আমার শিক্ষা-নীতির কথা শুনিয়া অনেকেই বিপদ গণিয়াছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কানে কেউ-কেউ কথাটা তুলিয়াও ছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খা সাহেব এসব ব্যাপারে মূলতঃ আমার সহিত একমত ছিলেন। কাজেই তাঁর কাছে শিক্ষাবিদদের বিশেষ কোনও সুবিধা হইল না। আমি এ বিষয়ে সক্রিয় পন্থা গ্রহণের চিন্তার আলোচনা করিতে লাগিলাম।
৫. শিক্ষা-মন্ত্রিত্বের অবসান
কিন্তু আমাদের লিডার শহীদ সাহেব সব ওলট-পালট করিয়া দিলেন। তিনি কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করিলেন। আমাকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বানাইলেন। শিক্ষা প্রাদেশিক বিষয়। কেন্দ্রে ও-বিষয়ে বিশেষ কিছু করণীয় নাই। অতএব আমার ঘাড়ে চাপাইলেন কেন্দ্রের সর্বাপেক্ষা বড় দুইটি বিষয় : শিল্প ও বাণিজ্য। ৬ই সেপটেম্বর প্রাদেশিক মন্ত্রী হইয়াছিলাম। ১২ই সেপটেম্বর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হইলাম। ছয়দিনের শিক্ষামন্ত্রিত্ব হারাইয়া খুবই দুঃখিত ও নিরাশ হইয়াছিলাম। শিক্ষা পরিকল্পনার বিরাট সৌধ আমার তাসের ঘরের মতই ভাংগিয়া পড়িল। প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান স্বয়ং শিক্ষা-দফতরের ভার নিলেন বলিয়া অনেকখানি সান্ত্বনা লইয়া করাচি গেলাম।
কিন্তু অল্পদিনেই আমি শিক্ষা-দফতর হারাইবার দুঃখ ভুলিয়া গেলাম। শিল্প বাণিজ্য দফতরের বিশাল ও অসীম সাগরে ডুবিয়া গেলাম। শুধু কথার কথা নয়। সত্যই যেন এক-একটা মহাসাগর। কত বিভাগ, আর কত অফিসার! শিক্ষা দফতর ও বাণিজ্য দফতর দুইটি পৃথক এবং খানিকটা দূরে অবস্থিত। বাণিজ্য দফতর ছিল সাবেক সিন্ধু চিফকোর্ট বিল্ডিং-এ। আর শিল্প-দফতর ছিল মূল পাক সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং-এ। আমি সাধারণতঃ বাণিজ্য-দফতরে অবস্থিত মন্ত্রির চেম্বারেই বসিতাম। এটাই নাকি ছিল তৎকালের প্রথা। দুই দফতরের দুই মন্ত্রী থাকিলে অবশ্য তাঁরা যাঁরা-তাঁর দফতরেই বসিতেন। কিন্তু দুই দফতরের এক মন্ত্রী থাকিলে তিনি বাণিজ্য দফতরেই বসিতেন। আমার নিকটতম পূর্ববর্তী মিঃ ইব্রাহিম রহিমতুল্লা আমার মতই দুই দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। তিনিও বাণিজ্য দফতরের চেম্বারেই বসিতেন। আমাকেও সেখানে বসান হইল। শিল্প দফতরের সেক্রেটারি মিঃ আবাস খলিলী ও বাণিজ্য দফতরের সেক্রেটারি মিঃ কেরামতুল্লাহ উভয়েই জাঁদরেল আই. সি. এস.। উভয়েই আমাকে ঘুরাইয়া-ঘুরাইয়া সারা আফিস দেখাইলেন এবং সকলের সাথে পরিচয় করাইয়া দিলেন।
২৩. ওযারতি শুরু
ওযারতি শুরু
তেইশা অধ্যায়
১. সেক্রেটারিদের মোকাবেলা
কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্যমন্ত্রী হইয়াই আমি দুই দফতরের সেক্রেটারি, জয়েন্ট সেক্রেটারি, ডিপুটি সেক্রেটারিদের এবং এটাচড় ডিপার্টমেন্টসমূহের বিভাগীয় প্রধানদের এক সম্মিলিত কনফারেন্স ডাকিলাম। কোন দিন মন্ত্রিত্ব করি নাই। কাজেই পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার কিছুই ছিল না। শুধু উপস্থিত-বুদ্ধি খাটাইয়া সাধারণ বুদ্ধির কাওনের বক্তৃতা করলাম। আমি জানিতাম, ‘আমার বৃদ্ধি-শুদ্ধি নাই’ একথা বলার