২. ছয়দিনের শিক্ষামন্ত্রিত্ব
কাজেই স্থির করিয়াই রাখিয়াছিলাম, মন্ত্রী হইবার সুযোগ পাইলে শিক্ষামন্ত্রীই হইব। নিজে শিক্ষা মন্ত্রী হইবার আগে কি তবে কিছুই করণীয় নাই? নিশ্চয়ই আছে। তাই আমাদের নেতা হক সাহেব যেদিন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী হইলেন, সেদিন হইতেই তাঁর পিছনে লাগিলাম। শিক্ষাকে সহজ ও সস্তা করিবার, প্রাইমারি শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করিবার এবং এডাল্ট এডুকেশনকে নৈশ শিক্ষায় পরিণত করিবার, প্রস্তাব দিতে লাগিলাম। অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আমি চার বছরে বাংলার নিরক্ষরতা দূর করিবার একটি স্কিম পর্যন্ত তৈয়ার করিয়া ফেলিলাম। মাত্র ছয় কোটি টাকায় এই কাজ হইয়া যাইত। ১৯৪১ সালে বাংলার আদমশুমারিতে ‘অশিক্ষিতের’ ঘরে ‘শূন্য’ পড়িত। এসব আমার অনভিজ্ঞ ‘তরুণের স্বপ্ন’ হইতে পারে। ছিলও বোধ হয় তাই। নইলে আমাদের স্কিম কার্যকরী হইল না কেন?
কিন্তু আশা ছাড়ি নাই। ভাবনা-চিন্তাও কমে নাই। তাই বিতর্ক-আলোচনা ও পড়াশোনা করিতেই থাকিলাম। এই কাজে মার্কিন শিক্ষাপদ্ধতি ও ইউরোপীয় শিক্ষা পদ্ধতির তুলনা করিয়া কিছুটা জ্ঞান লাভ করিলাম। সেই সামান্য জ্ঞান হইতে এটা বুঝিলাম, ইউরোপ বিশেষতঃ ইংলভ, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রীস ও ইটালীতে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য একটা শিক্ষিত কৃষ্টিবান শ্রেণী গড়িয়া ভোলা। গোটা জনসাধারণকে শিক্ষিত করিয়া ভোলা নয়। তথায় জনসাধারণের শিক্ষিত হওয়ায় কোন বাধা নাই। বরঞ্চ সুযোগ-সুবিধা আছে। ঐ সব দেশে নিরক্ষর লোক নাই বলিলেই চলে। তবু ঐ সব দেশের জনসাধারণকে শিক্ষার তালাশে শিক্ষাকেন্দ্রে যাইতে হয়। স্বয়ং শিক্ষা জনসাধারণের দুয়ারে আসে না। ফলে ঐসব দেশে শিক্ষার মান সত্য-সত্যই উন্নত। কারণ উচ্চ শিক্ষা সেখানে সকলের জন্য নয়। বিশেষ অধিকার ভোগী বিত্তশালী শ্রেণীর জন্য। এই কারণে কারিকুলাম ও সিলেবাসের দ্বারা সেখানে শিক্ষাকেও উঁচা করা হইয়াছে। পরীক্ষাও করা হইয়াছে তেমনি কড়া।
কিন্তু মার্কিন মুলুকের শিক্ষা-নীতি তা নয়। সেখানে বংশাভিজাত্য নাই; আছে ধনাভিজাত্য। সেজন্য শিক্ষা সেখানেজনসাধারণের জন্য, শ্রেণীরজননয়। এই কারণেই তথায় সাধারণ শিক্ষার মান উচ্চ নয়। শুধু উচ্চ শিক্ষার মামই উচ্চ শিক্ষা সেখানে বাস্তববাদী। শিল্প কারিগরি ও অর্থকরী বিদ্যার প্রাধান্য সেখানে বেশি। এই কারণেই প্রাইমারি ও সেকেণ্ডারি শিক্ষা ইউরোপের চেয়ে আমেরিকায় অনেক সহজ। ইংলভসহ ইউরোপের একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর পরীক্ষায় যেসব প্রশ্ন করা হইবে, আমেরিকায় দশম শ্রেণীতেও সেসব প্রশ্ন কঠিন বিবেচিত হইবে। ইউরোপে প্রশ্ন করা হয় শিক্ষার্থী বাদদিবার উদ্দেশ্যে। মার্কিন মুলুকে করা হয় শিক্ষার্থী বাড়াইবার উদ্দেশ্যে।
