৩. হাই লেভেল কনফারেন্স
শাসনতন্ত্র অনুসারে বিশেষ ধরনের কতিপয় শিল্প ছাড়া সব শিল্পই প্রাদেশিক বিষয়। কিন্তু শাসনন্ত্র প্রয়োগের আট মাস পরেও সমস্ত শিল্প কার্যতঃ আগের মতই কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই আছে। বাণিজ্য কেন্দ্রীয় বিষয়। কাজেই আমদানি রফতানির ব্যাপারে পূর্ব-পাকিস্তানীদের করাচির দিকেই চাহিয়া থাকিতে হইতেছে। সফর শেষ করিয়া লিডারের নীরব অনুমোদন ধরিয়া লইয়া ঘোষণা করিলাম। ‘অতপর আমাদের শিল্পায়ন পূর্ব-পাকিস্তানমুখী হইবে। নয়া সব শিল্প পূর্ব-পাকিস্তানে স্থাপিত হইবে। পশ্চিম পাকিস্তানে আর কোনও নয়া শিল্প স্থাপিত হইবে না।
এর পর প্রথম সাক্ষাতেই লিডার আমাকে বলিলেন : এসব কি পাগলামি শুরু করিয়াছ তুমি?
লিডারের সামনেই দু-চারজন পশ্চিম পাকিস্তানী মন্ত্রী ও অফিসার বসা ছিলেন। আমি ঈষৎ হাসিয়া জবাব দিলাম : ‘ইলেকশনের জন্য প্রস্তুত হইতেছি, সার।‘ যেন মাটির নিচে হইতে সুড়ং বাহিয়া একটা আওয়ায় হইল : হুম। এই বিশাল আওয়াযকে আমার কাজে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিবাদ মনে করিয়া ওঁরা সবাই খুশী হইলেন। আমি কিন্তু আমার নেতার মুখে কোনও বিরক্তি আবিষ্কার করিতে পারিলাম না। মুখে তিনি ওসম্বন্ধে কিছু বলিলেনও না আমাকে। অতএব আমি নির্ভয়ে নিজের কাজ করিয়া চলিলাম। শিল্প-দফতরের তৎকালীন সেক্রেটারি মিঃ আব্বাস খলিলীর পরামর্শে উৎসাহে ও সহযোগিতায় আমি শিল্প-বাণিজ্য বিষয়ে একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মিলনী ডাকিলাম আমাদের মন্ত্রিত্ব গ্রহণের দুই মাসের মধ্যে। কেন্দ্রীয় শিল্প বাণিজ্য দফতরের সেক্রেটারিদ্বয়সহ অন্যান্য অফিসাররা, প্রাদেশিক শিল্প-বাণিজ্য দফতরের মন্ত্রিদ্বয়সহ অফিসাররা এই সম্মিলনীতে যোগ দিলেন। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য দফতরের এই সম্মিলনীর বৈঠক বসিল। কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রী হিসাবে আমিই এই সম্মিলনীর সভাপতিত্ব করিলাম। পরম হৃদ্যতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার আন্তরিক আগ্রহের আবহাওয়ার মধ্যে সম্মিলনীর কাজ চলিল। অনেক ভুল বুঝাবুঝির অবসান হইল? অধিকার দেওয়া-নেওয়ার অত্যাবশ্যক উদারতার দ্বার খুলিয়া গেল। শাসনতান্ত্রিক অনেক দৃশ্যতঃ দুঃসাধ্য সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান বাহির হইয়া পড়িল। সম্মিলনীতে যে কয়টি প্রস্তাব গৃহীত হইল, তার মধ্যে এই কয়টা প্রধান :
(১) শাসনতন্ত্রে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ শিল্প ছাড়া আর সব শিল্পের পূর্ণ ও একক কর্তৃত্ব প্রাদেশিক সরকারের হাতে দেওয়া হইল।
(২) আমদানি-রফতানির ব্যাপারে কাচিস্থ চিফ কন্ট্রোলার অফিসের কতৃত্বের অবসান করা হইল। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য চাটগাঁয়, পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য লাহোরে এবং ফেডারেল অঞ্চলের জন্য করাচিতে তিনটি স্বাধীন ও অন্য-নিরপেক্ষ আমদানি-রফতানি কন্ট্রোলার-অফিস স্থাপিত হইল।
(৩) পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন ও সরবরাহের সুবিধার জন্য কেন্দ্রীয় সাপ্লাই এণ্ড ডিভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের চাটগাঁ শাখা আপগ্রেড করিয়া একজন এডিশনাল ডাইরেক্টর-জেনারেলের পরিচালনাধীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রয়োজন মিটাইবার চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া হইল।
