(ক) দেশের রাজধানী পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত হওয়ায় এবং দুই অঞ্চলের মধ্যে মবিলিটি অব লেবার ও ক্যাপিটেল না থাকায় সরকারী সমস্ত ব্যয়ের, সরকারী গৃহনির্মাণাদি সাকুল্য খরচের, সবটুকু সুবিধা পশ্চিম পাকিস্তান পাইতেছে। পূর্ব ঋকিস্তান এর একবিন্দুসুবিধা পাইতেছেনা।
(খ) শিল্প ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সব প্রতিষ্ঠান পশ্চিম পাকিস্তানে স্থাপিত ও এখান হইতে পরিচালিত হওয়ায় এই সবের সকল সুবিধাই আঞ্চলিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নতি সাধন করিতেছে।
(গ) দেশের রাজধানী পশ্চিম পাকিস্তানে হওয়ায় ব্যাংকিং ইনশিওরেন্স ইত্যাদি সমস্ত কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস এবং বিদেশী মিশনসমূহের অফিস ও ক্রিয়া কলাপ পশ্চিম পাকিস্তানে সীমাবদ্ধ থাকিতেছে। এ সবের আর্থিক সুবিধা শুধু পশ্চিম পাকিস্তানপাইতেছে।
(ঘ) সরকারী চাকুরিতে দেশের মোট রাজস্বের শতকরা পঁচিশ টাকার বেশি (তৎকালে একশ পঞ্চাশ কোটির মধ্যে সাড়ে বত্রিশ কোটি) ব্যয় হইতেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের উপরের চাকুরির শতকরা একশটি এবং মধ্য নিম্ন-মধ্য চাকুরির শতকরা আশি-নব্বইটি পশ্চিম পাকিস্তানীরা অধিকার করিয়া থাকায় এই হইতে যে বিপুল আয় হয় তার সবটুকু পশ্চিম পাকিস্তানীরাই পায়। ব্যয়ও হয় পশ্চিম পাকিস্তানেই। প্রতি বছর পশ্চিম পাকিস্তান এই হারে ধনী ও পূর্ব পাকিস্তান এই হারে গরিব। হইতেছে।
(ঙ) দেশরক্ষা বাহিনীর পিছনে দেশের মোট রাজস্বের শতকরা ৬২ ভাগ (ভকালে একশ পঞ্চাশ কোটির মধ্যে একশ দশ কোটি) ব্যয় হয়। দেশরক্ষা বাহিনীর কোনও বিভাগে পূর্ব-পাকিস্তানী অফিসার একরূপ না থাকায় এই বিপুল আয় হইতে তারা সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত। চাকুরি-বাকুরি ছাড়াও সরবরাহ বা নির্মাণকার্যের ক্যাকটারি হইতেও তারা বঞ্চিত। ইহার ফল স্বরূপ প্রতি বছর এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পশ্চিম পাকিস্তানকে ধনী ও তুলনায় পূর্ব-পাকিস্তানকে গরিব করিতেছে।
এই ব্যাপারটাই পরিষ্কার হইয়াছিল নবাব গুরমানীর সাথে আমার কথা কাটাকাটিতে। আমি আমার বক্তৃতায় যখন উভয় পাকিস্তানের সমান অধিকার দাবি করিতেছিলাম, তখন আমার বক্তৃতায় বাধা দিয়া নবাব গুরমানী বলিলেন বন্ধুর ভুলিয়া যাইতেছেন যে পাকিস্তান সরকারের রাজত্বে পশ্চিম পাকিস্তান হইতে আসে শতকরা চৌরাশি টাকা; পূর্ব-পাকিস্তান দেয় মাত্র শতকরা ষোল টাকা।
জবাবে সরকারী হিসাবের খাতা দেখাইয়া আমি বলিয়াছিলাম : নবাব সাহেব একটু ভুল করিয়াছেন। পূর্ব-পাকিস্তানের দান শতকরা ষোল নয়। আরও কম। মাত্র চৌদ্দ টাকা।
নিজের বিরুদ্ধে যুক্তি দিতেছি দেখিয়া নবাব গুরমানী সহ পশ্চিমা নেতারা কৌতূহলে আমার দিকে চাহিয়াছিলেন। আমি তাঁদের আরও বিখিত করিয়া বলিয়াছিলাম? বর্তমানে পূর্ব-পাকিস্তান দেয় শতকরা চৌদ্দ। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার বছর দিয়াছিল শতকরা ত্রিশ। আট বছরে শতকরা ষোল কমিয়া হইয়াছে চৌদ্দ। বছরে দুই কমিয়াছে। বাকী চৌদ্দ কমিয়া শূন্যে আসিতে লাগিবে আর মাত্র সাত বছর। ১৯৬৩ সালে পূর্ব-পাকিস্তানের জমার খাতায় যখন শূন্য হইবে, তখন আপনারা ন্যায়ই বলিতে পারিবেন : পূর্ব-পাকিস্তান লোকসানের কারবার। ওটা লিকুইডেট করা যাইতে। পারে।
