয়া যাইবে।‘ সে কথাটা তাঁকে বুঝাইয়া-বলিলাম। আমার মতবাদের সমর্থনে ইংরাজ জাতির বাণিজ্য-নীতি, বিশেষতঃ যুদ্ধের সময়েও সে নীতি বলবৎ রাখার প্রথার কথা বলিলাম। মিঃ আযিয আহমদ খুবই মার্কিন ভক্ত হওয়ার এবং পাক-মার্কিন-চুক্তি-আদির দরুন এ ব্যাপারে তাঁর মনে কোনও দ্বিধা সন্দেহ থাকিতে পারে মনে করিয়া আমি তাঁকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম যে ইংরাজের এই বাণিজ্য-নীতিতেও ইংগ-মার্কিন বন্ধুত্বে কোনও বিঘ্ন ঘটে নাই।
আমার এতসব বক্তৃতার পর মিঃ আযিয আহমদ পাক-ভারত বাণিজ্য-ব্যাপারে আমার সহিত একমত হইলেন। কমিউনিস্ট দেশের সাথে বাণিজ্যের ব্যাপারে তিনি রাযী হন কয়েক মাস পরে। তার আগে প্রাইম মিনিস্টার ও প্রেসিডেন্টের সহিত আলোচনা করিতে তিনি আমাকে উপদেশ দেন। এটাকে আমি আমার আংশিক সাফল্য মনে করিলাম। কারণ দেখিলাম, ভারত-বিরোধী মনোভাব তাঁর মুসলিম লীগারদের চেয়েও তীব্র। তবে তিনি ছিলেন বাস্তববাদী। পাকিস্তানের ভালর জন্য তিনি সব কাজে রাযী ছিলেন। অতএব নিছক বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিক দিয়া তিনি আমার মতবাদ গ্রহণ করিলেন। পাক-ভারত বাণিজ্য চুক্তি রিনিউ করিবার সময় আগত-প্রায়। কাজেই আমি তাঁকে আমার সংকল্প বিস্তারিতভাবে বলিলাম। কেবিনেটে পেশ করিবার জন্য কাগ্যপত্র তৈয়ার করিতে আদেশ দিলাম। আমার সংকল্পিত পাক-ভারত বাণিজ্য চুক্তির অন্যতম প্রধান নূতনত্ব ছিল এই যে বরাবরের ন্যায় এক-বৎসর মেয়াদী চুক্তির বদলে আমি তিন-বৎসর-মেয়াদী চুক্তির পক্ষপাতী ছিলাম। তিনি সহজেই আমার মত গ্রহণ করিলেন। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা হইতে দেখা গিয়াছিল যে আমদানি-রফতানি লাইসেন্স ইস্ত করা ও অন্যান্য আনুষংগিক আয়োজন করিতে-করিতেই বৎসরের বেশি সময় উত্তীর্ণ হইয়া যায়। উভয় পক্ষ হইতে মেয়াদ বাড়াইবার জন্য দেন দরবারও করিতে হয়। এতে অনেক সময় আমদানি-রফতানি দ্রব্যের মৌসুম পার হইয়া যায়।
১৪. ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি
ভারতের সাথে বাণিজ্যিক ব্যাপারে আরেকটি বিষয়ে আমার পূর্ব-ধারণা ছিল। এটা পশ্চিম-বাংলায় নির্মিত ছায়াছবির ব্যাপার। পশ্চিমবাংলায় উন্নত ধরনের ছায়াছবির নির্মাণ দ্রুতগতিতে অগ্রসর হইতেছিল। তারই স্বাভাবিক উপসর্গরূপে তথায় অভিনেতা-অভিনেত্রী ও ফিল্ম স্ক্রিপ্ট লেখকও হ হ করিয়া বাড়িতেছিল। পূর্ব বাংলায় ছায়াছবি নির্মাণের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। বইও রচিত হয় নাই। অভিনেতা অভিনেত্রীও পয়দা হয় নাই। এ অবস্থা আমাকে খুবই পীড়া দিত। অথচ এর প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা ও সম্ভাবনা ছিল না। পশ্চিম-বাংলার ছবিতে স্বভাবতঃই পূর্ব-বাংলা ছাইয়া গিয়াছিল। কলিকাতার ছবি-নির্মাতাদেরই এজেন্টরা ঢাকায় বসিয়া ছবি-প্রদর্শনীর ব্যবসা করিত। দুই-একজন পাকিস্তানী যারা কোনও ফাঁকে এই ব্যবসায়ে ঢুকিয়াছিল, তারাও পশ্চিম পাকিস্তানী। পূর্ব-বাংলার ফিল্ম-শিল্প গড়নে তাদের কোনও স্বার্থ বা চেতনা ছিল না। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দু ফিল্ম রচনার যথেষ্ট উদ্যোগ-আয়োজন চলিতেছিল। এসবের প্রতিকার সম্বন্ধে কতিপয় পূর্ব পাকিস্তানী উৎসাহী লোকের সাথে আমি আগেই আলোচনা করিয়াছিলাম। তাতে আমার এই বিশ্বাস হইয়াছিল যে, সরকারী উৎসাহ ও সহায়তা না পাইলে পূর্ব বাংলায় ফিল্ম-শিল্প গড়িয়া উঠিবে না। ফলে মনে-মনে স্থির করিয়াছিলাম গবর্নমেন্ট হাতে পাইলে প্রথম সুযোগেই এটা করিব। সত্যসত্যই সরকার যখন হাতে আসিল, তখন জনাব আতাউর রহমান ও জনাব শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পরামর্শ করিয়া প্রদেশে শিল্প-উন্নয়ন কর্পোরেশন স্থাপন করা ঠিক হইল। আর এদিকে কেন্দ্রে আমি এই সংকল্প করিলাম যে পূর্ব-বাংলায় যারা ফিল্ম-শিল্প গড়নে ওয়াদাবদ্ধ হইবেন, শুধু তাঁদেরই ভারতীয় ফিল্ম আমদানির লাইসেন্স দেওয়া হইবে। আসন্ন পাক-ভারত চুক্তির এটা অন্যতম শর্ত হইবে বলিয়া সেক্রেটারি মিঃ আযিয আহমদকে জানাইয়া দিলাম।
