৫. শহীদ সাহেবের অপূর্ব কৌশল
বিকেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে তাঁদের যা যা বলিবার ছিল, যেসব কথা অহরহ তাঁদের মুখে শুনিয়াছি, সেসব কথাই প্রধানমন্ত্রী তাঁদেরই মত করিয়া তাঁদেরই ভাষায়, তাঁদের চেয়েও অনেক জোরালোভাবে, বলিতে লাগিলেন। এমনকি যে সব কথা তাঁরা কোনও দিন বলেন নাই, হয়ত ভাবেনও নাই, সেই ধরনের কথাও তিনি অনেক বলিলেন। কত কথা তুলিয়া-তুলিয়া তিনি আমাকে প্রশ্ন করিলেন : এ সম্বন্ধে তোমার কি বলিবার আছে? এ সমস্যায় তোমার সমাধান কি? এ আপত্তি তুমি খাও কি করিয়া? ইত্যাদি ইত্যাদি। যেসব বেকায়দার আতেক্কা প্রশ্নের জবাব আমি তাড়াতাড়ি দিতে পারি নাই, সেসব ক্ষেত্রে তিনি ধমকের সুরে তুমি কি বলিতে চাও?–বলিয়া আমার মুখে উত্তর যোগাইয়া দিলেন। আমি তাতে সাহায্য পাইলাম বটে কিন্তু বিষম অপমানও বোধ করিলাম। আমার প্রস্তাব অগ্রাহ্য হইবে, বহুক্ষণ আগেই তা বুঝিয়া ফেলিয়াছিলাম। এতক্ষণে সম্মানটুকুও গেল। মনে মনে ঠিক করিলাম, কেবিনেট মিটিং-এর পর গোপনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করিয়া পদত্যাগ করিয়া চুপেচুপে দেশে ফিরিয়া যাইব। মাত্র দুই মাস মন্ত্রিত্ব করিয়াই মন্ত্রীগিরির সাধ আমার মিটিয়াছে। কাজেই অতঃপর বেপরোয়াভাবে কথা বলিতে শুরু করিলাম। পশ্চিমা বন্ধুরা আমার রাগ দেখিলেন কিন্তু কোনও কথা বলিলেন না। আমাকে তাঁরা একটি প্রশ্নও করিলেন
। তার দরকারই ছিল না। তাঁদের সব কথাই ত প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলিতেছেন। তবু যদি তাঁদের মধ্যে কেউ কখনো-সখনো কোনও কথা বলিতে বা আমাকে কোন প্রশ্ন করিতে চাহিয়াছেন, তৎক্ষণাৎ প্রধানমন্ত্রী মুচকি হাসিয়া হাতের ইশারায় তাঁকে নিরস্ত করিয়াছেন। ভাবটা এই : তোমরা আর কি করিবে? আমিই একে ফিনিশ করিতেছি। ফলে কেউ কিছু বলিলেন না। তিন ঘন্টাব্যাপী কেবিনেট মিটিং কার্যতঃ হইয়া গেল প্রধানমন্ত্রী ও আমার মধ্যে কথা কাটাকাটির বৈঠক। তার পরিণামও সকলেরই একরূপ জানা। কাজেই সবাই নীরব। আমাকে এমনভাবে নাস্তানাবুদ করিয়া নাকানি-চুবানি খাওয়াইয়া হঠাৎ প্রধানমন্ত্রী চেয়ারটা পিছনে ঠেলিয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন। আমরাও সকলে দাঁড়াইলাম। হাতের ইশারায় আমাদিগকে বসিতে বলিয়া তিনি কেবিনেট রুমের এটাচড বাথরুমের দিকে অগ্রসর হইলেন। বাথরুমের দরজার হ্যাণ্ডেল ঘুরাইয়া দরজাটা ঈষৎ ফাঁক করিয়া তিনি আমাদের দিকে ফিরিয়া তাকাইলেন। বলিলেন : ‘আবুল মনসুর, তুমি আমাকে কনভিন্স্ড্ করিতে পারিয়াছ। এইবার তুমি তোমার কলিগদেরে কনভিনস করিবার চেষ্টা কর।’ বলিয়াই তিনি বাথরুমে ঢুকিয়া পড়িলেন।
