শিক্ষা সম্বন্ধেও কাজেই আমি অনেক কথা লিখিয়াছি। আগে না থাকিলেও লিখিতে-লিখিতেই বোধ হয় পরে একটা মতবাদ গড়িয়া উঠিয়াছে। এই মতবাদটা আমার অনেক দিনের। সুতরাং যত দিন যাইতেছে, আমি যত বুড়া হইতেছি, আমার মত তত পাকা হইতেছে। অনেকে বলিলেন : ‘মুঢ়ের মতবাদ ও-রূপ দৃঢ় বা গোড়া হইয়াই থাকে। তা যাই হোক, আমার দৃঢ় মতবাদটা এই :
সাধারণ শিক্ষাকে সহজ ও সস্তা করিয়া অল্প সময়ের নির্দিষ্ট মূদ্দতের মধ্যে দেশের নিরক্ষরতা দূর করার স্বপ্ন আমার অনেক দিনের। প্রাইমারি শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার কথা আমি আমার কলেজ-জীবন হইতে ভাবিয়া আসিতেছি। প্রথম সুযোগেই রাজনৈতিক সভার (প্রজা-সমিতির প্রস্তাবরূপে গ্রহণ করাইয়াছি। এটাত গেল প্রাইমারি ও এডান্ট এডুকেশনের কথা। শুধু প্রাইমারি সম্বন্ধেই নয়, মধ্য ও উচ্চশিক্ষা সম্বন্ধেও আমার দৃঢ় ও একগুয়ে মত ছিল এবং এখনও আছে। আমার মতে এ দেশে শিক্ষার চেয়ে পরীক্ষায় বেশি কড়াকড়ি করা হয়। যথেষ্ট স্কুল কলেজ নাই। যা আছে তাতেও শিক্ষক নাই। সময় মত বই-পুস্তক পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায়, তাও খরিদ করিবার সাধ্য খুব কম অভিভাবকেরই আছে। ফলে পড়াশোনা হয় না কিন্তু পরীক্ষার সময় প্রশ্নকর্তা ও পরীক্ষকদের উস্তাদি দেখে কে? প্রশ্নকর্তা ও পরীক্ষকদের উস্তাদি ও পাণ্ডিত্য যাহির করিবার এইটাই সময়। ইয়া-ইয়া উস্তাদি প্রশ্ন। যা পড়ান হয় নাই, তার উপরও প্রশ্ন। এমন কঠিন যে প্রশ্নকর্তারাই তার উত্তর দিতে পারিতেন না খুঁজিয়া-খুঁজিয়া প্রশ্ন করার আগে। তর্ক করিয়া দেখিয়াছি, অনেক শিক্ষক-অধ্যাপকই এ বিষয়ে আমার সাথে একমত। কিন্তু পরীক্ষার প্রশ্ন করিবার বা খাতা দেখিবার সময় ও-সব কথাই ওঁরা ভুলিয়া যান। তখন বলেন, শিক্ষার উন্নত মানের কথা। যেমন শিক্ষক-অধ্যাপক তেমনি গবর্নমেন্ট। এক ব্যাপারে শিক্ষক-সরকারের সম্বন্ধু একেবারে অহি-নকুল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী শিক্ষকরা সরকারী ও আধা-সরকারী দফতরের কেরানীর মাহিয়ানাও পান না। তাঁদের মাইনাটা বাড়াইয়া দিবার কথা বলিলেই সরকার বলেন, তহবিলে টাকা নাই। শিক্ষা কত দাবি-দাওয়া ও ধর্মঘট করিলেন, জনসাধারণ কত আন্দোলন করিল, ‘সরকার’ কান পাতিলেন না। এইখানে শিক্ষক-সরকারের সম্বন্ধটা শোষিত শোষকের তিক্ত সম্পর্ক। কিন্তু ছাত্র ফেল করাইবার বেলা এই শোষিত-শোষকদের মধ্যেই দেখা যায় ঐক্যমত ও সংহতি। .. শিক্ষার মানের দোহাই দিয়া এই যে পরীক্ষা-নীতি চলিতেছে, তার ভয়াবহ পরিণামের কথা যেন কেউ ভাবিতেছেন না। প্রতি বছর শিক্ষাবোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় অর্ধেকের বেশি ছেলেকে ফেল করাইয়া দেশের কি ঘোরতর অনিষ্ট করিতেছেন, সেজন্য যেন কারও মাথাব্যথা নাই। শিক্ষকের মান ও