প্রধানমন্ত্রী এতক্ষণে ঘাড় ফিরাইয়া আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন : দেখ, যদি তুমি এই-এই সংশোধনী গ্রহণ কর তবে কেবিনেট তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করিবে। বুঝিলে আমার কথা? তুমি এতে রাযী? এতক্ষণে আমি যেন লিডারকে কিছু-কিছু বুঝিতে পারিতেছিলাম। তাঁর চোখ যেন আমাকে ইশারা করিল : সহজে রাযী হইও। আমি সে ইশারা মানিলাম। মাথা নাড়িলাম। আপত্তি করিলাম। ও-সব সংশোধনী গ্রহণ করিলে আমার স্কিমগুলিই অর্থহীন বেকার হইয়া পড়ে, এমনিভাব প্রকাশ করিলাম। ঝাঁকাঝাঁকি করিলাম। নৈরাশ্য দেখাইলাম। আমার স্কিমগুলি অবিকৃত গ্রহণ করিবার অনুরোধও করিলাম। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী অটল-অনড়। ভাবটা যেন ‘হয় গ্রহণ নয় বর্জন’। অগত্যা শেষ পর্যন্ত আমি হার মানিলাম। আমার প্রস্তাব গৃহীত হইল। আমার ঘাম দিয়া জ্বর ছাড়িল। লিডার আমাকে কংগ্রেচুলেট করিলেন। দেখাদেখি সকলেই করিলেন। এতক্ষণে আমি বুঝিলাম, তেমন কড়া শীতের মওসুমেও আমার জামা কাপড় ঘামে ভিজিয়া গিয়াছে।
প্রধানমন্ত্রী কেবিনেট রুম হইতে বাহির হইয়া সোজা দুতলায় উঠিবার লিফটে চড়িলেন। আমাদের কাউকে কিছু বলিবার সুযোগ দিলেন না। তাঁর সাথে লিফটে উঠিবার জন্য আমাদের কাউকে ডাকিলেন না। লিফট এক লাফে দুতালায় উঠিয়া গেল। আমরা সকলে গাড়ি বারান্দার দিকে চলিলাম। আশাতীত জয়ের পুলকানন্দে আমি এরূপ বাহ্যজ্ঞানহীন। হঠাৎ কার হাত আমার কাঁধে পড়িল। আমার চমক ভাংগিল। দেখিলাম, অর্থমন্ত্রী সৈয়দ আমজাদ আলী। তাঁর সুন্দর মুখের স্বাভাবিক মিষ্টি হাসি ক্রুর ভ্রূ-ভংগিতে বিকৃত করিয়া দুষ্টামিপূর্ণ ভাষায় বলিলেন : অভিনয়টা পারফেক্ট হইয়াছে। সারারাত ধরিয়া রিহার্সেল দিয়া ছিলেন বুঝি?
৬. মকফাইট?
আমি বরাবরই অল্প-বুদ্ধি লোক। বন্ধুবরের রসিকতাটা ভাল বুঝিতে পারিলাম না। কিন্তু আন্দায করিলাম। তবু বোকার মত তাঁর দিকে চাহিয়া রহিলাম। এবার তিনি সহজ-সুন্দর স্বাভাবিক মিষ্টি হাসিটা ফিরাইয়া আনিয়া বলিলেন : প্রাইম মিনিস্টার ও আপনি যে মকফাইটটা করিলেন, তার কথাই আমি বলিতেছি। কাজ ত হইয়াই গিয়াছে। এখনও অভিনয় চালাইয়া যাওয়ার দরকার কি?