আমি স্তম্ভিত হইলাম। প্রধানমন্ত্রী কনভিন্স্ড্ হইয়াছেন? আমার লিডারকে আমি কনভিন্স্ড্ করিতে পারিয়াছি? বিশ্বাস হইল না। আমাকে বিদ্রূপ করিলেন না ত? দ্বিধায় পড়িলাম। লিডারের স্বভাবত তা নয়। তবে এটা কি? কলিগদেরে কনভিন্স্ করিতে তিনি আমাকে উপদেশ দিলেন কেন? কাঁদের কথা বলিয়াছেন, বুঝিলাম। কিন্তু কনভিন্স করিব কি? আমি মাথা তুলিয়া কারোর দিকে চাহিতেই পারিলাম না। ঘাড়সোজা না করিয়া চোখ যতটা কপালের দিকে তুলা যায় তা তুলিয়া কলিগদের মুখ-ভাব দেখিবার চেষ্টা করিলাম। সবাই পাশের লোকের সাথে কানাকানি ফিসপাস করিতেছেন। কেউ কোনও কথা বলিলেন না। আমাকে কোন প্রশ্নও করিলেন না। প্রশ্ন আর কি করিবেন? কে করিবেন? পশ্চিমা বন্ধুরা? তাঁরা ত জিতিয়াই গিয়াছেন? আমার মত পরাজিত পর্যদস্ত ভুলুণ্ঠিত আহত সৈনিকের গায় ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’ মারিয়া লাভ কি? কাজেই তাঁরা কানাকানি করিয়াই চলিলেন। আমার দিকে ভ্রুক্ষেপও করিলেন না।
এমনিভাবে দশ-পনর মিনিট কাটিয়া গেল। বাথরুমের দরজা খোলার আহট পাইলাম। সকলে সে দিকে চাহিলাম। প্রধানমন্ত্রী ভোয়ালিয়ায় চোখ-মুখ মুছিতে মুছিতে বাহির হইলেন। ঐ অবস্থায় প্রশ্ন করিলেন : ‘আবুল মনসুর, তুকি কি তোমার কলিগদেরে কনভিনস করিতে পারিয়াছ? এ প্রশ্নের আমি কি জবাব দিব? কনভিন। করিব কি আমি যে ইতিমধ্যে একটি কথাও বলি নাই। কাজেই নিরুপায় সহায়হীনের একটুখানি জোর-করা শুক হাসি হাসিলাম মাত্র। প্রধানমন্ত্রী চোখ-মুখ ও হাত মুছা শেষ করিয়া ঈষৎ পিছন হেলিয়া হাতের তোয়ালিয়াটা বোধ হয়। বাথরুমের টাওয়েল স্ট্যাণ্ডে রাখিলেন এবং যেন কতই চিন্তা করিতেছেন এমনিভাবে ধীরে ধীরে আসিয়া নিজের আসনেবসিলেন। আমরা সবাই দাঁড়াইয়াছিলাম। আমরাও বসিলাম। প্রধানমন্ত্রী আমার দিকে ভূক্ষেপ না করিয়া পশ্চিমা বন্ধুদের দিকে চাহিয়া বলিলেন : আমি মনে করি, আবুল মনসুর যদি এই-এই কয়েকটা সংশোধনী গ্রহণ করে, তবে আমরা তার প্রস্তাব গ্রহণ করিতে পারি। এই বলিয়া তিনি নিতান্ত মামুলি ভাষিক ও ব্যাকরণিক কয়েকটা সংশোধনী পেশ করিলেন এবং পশ্চিমা বন্ধুদের দিকে চাহিয়া বলিলেন : কি বলেন আপনারা?
তাঁরা আর কি বলিবেন? প্রধানমন্ত্রী এতক্ষণ তাঁদের সমর্থন করিয়াছেন, এখন তাঁদের কর্তব্য প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করা। প্রধানমন্ত্রী আমাকে বকিয়া তাঁদের খুশী করিয়াছেন। এইবার তাঁদের উচিত প্রধানমন্ত্রীকে খুশী করা। সকলে এক বাক্যে বলিলেন : আপনি যা ভাল বুঝেন।’
