আমি এইসব সমস্যা লইয়া শিল্প-দফতরের সেক্রেটারি মিঃ আব্বাস খলিলী ও বাণিজ্য দফতরের সেক্রেটারি মিঃ কেরামতুল্লার সাথে এবং তাঁদের সহকারীদের সাথেও বিস্তারিত আলোচনা করিলাম। মিঃ খলিলী এসব ব্যাপারে খুব উৎসাহ ও উদ্যম দেখাইলেন। কিন্তু মিঃ কেরামতুল্লাকে তেমন উৎসাহী দেখিলাম না। আমার মনে হইল, তিনি নিজেই ক্লান্ত ও নিরুৎসাহ হইয়া পড়িয়াছেন। উভয়েই প্রবীণ আই. সি. এস.। অনেকদিন ধরিয়া যার-তাঁর ডিপার্টমেন্টের হেড আছেন। কিন্তু মিঃ কেরামতুল্লাহ যেন প্রাণহীন হইয়া পড়িয়াছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর সংগে আমার স্কিম ও সে সম্পর্কে সেক্রেটারিদের ভাব-গতিকের আলোচনা করিলাম।
১০. সেক্রেটারিয়েটে ওলট-পালট
কয়েক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী অবস্থার প্রতিকার করিলেন। তিনি মিঃ কেরামতুল্লার বদলে মিঃ আযিয় আহমদকে বাণিজ্য দফতরের সেক্রেটারি নিযুক্ত করিলেন। এই নিয়োগের পিছনে একটা ইতিহাস আছে। আমি অল্পদিনেই বুঝিয়াছিলাম যে চাকুরি-বাকুরির ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তানীদের সুবিধা করিতে গেলে সেক্রেটারি-জেনারেলের অফিসের বিলোপ সাধন করিতে হইবে। শাসনতন্ত্রে চাকুরি বাকুরির ব্যাপারে প্যারিটি আনয়নের বিধান থাকা সত্ত্বেও সেক্রেটারি-জেনারেলের দফতর সকল চেষ্টা ব্যাহত করিয়া দিতেছিল। এই দফতর থাকা পর্যন্ত এর অনুমোদন ছাড়া চাকুরি-বাকুরিতে কিছু করিবার উপায় ছিল না। আমি গোপনে প্রধানমন্ত্রীকে আমার মনোভাব জানাইলাম। দেখিলাম, তিনিও সেই চিন্তাই করিতেছেন। বলিলেন : ‘আমার ইচ্ছাও তাই। কিন্তু প্রশ্ন এই যে ঐ দফতর ভাংগিয়া দিলে আযিয আহমদকে কোথায় বসাইবে?’ আমি বলিলাম : ‘কেন, তাঁকে কোথাও এম্বেসেডর করিয়া পাঠাইয়া দিন। তাঁর ভাই মিঃ গোলাম আহমদও এম্বেসেডর আছেনই।’ প্রধানমন্ত্রী বলিলেন : ‘সরকারী কর্মচারীরা এম্বেসেডরিতে যাউক, এটা আমি পছন্দ করি না। আমার মনে হয় আমাদের কূটনৈতিক দফতরকে সজীব ও সক্রিয় করিতে হইলে রাজনৈতিকদের মধ্যেই ঐ সব পদ সীমাবদ্ধ করা দরকার। সরকারী কর্মচারীদের মন ধরাবাঁধা নিয়মের কাঠামোতে গড়া। তাঁরা কূটনীতিক ব্যাপারে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন না। কাজেই আমি নূতন করিয়া সরকারী কর্মচারীদেরে কূটনৈতিক চাকুরিতে পাঠাইব ত নাই, বরঞ্চ যাঁরা আছেন, তাঁদেরও উঠাইয়া আনিব। অতএব সেক্রেটারিয়েটের মধ্যেই কোথাও আযিয আহমদের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত আমি তাঁকে সেক্রেটারি-জেনারেলের পদ হইতে সরাইতে পারি না।‘
এর কয়েকদিন পরেই বাণিজ্য দফতরে আমার নূতন স্কিম নয়ানীতি ও এর কার্যকারিতার খাতিরেই সেক্রেটারি বদলের কথা উঠিল।
খানিক মিয়া একটু চিন্তা করিয়া প্রধানমন্ত্রী নাটকীয় ভংগিতে আমার দিকে শাহাদত আংগুলের একটা তীর নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন : ‘ইউ। ইউ টেক হিম অ্যা ইওর কমার্স সেক্রেটারি।‘
আমি ঘাবড়াইয়া গেলাম। মিঃ আযিয় আহমদ শুধু সর্বজ্যেষ্ঠ আই.সি.এস.ই নন। ‘মোস্ট স্টিফনেকেড বুরোক্র্যাট’ বলিয়া তাঁর বদনাম বা সুনাম আছে। মন্ত্রীদের কোনও কথা তিনি শোনেন না। মন্ত্রীদেরই তিনি কানি আংগুলের চার পাশে ঘুরান। কথাটায় আমার বিশ্বাসও হইয়াছিল। পূর্ব-বাংলার চিফ সেক্রেটারি থাকা অবস্থায় জনাব নূরুল আমিনের আমলে একবার তিনি হাইকোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া বলিয়াছিলেন : ‘আমি প্রধান মন্ত্রীসহ সমস্ত মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে সিক্রেট-ফাইল রাখি এবং তা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠাই। পূর্ব বাংলার প্রধান মন্ত্রী বা কেবিনেট এই কাজের জন্য চিফ সেক্রেটারির বিরুদ্ধে কোনও স্টেপ নিয়াছিলেন বলিয়া শোনা যায় নাই। বরঞ্চ লোকে বলাবলি করিত আসলে চিফ সেক্রেটারিই পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী।