কিন্তু আমরা আমাদের দেশে ইংরেজের শিক্ষা-নীতিই আজও মানিয়া চলিতেছি। কাজেই আমাদের শিক্ষা-পদ্ধতি প্রাইমারি ও মাধ্যমিক স্তর হইতেই কঠিন করা হয়। মার্কিন জাতির প্রভাবে এবং যুগের প্রয়োজনে ইউরোপীয় জাতিসমূহও ইদানিং তাদের শিক্ষা-পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন আনিয়াছে। সেখানেও শিক্ষাকে এখন অনেক বাস্তববাদী ও গণমুখী করা হইয়াছে। বিশেষতঃ সোভিয়েট রাশিয়া শিক্ষাকে আরো অধিক গণমুখী বাস্তববাদী ও বিজ্ঞানভিত্তিক করায় সব সভ্য রাষ্ট্রেই শিক্ষাকে যুগোপযোগী করা হইতেছে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগা দেশেই আজো মান্ধাতার আমলের শিক্ষা-নীতি চলিতেছে। শিক্ষার বিষয়বস্তু, শিক্ষার মিডিয়াম, বাধ্যতামূলক তিন ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা আজো লজ্জাস্করভাবেই আমাদের শিক্ষার পথকে কন্টকিত করিয়া রাখিয়াছে।
শিক্ষামন্ত্রী হইবার সময় এসব কথাই আমার মনে ছিল। কাজেই শিক্ষা বিষয়ে একটা-কিছু করিবার সংকল্প নিলাম। দুই-এক দিনের মধ্যেই শিক্ষাবিদদেরে লইয়া একটি পরামর্শ সভার ব্যবস্থা করিতে শিক্ষা দফতরের সেক্রেটারিকে নির্দেশ দিলাম।
৩. রাজনৈতিক বন্দীমুক্তি
মন্ত্রিসভার হলফ নেওয়ার পর আমরা প্রথম কাজ করিলাম রাজনৈতিক বন্দীদেরে মুক্তি দেওয়া। আওয়ামী লীগাররা এ বিষয়ে ২১ দফা স্বাক্ষরকারী চুক্তিবদ্ধ পার্টি। অন্যেরাও সবাই এ বিষয়ে একমত। কাজেই প্রধানমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ কেবিনেটের এক বিশেষ সভার বৈঠক দিলেন। সর্বসম্মতিক্রমে সকল রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়ার এবং সমস্ত নিরাপত্তা আইন-কানুন বাতিল করিবার প্রস্তাব পাস হইল। আইন বাতিলের যথা-নিয়ম ব্যবস্থা করিবার আদেশ দিয়া বন্দী মুক্তির ব্যবস্থা তৎক্ষণাৎ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র বিভাগকে নির্দেশ দিলেন। তড়িতে সে আদেশ সব স্তর পার হইয়া গেল। আমরা মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জেলখানায় গেলাম। বন্দীরা নিজেদের খরচায় ও উদ্যোগ-আয়োজনে জেল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আমাদের আপ্যায়নের জন্য জেলখানার ভিতরে মন্ডপ রচনা করিয়াছিলেন। তাতে চা-নাশতার ব্যবস্থাও তাঁরা করিয়াছিলেন। মন্ত্রীদের সাথে রাজবন্দীদের সে মিলনে কি আনন্দ! কত উল্লাস। কি কোলাকুলি! প্রধানমন্ত্রী সময়োপযোগী ছোট বক্তৃতা করিলেন। জেলখানার মধ্যে পাবলিক মিটিং আর কি? নযিরবিহীন? নিশ্চয়। রাজবন্দীদের মুক্তি দিবার জন্য প্রধানমন্ত্রী তাঁর গোটা মন্ত্রিসভা লইয়া জেলখানায় গিয়াছেন এর নযির ইতিহাসে আর নাই। স্বাধীনতা সংগ্রাম করিয়া যারা দেশ আযাদ করিয়াছেন (যেমন