লিডারের তিন-তিন ঘন্টাব্যাপী পারফরমেন্সের আগাগোড়া ছবিটা নূতন রূপের চাকচিক্যে আমার চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিল। সত্যই তাই নাকি? তাই ত কত জায়গায় তাঁর কত প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেই আমার মুখে তুলিয়া দিয়াছেন। পুলক আনন্দ গর্ব-অহংকার ও বিনয়-কৃতজ্ঞতার ঢেউ-এর নিচে আমি তলাইয়া গেলাম। হে মহান নেতা, এমন করিয়া তুমি আমাকে জিতাইয়া দিয়াছ? আমাকে নীরব দেখিয়া বন্ধুবর আমার হাত ধরিয়া টানিয়া নিতে নিতে বলিলেন : ভয় নাই, আমি কাউকে বলিয়া দিব না। কেউ বুঝেন নাই। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে হিপনোটাইড করিয়া ফেলিয়াছিলেন।
একটু থামিয়া আবার তিনি বলিলেন : আপনি যাই মনে করেন ভাই সাহেব, প্রধানমন্ত্রী অমন না করিলে আপনার প্রস্তাব পাশের কিছুমাত্র সম্ভাবনা ছিল না।
কথায়-কথায় আমরা বিশাল লাউঞ্জটা পার হইয়া গাড়ি বারান্দার সামনে আসিয়া পড়িয়াছিলাম। আমার গাড়িটা আগে আসিয়া গাড়িবারান্দাটা আটকাইয়া রাখার দরুন আমজাদ আলীর গাড়িটা দূরে দাঁড়াইয়া আছে। তিনি হাত উঠাইয়া আমাকে সালাম করিয়া হাসি-মুখে হনহন করিয়া নিজের গাড়ির দিকে ছুটিলেন।
একদৃষ্টে অথবা দৃষ্টিহীনভাবে তাঁর দিকে চাহিয়া-চাহিয়া আবার আমি বাহ্যজ্ঞান হারাইলাম। প্রাইভেট সেক্রেটারি অথবা বডিগার্ডের ডাকে আমার চমক ভাংগিল। আমি গাড়িতে চড়িবার জন্য সিঁড়িতে পা দিবার আগে একবার ছাদের দিকে ভক্তিভরে তাকাইলাম। ঠিক উপরেই প্রধানমন্ত্রীর বেডরুম।
৭. বিদেশী মুদ্রার অভাব
কেবিনেটে আমার স্কিম অনুমোদিত হওয়ার সংগে সংগেই আমি ফাইনান্স মিনিস্টার জনাব আমজাদ আলীর পিছনে লাগিলাম। চাহিলাম তাঁর কাছে আমার প্রয়োজনীয় বিদেশী মুদ্রা। তিনি তাঁর স্বাভাবিক মিঠা-মধুর হাসি হাসিয়া বলিলেন : ‘বিদেশী মুদ্রা নাই ভাই সাহেব, সে কথা আগেই বলিয়াছি।‘ একথা সত্য। কেবিনেটে আমার স্কিম আলোচনা হওয়ার সময় এই ধরনের কথা তিনি বলিয়াছিলেন : আমরা পূর্ব পাকিস্তানীরা ওটাকে আমার স্কিম রুখিবার একটি ধাপ্পা মনে করিয়াছিলাম। কাজেই তখন ও-কথায় আমি কোনও গুরুত্ব দেই নাই। কিন্তু এখন দিলাম। আমি রাগিয়া গেলাম। বলিলাম : পূর্ব-পাকিস্তানের প্রয়োজনের বেলা টাকা ত থাকিবেই না। বরাবর আপনারা এসব করিয়াছেন। আর চলিবে না। টাকা আমাকে দিতেই হইবে। যেখান হইতে পারেন। আমার রাগ দেখিয়া বন্ধুবর হাসিলেন। বলিলেন : ‘ভাইসাব, যেদিন খুশী আপনি আমার দফতরে আসুন। সব কাগপত্র দেখুন। অফিসারদের সাথে নিজে আলোচনা করুন। সব অফিসারকে আপনার সামনে হাযির করিয়া আমি সরিয়া পড়িব। আপনি ইচ্ছামত সব কাগপত্র দেখিয়া এবং অফিসারদেরে জেরা করিয়া সব খবর নিবেন। তাতে যদি আমার কথা সত্য প্রমাণিত হয়, তবে আপনি বিশ্বাস করিবেন ত?’
বড় কঠিন কাজ। কঠিন ফরমায়েশ। আমি অর্থনীতির কিছু জানি না। অর্থ। দফতরের কাগপত্র কি বুঝিব? কাজেই প্রথমে অসম্মতি জানাইলাম। বলিলাম। ‘আমি কাগপত্র চাই না, চাই টাকা। আপনি অর্থমন্ত্রী। যেখান হইতে পারেন টাকা আনিয়া দেন।‘