প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ব্যাংকিং ইনশিওরেন্সসহ সমস্ত শিল্প-বাণিজ্য, প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস করাচিতে হওয়ায় পূর্ব-পাকিস্তানে অর্জিত সকল আয় পশ্চিম পাকিস্তানের হিসাবে জমা করার সুবিধা ছিল।
আমি বক্তৃতার উপসংহারে বলিয়াছিলাম : আপনারা ভূগোলকে অগ্রাহ্য করিবেন। মনে রাখিবেন ভূগোল ও ইতিহাস যমজ সহোদর। যদি ভূগোলকে আপনারা অস্বীকার করেন, তবে ইতিহাস আপনাদের ক্ষমা করিবে না। মনে রাখবেন ইতিহাসের পুনরাবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
গবর্নমেন্ট পার্টি আমার এইসব আর্তনাদে কর্ণপাত করিলেন না। মাঝে হইতে পশ্চিম পাকিস্তানের বিশেষতঃ করাচির উর্দু কাগযসমূহ আমার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহ, দেশদ্রোরে বিক্ষোভ তুলিলেন। আমার বিচারের দাবি করিলেন। কেউ কেউ কিনা বিচারে চৌদ্দ বছর জেলের বা সংগেসার করিয়া গর্দান লইবার ফরমায়েশ দিলেন। গণ-পরিষদে ‘প্রিভিলেজ মোশন’ আসিল। যথারীতি প্রিভিলেজ কমিটিও বসিল এবং সম্পাদকদের তলবের ব্যবস্থাও হইল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হইল না। কারণ সরকারী-দল তাদের পক্ষে।
পশ্চিম পাকিস্তান হইতে এই ধরনের প্রায় সার্বজনীন নিন্দা ও কঠোর-ক প্রতিবাদের ঝড়-তুফানের মধ্যেও আমার বুকে বল, অন্তরে সান্ত্বনা ও মনে আত্মবিশ্বাস জাগরুক রাখিয়াছিল ঢাকা ও চাটগাঁও হইতে প্রায় একই সংগে অজানা বন্ধুদের কয়েকখানা মোবারকবারে টেলিগ্রাম। ঐ সবগুলিতে বিভিন্ন উপাধিতে আমাকে তাঁরা ইতিহাস বিখ্যাত অমর বাগ্মী এড়মও বার্কের সাথে এবং আমার বক্তৃতাকে বার্কের বৃটিশ পার্লামেন্টের বক্তৃতার সাথে তুলনা করিয়া প্রাপ্যাধিক গৌরব ও সম্মান দান করিয়াছিলেন। তার কোনটাতে আমাকে বাক-অব বেংগল, কোনটাতে বাক-অব-ইস্ট বেঙ্গল, আর কোন কোনটাতে বার্ক অব-পাকিস্তান বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছিল। স্বতঃস্ফূর্ত গণ-মনের উল্লাসের প্রতীক হিসাবে এ সবের স্মৃতি আজও আমাকে আনন্দ দেয় বলিয়াই ওদের উল্লেখ করিলাম।
সরকারপক্ষ স্টিম রোলার চালাইলেন। আমরাও দস্তুর মত ‘ফিলিবাস্টারিং’ শুরু করিলাম : ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। সংশোধনী, মুলতবি ও অধিকার প্রস্তাব এবং ধারাবাহিকতার মুক্তা’ (পয়েন্টস-অব-অর্ডার) ইত্যাদিতে সরকার পক্ষকে ব্যতিব্যস্ত রাখিলাম। আমরা আওয়ামী লীগের মেম্বররা বেশির ভাগই ছিলাম আমাদের পার্লামেন্টারি কর্তব্য সম্বন্ধে সদা-সচেতন নিরলস কঠোর পরিশ্রমী ও কর্মব্যস্ত। দিনরাত অধ্যয়ন মুসাবিদা ও রামর্শ করিয়া শত শত সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করিলাম এবং পাহারা কুত্তার মত সর্বদা হাযির থাকিয়া চব্বিশ ঘন্টা ঘেউঘেউ করিতে থাকিলাম। আমি একাই আগেই ১৬৭টি সংশোধনী দিয়া রাখিয়াছিলাম। তারপর আরও বাড়াইয়া দুইশর উপর সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করিলাম। একটিও বাদ না দিয়া প্রতি সংশোধনী পেশ ও তার সমর্থনে দুই-তিন বার পাঁচ-সাত মিনিট করিয়া বক্তৃতা করিয়া যাইতে লাগিলাম। সরকার পক্ষও নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে কম বুদ্ধি রাখিতেন না। কর্মোদ্যমও তাঁদের আমাদের চেয়ে কম ছিল না। আমাদের কৌশলের জবাবে তাঁরা ঠিক করিলেন দিন-রাত ননস্টপ এসেমব্লির অধিবেশন চালাইবেন। এইখানে আমরা চালে হারিয়া গেলাম। আমরা প্রতিবাদে ওয়াকআউট করিলাম। আমার একারই সংশোধনী মারা গেল একশ তেতাল্লিশটা।