মত বুদ্ধিমানের কাজ আর হইতে পারে না। কাজেই আমি সেই পন্থাই ধরিলাম। বক্তৃতায় বলিলাম : ‘যে কাজের ভার আমার উপর পটিয়াছে, তার কিছুই আমি জানি। আপনারাই আপনাদের অভিজ্ঞতা দিয়া আমাকে ঠিক পথে চালাইবেন। তাঁরা যে শুধু অভিজ্ঞতাই নয়। লেখাপড়া ও বিদ্যা-বুদ্ধিতেও তাঁরা সকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শ্রেণীর প্রতিভাবান ছাত্র ছিলেন। ছিলেন বলিয়াই ঐ সব সরকারী চাকুরি পাইয়াছেন। আমি নিছমানের ছাত্র ছিলাম বলিয়াই চেষ্টা করিয়াও সরকারী চাকুরি পাই। নাই। চাকুরি পাই নাই বলিয়াই ওকালতি ধরিয়াছিলাম। বাংলার প্রবচন যার নাই অন্য গতি সেই ধরে ওকালতি ও শুনাইলাম। ঐ ওকালতি করিতে করিতে জনগণের দাবি দাওয়া লইয়া রাজনৈতিক সংগ্রাম করিয়াছি। তাদের ভোটে নির্বাচিত হইয়া আইন সভার মেম্বর ও মন্ত্রী হইয়াছি। মন্ত্রীরূপে আজ তাঁদের উপরে বসিয়াছি বটে কিন্তু তাতেই জ্ঞান-বুদ্ধিও আমার তাঁদের চেয়ে বেশি হইয়া যায় নাই। আমার দায়িত্ব ও অধিকার জনগণের মংগলের জন্য নীতি নির্ধারণ করা। আর অফিসারদের কর্তব্য সে নীতি নির্ধারণে আমাকে উপদেশ দেওয়া ও সহায়তা করা। উপদেশ দিয়াই তাঁদের কর্তব্য শেষ। তাঁদের উপদেশ গ্রাহ্য করার অধিকার মন্ত্রীর আছে। তাঁদের পসন্দ না হইলেও মন্ত্রীর আদেশ তাঁদের পালন করিতে হইবে।
২. অবস্থা পর্যবেক্ষণ
মাত্র বার জন আওয়ামী লীগ মেম্বর লইয়া লিডার প্রায় পঞ্চাশ জনের কোয়েলিশনের মন্ত্রিসভা গঠন করিয়াছেন। কোয়েলিশনের অধিকাংশই পশ্চিম পাকিস্তানী।
সুতরাং ইহাদের দয়ার উপরেই আমাদের মন্ত্রিসভা একান্তভাবে নির্ভরশীল। এদের প্রায় সকলেই অল্পদিন আগে পর্যন্ত মুসলিম লীগার ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্যার প্ররোচনায় এরা মুসলিম লীগ ছাড়িয়া রিপাবলিকান পার্টি গঠন করিয়াছেন। স্পষ্টতঃই প্রেসিডেন্ট মির্যার প্রভাব এঁদের উপর অসীম। ইস্কান্দর মির্যার কুনযরে পড়িলেই আমাদের মন্ত্রিত্ব খতম। তেমন দুর্ঘটনা যেকোন সময়ে ঘটিতে পারে, সে সম্বন্ধে আমরা গোড়া হইতেই সচেতন ছিলাম। প্রধানতঃ যুক্তনির্বাচনের ভিত্তিতে যথাসম্ভব সত্বর সাধারণ নির্বাচন করাইবার উদ্দেশ্যেই লিডার মন্ত্রিত্ব গঠনের দায়িত্ব নিয়াছিলেন। আমি লিডারের সহিত একমত হইয়াও বলিয়াছিলাম যে ঐভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করাইতে হইবে ঠিকই, কিন্তু কিছু-কিছু কাজ না করিলে জনগণ আমাদের ভোট দিবে কেন? লিডারের নীরব সমর্থন লাভ করিয়া আমি কালবিলম্ব না করিয়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্প-এলাকা সফর করিলাম। শিল্প-বৈষম্যের মোটামুটি একটা ধারণা হইল। দেখিলাম, পূর্ব পাকিস্তানে শুধু যে প্রয়োজনীয় শিল্প প্রতিষ্ঠাই হয় নাই, তা নয়। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিল্প স্থাপিত হইয়াছে। এমন বহু শিল্প সেখানে স্থাপিত হইয়াছে, কাঁচামালের জন্য যাদের প্রায় সর্বাংশেই আমদানির উপর নির্ভর করিতে হয়। পক্ষান্তরে পূর্ব পাকিস্তানের কত কাঁচামাল পড়িয়া রহিয়াছে; তাদের ব্যবহারের জন্য কোনও শিল্প স্থাপিত হয় নাই। পশ্চিম পাকিস্তানের এই শিল্প চালু রাখিতেই আমাদের অনেক বিদেশী মুদ্রা খরচ হইয়া যাইতেছে।
