কিন্তু মিষ্টভাষী বন্ধুবরের টানে শেষ পর্যন্ত রাযী হইলাম। তাঁর চেম্বারে বসিয়া সেক্রেটারিজয়েন্ট সেক্রেটারিসহ অনেক অফিসারের সাথে পুরা দুইদিন আলোচনা করিলাম। আঁরা কাগপত্র দেখাইলেন। আমি বুঝিলাম, সত্যই বিদেশী মুদ্রা নাই। শুধু যে বর্তমানে নাই, তাও নয়। আগামী প্রায় দুই বৎসরের আনুমানিক আয়ও অগ্রিম ব্যয় হইয়া গিয়াছে। এমন সব খরচের খাতে বিদেশী পক্ষের সাথে এ রকম পাকাঁপাকি চুক্তি হইয়া গিয়াছে যে একতরফা তার একটা চুক্তি বাতিল করিবার উপায় নাই।
আমি শুকনা-মুখে অর্থমন্ত্রীর নিকট হইতে বিদায় হইলাম। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সব বিস্তারিত রিপোর্ট করিয়া তাঁর উপদেশ চাইলাম। তিনি গম্ভীর ও চিন্তাযুক্ত হইলেন। বলিলেন : ‘আমি ত আগেই তোমাকে হুশিয়ার করিয়াছিলাম, তোমার এই লক্ষ ঝম্পে কোন কাজ হইবে না। এখন লাভটা কি হইল? পূর্ব-পাকিস্তানীদের মধ্যে জাগাইলে বৃথা আশা। আর পশ্চিম পাকিস্তানীদের মধ্যে সৃষ্টি করিলে নাহক দুশমনি।‘
আমি বিশেষভাবে চাপিয়া ধরিলাম। বলিলাম : আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভাবিবেন না। একটা কিছু উপায় বাহির করুন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আপনি খালি হাতে পূর্ব পাকিস্তানী ভোটারদের কাছে যাইতে পারেন না। কি জবাব দিবেন তাদের কাছে?
আগামী ১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে সাধারণ নির্বাচন করাইব, এ বিষয়ে আমরা তখন দৃঢ়সংকল্প। প্রধানমন্ত্রীই এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অনড়। সুতরাং আমার এই কথাটায় বোধহয় আগামী নির্বাচনের কথাটা তাঁর মনে পড়িল। তাঁকে চিন্তাযুক্ত দেখা গেল। লিডারের চিন্তায় সাহায্য করিবার আশায় আমি বলিলাম : ‘মার্কিন বন্ধুরা আপনার খাতিরে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কিছু করিবেন না?’
অন্য সময় হইলে কি অন্য কেউ একথা বলিলে লিডার বোধ হয় চটিয়া যাইতেন। কারণ এই সময় আওয়ামী লীগের ভিতরের একদল-সহ বামপন্থীরা সুহরাওয়ার্দী সাহেবকে গোপনে ‘মার্কিন দালাল’ বলিয়া গাল দিতেছিলেন। এ অবস্থায় এটাকে বক্রোক্তি মনে করা অসম্ভব ছিল না।
কিন্তু আজ আমার ব্যাকুল আগ্রহাতিশয্য দেখিয়াই বোধ হয় ঐ ধরনের কোন সন্দেহই তাঁর মনে আসিল না। মুহূর্তমাত্র ভাবিয়া তিনি ফোন উঠাইয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিঃ ল্যাংলিকে ঐদিন বিকালে চারটার সময় চায়ের দাওয়াত দিলেন। আমাকে ঐ সময় হাযির থাকিতে বলিলেন।
৮. মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাহায্য প্রার্থনা
