এই বয়কটটা নিশ্চিতই আমাদের বোকামি হইয়াছিল। কারণ আমরা যে প্রতিপদে সরকার পক্ষকে বাধা দিয়া সময় নষ্ট করিতেছিলাম সেটা শুধু বিরোধিতায় সময় নষ্ট করিবার জন্য নয়। আমাদের আন্তরিক আশা ছিল ইতিমধ্যে পূর্ব-বাংলার সবকে না। হউক মেজরিটিকে আমরা ঐক্যমতে আনিতে পারি। পূর্ব-বাংলার দুই-একজন বাদে সবাই যুক্তফ্রন্টের লোক। এরা যাদের ভোটে নির্বাচিত হইয়া আসিয়াছেন তাঁরা সবাই যুক্তফ্রন্টের এম, এল, এ.। পূর্ব-বাংলা-আইন-পরিষদে যুক্তফ্রন্ট পার্টিই সরকারী, দল। তাঁরা পার্টি মিটিং-এ প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া কেন্দ্রীয় মেম্বারদের ম্যানডেট দিয়াছেন। এই ম্যানডেট অনুসারে কাজ করাইবার জন্য একদল প্রতিনিধিও করাচি আসিয়াছেন। তাঁদের সাথে একযোগে আমরা অনেক লবিওয়ার্ক করিলাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। বাংলাকে অন্যতর রাষ্ট্রভাষা করিয়া নির্বাচন প্রথা স্থগিত রাখিয়াম ‘শক্তিশালী কেন্দ্রে’র নামে ফেডারেশনের পোশাকে একটি ছদ্ম-ইউনিটরি শাসন রচনা হইয়া গেল। নাম হইল তার ‘ইসলামিক রিপাবলিক’। হক সাহেবের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের পূর্ব-বাংলায় মুসলিম মেম্বাররা একুশ দফার নির্বাচনী ওয়াদা খেলাফ করিয়া এই শক্তিশালী কেন্দ্রের পক্ষে ভোট দিলেন। ১৯৫৪ সালের বিপ্লবী নির্বাচন বিজয়টা এইভাবে সমাধিস্থ হইয়া গেল। আমরা আওয়ামী লীগাররা আর কি করিব? ঐ শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে পূর্ব-বাংলার জনমত যাচাই করিবার চ্যালেঞ্জ দিয়া। আমরা শাসনতন্ত্র দস্তখস্ত দিতে অস্বীকার করিলাম।
তবুও একটা শাসনন্ত্র হইয়া গেল। ভালই হোক আর মন্দই হোক। এই ঘটনায় এই সত্য প্রমাণিত হইল যে দেশের শাসনতন্ত্র রচনা এমন অসাধারণ ব্যাপার নয়, যা রচনার জন্য নয়টি বছর লাগিতে পারে। বস্তুতঃ বর্তমান গণ-পরিষদ কিছু বেশি দেড় মাসের মধ্যে এই শাসন রচনার কাজ শেষ করিয়াছে। এটা অনেকেরই সান্ত্বনার কথা। শুভবুদ্ধির কথা। শান্তিপ্রিয় নাগরিকের কথা। শান্তিপূর্ণ পথে গণতন্ত্র বিকাশের কথা। আমরা নিজেরাও অনেকে শেষ পর্যন্ত এই কথাই বলিলাম। এইভাবে বর্তমানকে গ্রহণ করিলাম। কিন্তু শুভ বুদ্ধিই শেষ কথা নয়। শান্তিপ্রিয়তাই সমস্যা সমাধানের অস্ত্র নয়। এই শাসনতন্ত্রের বলে কেন্দ্রে সর্বশক্তি কেন্দ্রীভূত হইল এবং পূর্ব-বাংলা প্রবঞ্চিত হইল। এটাই যদি শেষ কথা হইত, তবে ব্যাপারটা তেমন জটিল হইত না। আসল কথা এই যে, এই শাসনতন্ত্র সমস্যার সমাধান করে নাই, আরও সমস্যা সৃষ্টি করিয়াছে। যতই ইসলামী বিশেষণ দেওয়া হউক, যে শাসনন্ত্র দুই পাকিস্তানের ভৌগোলিক পৃথক সত্ত্বা ও আর্থিক বিভিন্নতার স্বীকৃতির উপর প্রতিষ্ঠিত না হইবে, তা পাকিস্তানের সত্যিকার বাস্তবানুগ শাসনতন্ত্র হইতে পারে না। সে শাসনতন্ত্র স্থায়ী হইতে পারে না। রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক অবিচার ও অসাম্যকে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের প্রলেপ দিয়া চাপা দিবার চেষ্টা করিলে তাতে ইসলামেরই অপমান করা হয়। যতদিন আমরা এই অসাধু চেষ্টা চালাইব, ততদিন আমাদের জাতীয় জীবনে ঝড়-ঝা চলিতেই থাকিবে।
এই শাসনতন্ত্র দুইটা বড় রকমের সংস্কার প্রবর্তন করিল। পূর্ব-বাংলা পূর্ব পাকিস্তান হইল; আর পশ্চিম অঞ্চলের চার-চারটা স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ নিজ নিজ অস্তিত্ব লোপ করিয়া এক পশ্চিম পাকিস্তান হইল। নামে কিছু আসে যায় না যদি পরিবর্তনের সাথে স্বকীয়তার বিলোপ না হয়। বৈচিত্রহীন ইউনিফরমিটির চেয়ে জাতির শতদল রূপ অনেক বেশি কাম্য দেশের ক্ষমতাশীল নেতারা, শুধু ক্ষমতাহীন চিন্তুকরা নয়, যত তাড়াতাড়ি এই সত্য বুঝিবেন, ততই মংগল।