মর্যাদার জন্য, শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় করিবার জন্য শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা স্বীকার করিয়াও সরকার তাঁদের মাইনা বাড়ান না টাকার অভাবের যুক্তিতে। কিন্তু পরীক্ষা সহজ ও বাস্তববাদী করিতে অর্থাৎ বেশি ছাত্র পাস করাইতে টাকার অভাবের প্রশ্ন উঠে না। তবু সে ফেল করান হয়? পরীক্ষকরা করান উস্তাদি-পান্ডিত্য দেখাইবার জন্য। কিন্তু সরকার করান কেন? দুই-একজন উচ্চপদস্থ ক্ষমতাসীন লোকের সাথে আলোচনা করিয়া বুঝিয়াছি ও তাঁরা ছাত্র ফেল করান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে। তাঁরা বলেন, অত লোক ম্যাট্রিক-গ্রাজুয়েট হইলে তাদেরে চাকুরি দেওয়া সম্ভব হইবে না। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়িয়া যাইবে। দেশে বিপ্লব ও এনার্কি আসিবে। কমিউনিষ্টাও আসিয়া পড়িতে পারে। অতএব শিক্ষা কনট্রোল হওয়া দরকার। বুঝিলাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবদান খাদ্য কনট্রোল হইতেই আসিয়াছে শিক্ষা নট্রোল। কনট্রোল ডেমোক্রেসিও ওটারই পরিণাম। কিন্তু তখনও দেশে আসে নাই।
এ মত আমি সমর্থন করিতাম না। বরঞ্চ আমি দেশ ম্যাট্রিক, এমনকি গ্র্যাজুয়েট, দিয়া ভরিয়া ফেলিবার পক্ষপাতী ছিলাম। এ বিষয়ে সার আশুতোষের মত আমাকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল। তিনি বলিয়াছিলেন : ‘আমি বাংলার প্রতিটি হালের পিছনে একজন করিয়া গ্র্যাজুয়েট দেখিতে চাই। স্পষ্টই দেখা যায়, গ্র্যাজুয়েটের আতিশয্যকে সার আশুতোষ ভয় করিতেন না। অতি-গ্র্যাজুয়েটে যদি দেশে কোন বিপ্লব আসেই, তবে সে বিপ্লবে দেশের কল্যাণ ছাড়া অকল্যাণ হইবে না।
শিক্ষক-অধ্যাপকদের জিগাসা করিতাম। তাঁরা কি জানেন না, পরীক্ষা পাসের সাটিফিকেটটা আসলে জীবন সংগ্রামে প্রবেশের পাসপোর্ট মাত্র চাকুরির নিয়োগপত্র নয়। তবে তাঁরা ইংরাজী আরবী ফাসী সংস্কৃতের জন্য এমনকি ইউরোপের ইতিহাস ইংল্যান্ডের ভূগোলের জন্যই বা ছেলেদেরে ফেল করান কেন? তাঁরা কি জানেন না ঐ সব বিষয় আমাদের দেশের সাধারণ নাগরিকদের বৈষয়িক জীবনের জন্য কত অনাবশ্যক? তাঁরা কি জানেন না, একটি ছেলেকে পরীক্ষায় ফেল করাইয়া প্রকারান্তরে তাঁরা কতজন ছেলের লেখা-পড়ার দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন? তাঁরা কি ভুলিয়া গিয়াছেন, অতঃপর আমাদের শিক্ষার মিডিয়ম হইবে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা? উত্তরে অনেকেই বলিয়াছেন : ও-সব শিক্ষা-দফতর ও শিক্ষা বিভাগের আইন-কানুন। শিক্ষার মিডিয়ম বাংলা করা সরকারের কাজ। শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা দফতর, এক কথায় মন্ত্রীরা, ওসব আইন-কানুনে শিক্ষার মিডিয়ম—না বদলানো পর্যন্ত তাঁদেরকিছুই করণীয়নাই।