চায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সোজা বিষয়ী কথা পাড়িলেন। পূর্ব-বাংলার শিল্পায়নের জন্য সাহায্য দিতে হইবে। মিঃ ল্যাংলি সহজেই রাযী হইলেন সুপারিশ পাঠাইতে। জানাইলেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলেই মার্কিন সরকার পাকিস্তানকে দশ মিলিয়ন ডলার (পাঁচ কোটি টাকা) ‘কমডিটি এইড’ রূপে দেওয়া স্থির করিয়াছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তা না আনায় ঐ সাহায্য অব্যবহৃত অবস্থায় পড়িয়া আছে। উহাকেই ইণ্ডাস্ট্রিয়াল এইডে রূপান্তরিত করিয়া দেওয়া যাইতে পারে। সেজন্য আইন পাস করিতে হইবে। মার্কিন রাষ্ট্রে উহাই নিয়ম। রাষ্ট্রদূত তা করাইবার ভার নিলেন। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করিলেন কয়েকজনকে ব্যক্তিগত পত্র লিখিতে।
মিঃ ল্যাংলির ভরশায় এবং প্রধানমন্ত্রীর তৎপরতায় আমি আশ্বস্ত ও নিশ্চিন্ত হইয়া অন্যান্য বিষয়ে মন দিলাম।
৯. আন্ত-আঞ্চলিক বৈষম্য
বাণিজ্য-দফতরের বিষয়াদি অধ্যয়ন করিতে গিয়া আমার ধারণা হইল আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দুইটি ত্রুটি দেশের বিশেষ ক্ষতি করিতেছে। একটি, ভারতের সংগে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রয়োজন ও সম্ভবমত বাড়িতেছে না। দ্বিতীয়টি, কমিউনিস্ট দেশসমূহের সাথে আমাদের কোনও ব্যবসা-বাণিজ্যিই হইতেছে না। এই দুইটিই রাজনৈতিক কারণসস্তুত। কাশ্মিরের অধিকার লইয়া ভারতের সাথে আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক অতিশয় তিক্ত। কাজেই তার সাথে বাণিজ্যক সম্পর্ক বাড়াইবার চেষ্টা হয় নাই। ফলে আমাদের দুইটি বড় লোকসান হইতেছে। এক, আমরা পাটের একটা বড় ও ভাল খরিদ্দার হারাইতেছি। দুই, ভারত হইতে সস্তাদরে অল্প ভাড়ায় যে কয়লা পাইতে পারিতাম তা হইতে বঞ্চিত হইতেছি। এছাড়া আরও একটি ব্যাপারে আমরা ভারতের সহিত সদ্ভাবের সুযোগ নিতে পারি। ধরুন, নোয়াখালি, কুমিল্লা ও সিলেটের সীমান্তবাসী বহু পাকিস্তানী নাগরিক পুরুষানুক্রমে পার্শ্ববর্তী ভারতীয় জমি চাষাবাদ করিয়া ধান এদেশে আনে। ইহারা জিরাতিয়া বলিয়া পরিচিত। ভারতের সহিত কোন চুক্তি না থাকায় ইহাদের প্রতি নানারূপ যুলুম করা হইতেছে। এদের সংখ্যা অনেক। এদের জন্য একটা চুক্তি করা আশু প্রয়োজন। তাছাড়া আমাদের পূর্ব পাকিস্তানে একটিমাত্র সিমেন্ট কারখানা। কলিকাতা তার হেড অফিস। তার কাঁচামাল চুনাপাথর আনা হয় ভারতীয় এলাকা হইতে রোপওয়ে বা দড়ির ঝোলানো সকুর সাহায্যে। যদিও কারখানাটির ক্যাপাসিটি এক লক্ষ টনের উপর, কিন্তু তাতে উৎপন্ন হয় মাত্র ৪৭ হাজার টন। পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের চিফ ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার সাহেব আমাকে জানাইয়াছেন, বর্তমানেই আমাদের সিমেন্টের চাহিদার পরিমাণ দেড়লক্ষ টনের উপর। আগামী সনেই এর পরিমাণ দাঁড়াইবে আড়াই লক্ষ টন। কাজেই বর্তমানেই আমাদের একলক্ষ টন বাহির হইতে আমদানি করা দরকার। পশ্চিম পাকিস্তানই এই ঘাটতি মিটাইতে পারে। কিন্তু জাহাজের অভাবে ঐ সিমেন্ট আমদানির পরিমাণও যথেষ্ট নয়; জাহাজ ভাড়ার দরুন দামও অনেক বেশি। সময় মত সরবরাহও হয় না। এতে পূর্ব-পাকিস্তানের সরকারী ও বেসরকারী সমস্ত নির্মাণ কাজ ও উন্নয়নমূলক কাজ সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত হইতেছে।
