এবারও আমি অপযিশনের ‘ওপেনিং ব্যাটসম্যান’ হইলাম। এর আগেই আমি ১৬৭টি সংশোধনী দাখিল করিয়া রাখিয়াছিলাম। সাধারণ আলোচনার বিতর্কে প্রথম বক্তা হিসাবে আমি একনাগাড়ে দুই দিনে সাত ঘন্টা সময় লইয়াছিলাম। অবশ্য এই সাত ঘন্টার মধ্যে ডিপুটি-স্পিকারের বাধা দানে অনেক সময় নষ্ট হইয়াছিল। তবু আমার বক্তৃতায় (১) পূর্ব-বাংলার পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আবশ্যকতা; (২) ভৌগোলিক অবস্থার হেতু অর্থনৈতিক বিভিন্নতা; (৩) ঐতিহ্যিক ও কৃষ্টিক পার্থক্য; {4) পূর্ব-বাংলার প্রতি ক্রিমিন্যাল ঔদাসীন্য; (৫) রাষ্ট্রের আয়ের প্রায় সবটুকু পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়ের ভয়াবহ পরিণাম; (৬) অর্থনেতিক অসাম্য; (৭) চাকরিতে পূর্ব বাংগালীর শোচনীয় অবস্থা; (৮) তিন সাবজেক্টের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্যতা ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করিতে পারিয়াছিলাম। ১৯৫৬ সালের ১৬ই ও ১৭ই জানুয়ারির গণ-পরিষদের ‘ডিবেট’ বা প্রসিডিং-এর সরকার প্রকাশিত বিবরণী হইতে দেখা যাইবে যে বিনা বাধায় আমি অগ্রসর হইতে পারি নাই। কিন্তু অত বাধা দিয়াও ডিঃ স্পিকার মিঃ গিবন আমাকে ক্লান্ত, বিরক্ত ও রাগান্বিত করিতে পারেন নাই। আমি অসিমুখে তাঁর বাধা ঠেলিয়া অগ্রসর হইতেছিলাম। আমার ধৈর্য দেখিয়া আমার নেতা অপযিশন লিডার মিঃ সুহরাওয়ার্দী পর্যন্ত তার হইয়াছিলেন। মিঃ গিবনের পুনঃপুনঃ বাধা দানে আপত্তি করিয়া তিনি বলিয়াছিলেন : মিঃ ডিপুটি স্পিকার, বক্তাই অপযিশন দলের প্রথম বক্তা; তাঁকে বিনা বাধায় বক্তৃতা করিতে দিন। আপনি তাঁর বক্তৃতার ধারা পছন্দ নাও করিতে পারেন কিন্তু এটা তাঁর নিজস্বধারা।
ডিপুটি স্পিকার মিঃ গিবন মিঃ সুহরাওয়ার্দীকে বাধা দিয়া বলেন : ‘কে বলিয়াছে আমি তাঁর বক্তৃতার ধারা পসন্দ করি না? আমি তাঁর ধারা খুবই পসন্দ করি। আপনি এঁর বক্তৃতার গোড়ার দিকে এখানে ছিলেন না বলিয়াই আপনি শুনেন নাই, আমি এর সম্পর্কে কি বলিয়াছি। আমি বলিয়াছি : মিঃ আবুল মনসুর একজন ‘লাভেবল লইয়ার (প্রিয়ভাষী উকিল)’।
জনাব সুহরাওয়ার্দী : ‘সে কথা সত্য। কিন্তু তবু আমি বলিতেছি যে আপনি যখন এর বক্তৃতায় ঘনঘন বাধা দিতেছিলেন তখন আমি তাঁর পাশে বসিয়া এই কথাটাই ভাবিতেছিলাম : আমি নিজে অত বাধা পাইলে একবিন্দু অগ্রসর হইতে পারিতাম না এবং বক্তৃতার খেই হারাইয়া ফেলিতাম।‘
৭. শাসনতন্ত্রের বাঞ্ছিত মূলনীতি
