বস্তুতঃ কথাটা উঠিয়াছিলও। আমরা কেবিনেট-সভায় যখন রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি ও নিরাপত্তা আইন বাতিলের প্রস্তাব আলোচনা করি, তখন কোন কোন বাস্তববাদী মন্ত্রী মাত্র কয়েক মাসের জন্য নিরাপত্তা আইন বলবৎ রাখিতে বলিয়াছিলেন : তাঁরাও নীতি হিসাবে বিনা বিচারে আটক রাখার সম্পূর্ণ বিরোধী। কিন্তু তাঁদের যুক্তি ছিল এই যে যাঁরা অতীতে এইরূপ আটকাঁদেশ দিয়াছিলেন, তাঁদের কিছুদিন জেলের ভাত খাওয়াইয়া নিরাপত্তা আটকের মজা চাখান দরকার। তাঁরা খুব জোরের সংগেই বলিয়াছিলেন যে ওঁদেরে মজা চাখাইলে ভবিষ্যতে তাঁরা আর ও-রূপ কাজ করিবেন না। আর যদি ঐরূপে মজা না চাখাইয়া অমনি-অমনি ছাড়িয়া দেওয়া হয়, তবে তাঁরা ভবিষ্যতে আবার মন্ত্রীর গদিতে বসিয়াই বিরোধীদলের লোককে আটক করা শুরু করিবেন। বাস্তববাদী বিষয়ীর দিক হইতে তাঁদের যুক্তিতে জোর ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা তাঁদের ঐ যুক্তি গ্রহণ করেন নাই। অধিকাংশেই বলিলেন : রাজনৈতিক প্রতিশোধ-নীতির কোন শেষ নাই। ঐ নীতিতে গণতান্ত্রিক আবহাওয়া কোনদিনই আসিবেনা। তাতে গণতন্ত্র বিকাশের পথ রুদ্ধ হইবে।
পরবর্তীকালের শাসকদের হাতে সত্য-সত্যই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দই বেশি মার খাইয়াছেন। এবারের যুলুম আরো বেশি। আটক ছাড়াও দুর্নীতির অভিযোগ। মামলা-মোকদ্দমা খানা-তাল্লাশি। সম্পত্তি ক্রোক। মায় সংবাদপত্র অফিসে তালা লাগান ও প্রেস বাযেয়াফতি পর্যন্ত। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের মতামত তাতেও বদলায় নাই। এর পরেও তাঁরা যদি কোন দিন ক্ষমতায় যান তখনও আজিকার যালেমদেরও বিনা-বিচারে আটকের আদেশ দিবেন না।
৪. শিক্ষা-মন্ত্রিত্বের উদ্যোগ
ওযারতি পাওয়ার দুএকদিন পরেই শিক্ষাবিদদের সাথে আমার পরামর্শ সভা বসিল। শিক্ষা পরীক্ষা পাসের হার ইত্যাদি সম্বন্ধে মোটামুটি উপরে বর্ণিত-মতই আমার অভিমত প্রকাশ করিয়া বক্তৃতা দিলাম। উপসংহারে নীতিনির্ধারণের ভাষায় বলিলাম : ‘আমরা পরিণামে পরীক্ষা ব্যবস্থা উঠাইয়া দিব। তারই পরখ স্বরূপ আপনারা এবার শতকরা আশি জন, আগামী বত্সর শতকরা নব্বই জন এবং তৃতীয় বছরে শতকরা একশ’ জনই পাশ করাইবেন।
বোধ হয় সমবেত সুধীবৃন্দ স্তম্ভিত হইলেন। কেউ-কেউ বলিলেন : ‘কেমন করিয়া তা হইবে? প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দিলেও পাশ করাইতে হইবে?