আমি প্রধানমন্ত্রীকে আমার আশংকার কথা বলিলাম। তিনি অভয় দিয়া বলিলেন : ‘ভয় পাইও না। আযিয় আহমদের আর যত দোষই থাকুক, তিনি খুব যোগ্য ও দক্ষ অফিসার। তুমি তাঁকে নেও। আমি ত আছিই। কোনও অসুবিধা হইলে পরে দেখা যাইবে।’ এইভাবে পাকিস্তান সরকারের সর্বাপেক্ষা দোর্দণ্ডপ্রতাপ ‘আড়ষ্ট-গ্রীব বুরোক্র্যাট জনাব আযিয আহমদ আমার মত সাদাসিধা ‘লেদাভূষা’ মন্ত্রীর সেক্রেটারি নিযুক্ত হইলেন।
১১. একটি গুরুতর লোকসান
এই সঙ্গে আমার আরেকটি গুরুতর লোকসান হইল। বাণিজ্য দফতরের সেক্রেটারি বদলাইবার সময় প্রধান মন্ত্রী শিল্প-দফতরের সেক্রেটারিও বদলাইলেন। মিঃ আব্বাস খলিলীর জায়গায় মিঃ মোহাম্মদ খুরশিদকে শিল্প-দফতরের সেক্রেটারি করা হইল। আমি প্রধান মন্ত্রীর নিকট নালিশের ভাষায় কথাটা বলিতে গেলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করিলেন। বলিলেন : তোমার কথা মতই ত আমি খলিলীকে সরাইয়াছি।
প্রকৃত ঘটনা এই যে আমি সত্যই একদিন মিঃ খলিলীর বিরুদ্ধে এবং অপরদিন শিল্প-বাণিজ্য উভয় দফতরের বিরুদ্ধে বলিয়াছিলাম। উভয়ের বিরুদ্ধে অভিযোটা করি অপযিশনে থাকিতে। সেটা ছিল এইরূপ : প্রায় পাকিস্তানের সৃষ্টি-অবধি এই দুইজন সেক্রেটারি একই দফতরের সেক্রেটারিগিরি করিতেছেন। ফলে তাঁরা যাঁরা-তাঁর দফতরকে নিজের জমিদারি মনে করিয়া থাকেন। চলেনও জমিদারের মতই। অফিসারদের প্রতি ব্যবহারও তাঁদের ব্যক্তিগত কর্মচারির মতই।
আর মন্ত্রী হইবার পর খলিলী সাহেবের বিরুদ্ধে বলিয়াছিলাম যে মন্ত্রীদের তিনি মৌসুমী পাখী মনে করেন। কোন এক ক্লাবে বসিয়া বন্ধুদের কাছে মন্ত্রীদেরে ‘সিযন্যাল বার্ড বলিয়াছিলেন এবং সেক্রেটারিরাই আসল শাসনকর্তা, মন্ত্রীরা কিছু না, এই ধরনের উক্তি করিয়াছিলেন। শ্রোতাদের মধ্যে কেউ-কেউ আমার কাছে নালিশ করায় আমি মিঃ খলিলীর কৈফিয়ৎ তলব করি। তিনি হাসি-মুখে সব কথা স্বীকার করিয়া তার যে ব্যাখ্যা দেন, তাতে আমি সন্তুষ্ট হই এবং উচ্চহাস্য করিয়া তাঁর ব্যাখ্যা গ্রহণ করি। এই ঘটনা সম্পর্কে ক্লাবে বন্ধুদের সাথে কথা বলিতে গিয়া মিঃ খলিলী আবার মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে কটুক্তি করিয়াছেন বলিয়া আবার আমার কাছে খবর আসে। খলিলী সাহেব তারও যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দেন। আমি তাঁর ব্যাখ্যায় এবারও সন্তুষ্ট হই। কিন্তু ইতিমধ্যে প্রধান মন্ত্রীর চেম্বারে কথাটা উঠে। তিনি কার কাছে সবই শুনিয়াছিলেন। আমি ঘটনার বিবরণ সত্য বলিয়া স্বীকার করিলাম। আমি নিজেই যে ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ করিয়াছিলাম, তাও সত্য। কিন্তু মিঃ খলিলীর ব্যাখ্যা যে যুক্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য এবং তা যে গ্রহণ করিয়াছি, সব কথাও বলিলাম। প্রধানমন্ত্রী আর কিছু বলিলেন না। শুধুমাত্র তাঁর স্বভাবসিদ্ধ একটা ‘হুম’ করিয়া অন্য কাজে মন দিলেন। তার পরেই এই বদলি। আমার সব কথার উত্তরে তিনি বলিলেন : খুরশিদ ভোমার সব স্কিম ও প্ল্যানে তোমার সমর্থন ও সহায়তা করিবেন। আমি তোমার ধ্যান-ধারণার কথা তাঁকে ভাল করিয়া বুঝাইয়া দিয়াছি। তুমি শুনিয়া খুশি হইবে যে খুরশিদ নিজেকে আসলে সিলেট জিলার অধিবাসী বাংগালী মনে করেন। বলিয়া হাসিলেন এবং আমাকে হাসাইবার চেষ্টা করিলেন।