(৪) ব্যবস্থা হইল, বৈদেশিক মুদ্রার দুই প্রদেশের ও করাচির অংশ পূর্বাহ্নে ভাগ করিয়া দেওয়া হইবে এবং চাটগাঁর কন্ট্রোলার পূর্ব পাকিস্তান সরকারের, লাহোরের কন্ট্রোলার পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের এবং করাচির কন্ট্রোলার কেন্দ্রীয় বাণিজ্য দফতরের সহিত পরামর্শ করিয়া লাইসেন্স বিতরণ করিবেন।
৪. স্পেশাল কেবিনেট মিটিং
এইসব সিদ্ধান্তের সব কয়টাই নীতি-নির্ধারক বিধায় এবং ওসবে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও এলাকা সংকুচিত হইতেছে বলিয়া নিয়মানুসারে ওতে কেবিনেটের অনুমোদন দরকার; আমি সে অনুমোদন চাহিলাম। কেবিনেটের বিশেষ বৈঠকে আমার প্রস্তাব পেশ করা হইল। সে কেবিনেট মিটিং-এর কথা আমি জীবনে ভুলিতে পারিনা।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কেবিনেট রুমে এই বৈঠক। মিটিং শুরু হইবার আগেই আমরা অনেকে হাযির হইয়াছি। পশ্চিম পাকিস্তানী সহকর্মীদের অনেককেই দেখিলাম গম্ভীর। সেদিনকার আলোচ্য বিষয় লইয়া আমাকে কেউ-কেউ ঠাট্টা করিয়া বলিলেন : ‘আপনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী না প্রাদেশিক মন্ত্রী তা আমরা বুঝিতে পারিতেছি না।’ বুঝিলাম, ঝড় উঠিবার পূর্ব লক্ষণ। আমাকে প্রবল বাধার সম্মুখীন হইতে হইবে। এঁদের সাথে এক হাত লড়িবার জন্য প্রস্তুত হইলাম।
কিন্তু কেবিনেট মিটিং-এ আমার উপর হামলা হইল সম্পূর্ণ আশংকাতীত দিক হইতে। কেউ কিছু বলিবার আগে প্রধানমন্ত্রীই আমাকে হামলা করিলেন। বুঝিলাম, শত্রুপক্ষের সেনাপতিত্ব নিয়াছেন স্বয়ং আমার নেতা। এজন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। হামলাও কি যেমন-তেমন? দক্ষ তীরন্দাযের ক্ষিপ্রতায় ও কৌশলে লিডার আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করিতে লাগিলেন। বড়ই বেকায়দায় পড়িলাম। তিন ঘন্টাব্যাপী কেবিনেট মিটিং ত নয়, দস্তুরমত সেশন আদালত। আমি যেন আসামীর কাঠগড়ায়। চার্জ যেন নরহত্যা বা হত্যার চেষ্টা। সুহরাওয়ার্দীর মত কুশাগ্র-বুদ্ধি সুদক্ষ ব্যারিস্টার মার্কিন বা ফরাসী আইন মোতাবেক আসামীকে জেরা করিতেছেন। সে জেরায় আমার প্রস্তাবের যৌক্তিকতা, শাসনতান্ত্রিক বাধা-নিষেধ, পাকিস্তানের অখণ্ডত, শক্তিশালী ঐকিক কেন্দ্র বনাম ফেডারেল কেন্দ্রের তুলনামূলক গুণাগুণ, কিছুই বাদ গেল না। এমন কি আমার অখণ্ড পাকিস্তানী দেশ-প্রেমের প্রতি কটাক্ষ পর্যন্ত হইয়া গেল। আমি সাধ্যমত সব কথার জবাব দিতে লাগিলাম। কিন্তু সুহরাওয়ার্দীর জেরার সামনে সম্বিৎ রাখা চলে কতক্ষণ? আমার জিভ ও গলা শুকাইয়া আসিতে লাগিল। প্রথমে অপমানে, তার পরে অভিমানে, আরও পরে রাগে আমি ফুলিতে লাগিলাম। কিন্তু তবু লিডারের দয়া হইল না। মাঝে-মাঝে জেরার ফাঁকে-ফাঁকে আমি কেবিনেট কলিগদের দিকে ন্যর ফিরাইতে লাগিলাম। পূর্ব পাকিস্তানী সকলের মুখেই দরদ ও সহানুভূতি দেখিলাম। আমার বিপদে তাঁদের মুখ শুকনা। পক্ষান্তরে পশ্চিমা ভাইদের মুখ হাসিতে উজ্জ্বল। তাঁরা সবাই শক্তিশালী কেন্দ্রের পক্ষপাতী; সুতরাং শক্তি বিকেন্দ্রীকরণের বিরোধী। আমার লিডারের মতও তাই বলিয়া আমাদের বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রীর হাতে তাঁদের স্বার্থ নিরাপদ বলিয়া তাঁরা নিশ্চিন্ত। কাজেই আমার নিজের লিডারের হাতে আমি নাকানি-চুবানি খাইতেছি দেখিয়া তাঁরা নিশ্চয়ই ব্যাপারটা উপভোগ করিতেছেন।