আমি নামকরা বাগ্মী নই। কিন্তু দেওয়ানী উকিল। এতক্ষণ ধরিয়া বক্তৃতা করিতে পারিয়াছিলাম আমার কাছে বিষয়-বস্তু তথ্য-পরিসংখ্যা প্রচুর ছিল বলিয়া। আমি অনেক বই-পুস্তক পড়িয়া ঐ বক্তৃতার জন্য তৈয়ার হইয়াছিলাম। আমি জানিতাম, আমি মাঠে-ময়দানে জনসভায় বক্তৃতা করিতে যাইতেছি না, গণ-পরিষদে শাসনতন্ত্রের কাঠামোর উপরে বক্তৃতা করিতে যাইতেছি। আমার বক্তৃতায় শাসন সম্পর্কে এই কয়টি মূলনীতির অপরিহার্যতা উল্লেখ করিয়াছিলাম : (১) পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে রচিত হইতে হইবে। কারণ (ক) লাহোর প্রস্তাব একটি নির্বাচনী ওয়াদা। উহারই ভিত্তিতে ভারতের মুসলমান ভোটাররা ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়াছিল। (খ) লাহোর প্রস্তাব তদানীন্তন ভারতের স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশসমূহের মধ্যে একটা পবিত্র চুক্তি। এই চুক্তির পক্ষগণের সকলের সম্মতি ব্যতীত কোনও এক পক্ষের ইচ্ছায় এই চুক্তির রদ-বদল হইতে পারে না। (গ) লাহোর প্রস্তাব একটি দূরদশী, বাস্তবধর্মী, সুচিন্তিত পরিকল্পনা। পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান, দুই অঞ্চলের ভাষিক, কৃষ্টিক ও ঐতিহ্যিক পার্থক্যের উপর ভিত্তি করিয়াই উহা রচিত হইয়াছে; (ঘ) মুসলিম লীগের পরবর্তী অধিবেশনের কোনও প্রস্তাবে লাহোর প্রস্তাব সংশোধিত বারিবর্তিত হয় নাই; ইবার কোনও কারণ ও অধিকার ছিল না; (ঙ) পূর্ব-পাকিস্তানের ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ওয়াদা লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে রচিত। পূর্ব-পাকিস্তানের উহা জাতীয় দাবি এবং পূর্ব পাকিস্তানী প্রতিনিধিদের উহা পবিত্র ওয়াদা। (চ) উক্ত ২১ দফা ওয়াদার ১৯ দফায় যে তিন বিষয়ের কেন্দ্রীয় সরকারের কথা বলা হইয়াছে, উহা অবাস্তব-অসাধ্য দাবি নয়। স্বাধীনতার প্রাক্কালে বৃটিশ সরকারের কেবিনেট মিশন যে গ্রুপিং সিস্টেম ও ফেডারেল কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়াছিল তাতেও তিন-বিষয়ের কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যবস্থা ছিল। (ছ) লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত না হইলে তা পরিণামে যে টিকিবেও না, দেশবাসী তা গ্রহণ করিবে না, সে কথা লাহোর প্রস্তাবের মধ্যেই সুস্পষ্ট হুশিয়ারি স্বরূপ উচ্চারিত হইয়াছে।
লাহোর প্রস্তাব ব্যতীত অন্য কোনও বুনিয়াদে যে পাকিস্তানের শাসনত্ম রচিত হইতে পারে না, তা দেখাইতে গিয়া আমি বলিয়াছিলাম। (২) পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান আসলে দুইটি দেশ, (৩) উহাদের বাশেন্দারা আসলে দুইটি জাতি; (৪) দুই পাকিস্তানের আসল সমস্যা রাজনৈতিকের চেয়ে বেশি অর্থনৈতিক; কারণ অর্থনৈতিক স্বার্থ দুই-এর এক ও অজি নয়; (৫) সরকারী আয় জনগণের ব্যয়, সরকারী ব্যয় জনগণের আয়, এই নীতিতে সরকারী ব্যয় হইতে পূর্ব-বাংলার কোনও লাভ হয় নাই; (৬) পূর্ব-বাংলা হইতে যে টাকা পশ্চিমে আসে, তা আর ফিরিয়া যায় না। এটা কার্যতঃ একরোখা অর্থনীতি; (৭) এই একরোখা অর্থনীতির বিষময় পরিণাম কিভাবে দেশের অনিষ্ট সাধন করিতেছে তা দেখাইতে গিয়া আমি সরকারী স্টেটিসটিকস্ হইতে বিস্তারিতভাবে ‘ফ্যাট এও ফিগার্স কোট’ করিয়া দেখাইয়াছিলাম।