২২. ওয়ারতি প্রাপ্তি
ওয়ারতি প্রাপ্তি
বাইশা অধ্যায়
১. শিক্ষা সম্পর্কে পূর্ব ধারণা
১৯৫৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর জনাব আতাউর রহমান খাঁর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ কোয়েলিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। কংগ্রেস পার্টি, প্রগ্রেসিভ পার্টি ও তফসিলী ফেডারেশন এই তিনটি হিন্দু দলও এই মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। আমিও একজন মন্ত্রী হই। শিক্ষা-দফতরের ভার নেই।
মন্ত্রী হইলে শিক্ষা-দফতরের ভার নিব, এটা আমার অনেক দিনের শখ। এ শখের বিশেষ কারণ এই যে প্রাইমারি শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার দাবি বাংলার জনগণের অনেক দিনের পুরান দাবি। প্রাক-স্বাধীনতা যুগে প্রজা-সমিতির সৃষ্টি হইতেই আমরা প্রতিটি সভা সম্মিলনীতে এই দাবি করিয়া আসিতেছিলাম। প্রজা নেতা হক সাহবের প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে আমরা বহুবার এ প্রশ্ন তুলিয়াছি। পাকিস্তান হাসিলের পরও বহু সভা-সম্মিলনে এসব কথা বলা হইয়াছে। মন্ত্রীরাও ওয়াদা করিয়াছেন। কিন্তু আশ্চর্য, খুব কম করিয়া হইলেও ত্রিশটা বছর ধরিয়া আমরা যেখানে ছিলাম সেইখানেই আছি। প্রাইমারি শিক্ষা আজও বাধ্যতামূলক হয় নাই।
তাছাড়া আমাদের শিক্ষা সম্বন্ধে আমার নিজস্ব কতকগুলো মতবাদ ছিল। সার আশুতোষ মুখার্জীর মতবাদ ও মার্কিন শিক্ষা-পদ্ধতিই বোধ হয় আমার মত প্রভাবিত করিয়াছিল। আমি কোনও শিক্ষাবিদ বা বিশেষজ্ঞ নই। সামান্য শিক্ষকতা যা করিয়াছি তাতে অভিজ্ঞতা বলিয়া বড়াই করা যায় না। শিক্ষা সম্বন্ধে বিশেষ পড়াশোনা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়াছি, তাও বলা যায় না। তবু শিক্ষার মত গুরুতর ব্যাপারে আমি কতকগুলি মত পোষণ করি, এটা বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু সাহিত্যিক ও সংবাদিকদের সব ব্যাপারেই কিছু-কিছু মত থাকে। বিশেষতঃ সাংবাদিকদের। সম্পাদকীয় লিখিতে হইলে সম্পাদকদিগকে সব বিষয়ে পন্ডিত হইতে হয়। এঁরা সব-ব্যাপারে সকলের নিয়োজিত উপদেষ্টা। এঁরা জিন্না সাহেবকে রাজনীতি সম্বন্ধে গান্ধীজীকে অহিংসা সম্বন্ধে, আচার্য প্রফুল্প চন্দ্রকে রসায়ন সম্বন্ধে, ডাঃ আনসারীকে চিকিৎসা সম্বন্ধে, হক সাহেবকে ওযারতি সম্বন্ধে, শহীদ সাহেবকে দলীয় রাজনীতি সম্বন্ধে, মওলানা আদকে ধর্ম সম্বন্ধে, এমনকি জেনারেল দ্যগলকে যুদ্ধ-নীতি ও স্ট্যালিনকে কমিউনিযম সম্বন্ধে উপদেশ দিয়া থাকেন। সেই উপদেশ না মানিলে কষিয়া গালও তাঁদের দিয়া থাকেন। উপদেশ দেওয়া এদের কর্তব্য ও ডিউটি। ঐ জন্যই তাঁরা সম্পাদক। ঐ জন্যই ওঁদেরে বেতন দেওয়া হয়। মাস্টারদেরে বেতন তেমন দেওয়া হয়। বেতনের বদলে এরা ছাত্রদেরে পাঠ দেন। সম্পাদকরাও দেশের রাষ্ট্র নায়ক ও চিন্তা নায়কদের পাঠ দেন। সম্পাদক মাস্টার, নেতারা ছাত্র। কিন্তু পাঠশালার মাস্টার-ছাত্র এরা নন। কলেজের বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার-ছাত্র। প্রতিদিন সকালে ক্লাস হয়। কলেজের অধ্যাপকরা যেমন পরের বই-পুস্তক পড়িয়া নিজেরা তৈয়ার হইয়া ক্লাসে লেকচার দেন, সম্পাদকরাও বই-পুস্তক ঘাঁটিয়া ঐ ঐ বিষয়ে ওয়াকিফহাল হইয়া সম্পাদকীয় ফাঁদিয়া থাকেন। আমিও প্রায় ত্রিশ বছরকাল ঐ কাজ করিয়াছি। কাজেই কোন বিষয়ে কিছু-না-জানিয়া সর্ববিষয়ে পণ্ডিত হইয়াছি। যাকে বলা যায় : ‘জ্যাক অব-অল-ট্রেডমাস্টার-অব-নান।‘