তারত),. কিম্বা বিপ্লব করিয়া যাঁরা রাজতন্ত্রের বদলে প্রজাতন্ত্র করিয়াছেন (যেমন রাশিয়া), তাঁরাও শাসনভার পাইয়াই পূর্ববর্তী শাসকদের আমলের রাজবন্দীদেরে পাহকারীভাবে খালাস দিয়াছেন। কিন্তু কেউ জেলখানায় গিয়া রাজবন্দীদেরে অভ্যর্থনা করেন নাই। আওয়ামী লীগ সরকারের এ কাজ ইতিহাসে সোনার হরফে লেখা থাকিবে। এটাকে সেন্টিমেন্টাল বলিবেন? সেন্টিমেন্টাল ত বটেই। কিন্তু উঁচু দরের সেন্টিমেন্ট। প্রতাঁকে রূপায়িত সেন্টিমেন্ট। প্রেম-ভালবাসা হইতে শুরু করিয়া মে ডে শহীদ দিবস স্বাধীনতা দেশপ্রেম ইত্যাদি ভাবালুতা যে ধরনের সেন্টিমেন্ট এটাও তাই। রাজনৈতিক অজুহাতে কাউকে বিনা বিচারে বন্দী করার বিরোধী আওয়ামী লীগ। একুশ দফার ওয়াদা এটা। এটা যে সত্যই ওয়াদা ছিল, ধাপ্পা ছিল না দেখাইবার জন্য দফতরে বসিয়া প্রধানন্ত্রী মুক্তির আদেশ দিলেই ওয়াদা পূরণ হইত। কিন্তু আওয়ামী লীগ যে সত্যই বিশ্বাস করে বিনাবিচারে কাউকে বন্দী করা অন্যায়, তা দেখান হইত না। মন্ত্রিসভার জেলখানায় যাওয়া এরই প্রতীক। এই প্রতাঁকের দরকার ছিল এবং আছেও এ দেশে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মী-নেতাদেরে বিনা বিচারে বন্দী করা আমাদের দেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্য। পর পর যত দল রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হইয়াছে, সবাই এই কাজ করিয়াছেন। বিরোধী দলের লোকের দেশপ্রেমে সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন। বিদেশীর ইংগিতে ও সাহায্যে দেশ ধ্বংস করিবার চেষ্টা করিতেছেন। এমনি সব অভিযোগ উপস্থিত করিয়াছেন। বছরের পর বছর ধরিয়া লোকজনকে বন্দী রাখিয়াছেন। তাঁদের শুধু স্বাধীনতা হইতে, দেশ সেবার অধিকার হইতেই বঞ্চিত রাখেন নাই, পারিবারিক জীবন হইতে, স্ত্রী-পুত্র-কন্যার প্রতি ফরয দায়িত্ব পালন হইতেও বঞ্চিত করিয়াছেন। ব্যক্তিগতভাবে স্বাস্থ্যতংগ করা ছাড়াও তাঁদের সংসার ও পরিবার ধ্বংস করিয়াছেন। এটা যে কত বড় নৈতিক পাপ, রাজনৈতিক অপরাধ, সে কথা জোরের সংগে বলার ও দৃঢ়তার সংগে প্রতিকার করার দরকার ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার তাই করিয়াছিলেন। ফলে দেশে রাজনৈতিক নিরাপত্তার ভাব প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। বিরোধী দলের মধ্যে বিশেষভাবে এবং জনসাধারণের মধ্যে সাধারণভাবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিবার আবহাওয়া সৃষ্টি হইয়াছিল। আরও বিশেষভাবে মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে এ আশ্বস্তি আসিয়াছিল যে অতীতে আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের প্রতি তাঁরা যে অন্যায় যুলুম করিয়াছিলেন, আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা তার প্রতিশোধ লইবেন না।