আমি জোরের সাথেই বলিলাম : ‘জি হাঁ। প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারিলেও পাস করাইতে হইবে।
অনেক যুক্তি-তর্ক ও কথা-কাটাকাটি হইল। অবশেষে একজন বলিলেন : তাতে শিক্ষার মান যে নিচু হইয়া পড়িবে।
আমি হাসিয়া বলিলাম : ‘হোক না একটু নিচু। আমাদের দেশের সবকিছুরই ত মান নিচু হইয়াছে। মন্ত্রিত্বের মান নিচু না হইলে আমি কি শিক্ষামন্ত্রী হইতে পারি? আমার বেআদবি মাফ করিবেন। শিক্ষকতার মান নিচু না হইলে আপনারই কি সকলে অধ্যাপক ও বিভাগীয় হেড হইতে পারিতেন? কেরানী প্রধানমন্ত্রী হইয়াছেন। দারোগা এস পি হইয়াছেন। মুনসেফ জাস্টিস হইয়াছেন। পাকিস্তান হওয়ার ফলেই। এই পাকিস্তান আনিয়াছে ছাত্ররা। তারাও পাকিস্তানের এক-আধটু সুবিধা ভোগ করুকনা।
শিক্ষাবিদরা বেজার হইলেন। আমি শিক্ষা-সমস্যার কথা না বলিয়া রাজনৈতিক কথা বলিতেছি, একথা মুখ ফুটিয়া বলিলেন না বটে, কিন্তু তাবেগতিকে তা বুঝাইলেন। আমি সাধ্যমত বুঝাবার চেষ্টা করিলাম যে শিক্ষার মান নিচু করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তার দরকারও নাই। কারণ শিক্ষার মান এখন নিচুই আছে। আমার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষার মানটাকে নিচু করিয়া শিক্ষার মানের সমপর্যায়ে আনা। আমরা সমবেত চেষ্টায় যেদিন শিক্ষার মান উন্নত করিতে পারি, সেইদিন পরীক্ষার মানও তদনুপাতে উন্নত করিব। পরীক্ষার উদ্দেশ্য ত আসলে এই যে আমরা বছর দীঘালি ছাত্রদেরে যা পড়াইলাম, তা তারা পড়িয়াছে বুঝিয়াছে কি না তারই টেস্ট করা? তার বদলে আমরা যদি ছাত্রদেরে না পড়াইয়াই, শুধু কতকগুলো পুস্তক পাঠ্যতালিকাভুক্ত করিয়াই, সেই সব পুস্তক হইতে, অনেক সময় সেইসব পুস্তকের বাইরে হইতেও, প্রশ্ন করিয়া ছাত্রদের বিদ্যা পরখ করিতে চাই, তবে সেটা পরীক্ষা হয় না, হয় অবিচার। আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায় তা নিষ্ঠুরতা, যুলুম। এর ফলে শিক্ষার গতি ব্যাহত হইতেছে, কত শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সর্বনাশ হইতেছে গ্রাম্য জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার দৃষ্টান্ত দিয়া তা বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম। শিক্ষার মান সম্পর্কে আমি বলিলাম যে শিক্ষার মানের তুলনামূলক বিচার হয় বিদেশী শিক্ষা-প্রাপ্তদের সাথে আমাদের শিক্ষা-প্রাপ্তদের মোকাবিলা হওয়ার বেলাতেই। আমাদের শিক্ষিতদের কয়জন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিদেশীদের মোকাবেলা করিবার সুযোগ পায়? দেশী বিদেশী বৃত্তি পাইয়া যে সব ছাত্র শিক্ষা ও ট্রেনিং লাক্সে জন্য বিদেশে যায়, শুধু তাদের বিদ্যাই আন্তর্জাতিক স্ট্যাণ্ডার্ডের কষ্টিপাথরে পরখ করা হয়। আমাদের দেশীয় বিভিন্ন পরীক্ষায় শতকরা একশ জনই পাস করাই আর শতকরা ত্রিশ জনই পাস কাই, উপরের দশটি ছেলে ভাল হইবেই। এরাই বিদেশে যাওয়ার চান্স পায়। তাদের প্রায় সবাই এই উপরের দশটি প্রতিভাবান ছেলের মধ্যে হইতে নির্বাচিত হয়। বাকী শতকরানব্বই জনই দেশের অভ্যন্তরে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকুরি-বাকুরি, ব্যবসা বাণিজ্য করিয়া জীবনযাপন করে। বিদেশী শিক্ষার মানের সাথে মোকাবিলা করার কোন কারণ বা সুযোগ এদের ঘটে না। ঘটিবেও না। অবিলম্বে আমাদের সকল স্তরে শিক্ষার মিডিয়ম হইবে বাংলা। তবে ইংরাজীতে কাবেলিয়ত না থাকিলে আমাদের ছেলেদের ফেল করান হইবে কেন? কাজেই আমাদের শিক্ষাবিদরা ও শিক্ষাকর্তৃপক্ষ এক কল্পিত আকাশচুম্বী শিক্ষার মানের নিরিখ দিয়া আমাদের ছাত্র-জনতাকে বিচার করিবার চেষ্টা করিয়া শুধু ভুল নয় অবিচার ও অন্যায়ও করিতেছেন। আন্তর্জাতিক উচ্চ মান দিয়া বিচার করিলে স্বয়ং আমাদের অধ্যাপক-শিক্ষকরা শিক্ষার ক্ষেত্রে এবং দেশী অনেকে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও যে বিদেশীদের মোকাবিলায় পাত্তা পাইবেন না, সে কথা বলিতেও ছাড়িলাম না।
