বলিলেন বটে লজ্জিত কিন্তু কারও মুখে লজ্জার কোনও লক্ষণ দেখিলাম না। তাছাড়া নবাব গুরমানী সাহেবের মেহমানদারিও নবাবের মতই। তাঁর একতরফা মিষ্টি বক্তৃতার সাথে-সাথে আমাদের মধ্যে প্রচুর মিষ্টিকেক-পেটিস ও চা-কফি বিতরণ করা হইতেছিল। উপস্থিত সকলে সে সব গলাধঃকরণে ব্যস্ত থাকায় তাঁদের চোখে মুখে লজ্জার ভার থাকিলেও তা ধরা সম্ভব ছিল না। পক্ষান্তরে গুরমানী সাহেবের মিঠা বক্তৃতায় আমরা এমন আসুদা হইয়া গিয়াছিলাম যে তাঁর চা-বিস্কুটের মিষ্টতা আমাদের তেমন মুখরোচক হইল না। আমরা গুরমানী সাহেবের এই ভদ্রতার জন্য তাঁকে হাজার হাজার ধন্যবাদ দিয়া বিদায় হইলাম।
৫. চৌধুরী মন্ত্রিসভা
পরদিন ১০ই আগস্ট চৌধুরী মোহাম্মদ আলী মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করিলেন। যুক্তফ্রন্ট নামে কৃষক-শ্রমিক পার্টি, কংগ্রেস ও তফসিলী সকলেই মন্ত্রিত্ব লইয়া সে মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন। স্বয়ং হক সাহেব চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর অধীনে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হইলেন। আওয়ামী লীগার ও কে.এস.পি-রা একই সোমারসেট হাউসে অথবা নিকটবতী বেলুচ মেসে থাকিতাম বলিয়া আগের রাত্রেও কৃষক-শ্রমিক পার্টিকে পাঁচ-দফা চুক্তি আদায়ে আমাদের সহযোগিতা অফার করিয়াছিলাম। কিন্তু তাঁরা তখন মন্ত্রিত্ব লইয়াই ব্যস্ত। আমাদের কথাকে তাঁরা বোধ হয় ভাংগানির মতলব মনে করিলেন। তাঁদের মধ্যে একমাত্র হামিদুল হক চৌধুরী ও মোহন মিয়া সাহেবই আমাদের প্রস্তাবের আন্তরিকতায় বিশ্বাস করিলেন বলিয়া মনে হইল। কিন্তু তাঁদের উপদেশও অগ্রাহ্য করিয়া হক সাহেব যখন পরদিন বিনাশর্তে নিজের মর্যাদা হানিকর মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিলেন তখন মোহন মিয়া দুঃখিত হইলেন এবং হামিদুল হক মন্ত্রিত্ব নিতে অস্বীকার করিলেন।
পরদিন ১১ই আগস্ট আতাউর রহমান, মুজিবুর রহমান ও আমি এক যুক্ত বিবৃতি দিলাম। তাতে পাঁচ-দফা-চুক্তির উল্লেখ করিলাম। যুক্ত ফ্রন্ট একটু শক্ত হইলে যে আমরা ঐ সব শর্ত আদায় করিতে পারিতাম, সে কথাও বলিলাম। আমাদের অন্তবিরোধের ফলে ১৯৫৪ সালের অতবড় জয়টা এমনি করিয়া ব্যর্থ হইয়া গেল।
এরপর আমাদের অপযিশনের পালা শুরু। প্রথমেই আসিল সাবেক গবর্নর জেনারেল কর্তৃক রচিত ৩৯টি বেআইনী অর্ডিন্যান্স দুরস্ত করার বিল। ফেডারেল কোর্টের রায়ে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল যে ঐ আইনগুলি নয়া গণ-পরিষদকে দিয়া ভ্যালিডেট করিতে হইবে। এইগুলি হইয়া যাইবার পর আসিল পশ্চিম-পাকিস্তান একত্রীকরণ বিল। অর্ডিন্যান্সরূপে এ ব্যবস্থা ইতিপূর্বেই প্রযুক্ত হইয়া গিয়াছিল। ব্যাপারটাকে আইন-সম্মত করা মাত্র। তবু আমরা ইহার জোর বিরোধিতা করিলাম। তিন কারণে : (১) পশ্চিম পাকিস্তানের একত্রীকরণের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত পূর্ব-বাংলার স্বার্থ-সম্পর্কিত পাঁচ-দফা-চুক্তির অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য বিষয় বাদ দিয়া একতরফাভাবে এই বিল আনা হইয়াছে। (২) পশ্চিম পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশসমূরে গণভোট ব্যতিরেকে শুধু মুসলিম লীগ পার্টির দলীয় চাপে প্রদেশগুলি ভাংগিয়া দেওয়া হইতেছে। (৩) প্রদেশগুলির অস্তিত্ব বজায় রাখিয়া আঞ্চলিক স্বায়ত্ত শাসিত যোনাল ফেডারেশনরূপে চারটি প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলি একত্র করার বদলে উহাদের অস্তিত্ব বিলোপ করিয়া গোটা পশ্চিম পাকিস্তানকে একটি প্রদেশ করা হইয়াছে। বিরোধী দলের পক্ষ হইতে আমিই প্রথম বক্তৃতা করিলাম। আমার সুদীর্ঘ বক্তৃতার মূলকথা ছিল দুইটি : (১) পূর্ব-বাংলার দাবি মত পাঁচ-দফা-চুক্তি কার্যকরী করা (২) পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখিয়া পূর্ব বাংলায় সমান-ক্ষমতাভোগী একটি যোনাল সাবফেডারেশন করা। লাহোরের ‘পাকিস্তান টাইমস’ আমার এই প্রস্তাবকে ‘মনসুর প্ল্যান’ নামে যথেষ্ট পাবলিসিটি দিয়াছিলেন।
মুসলিম লীগের দলীয় শৃংখলার খাতিরে বিভিন্ন প্রাদেশিক নেতৃবৃন্দ সকলেই সরকারী বিল সমর্থন করিলেও তলে-তলে অনেকেই এবং গণ-পরিষদের বাইরের প্রায় নেতৃবৃন্দই এই প্ল্যান সমর্থন করিয়াছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগ পার্টি যুক্তফ্রন্টের সমর্থনে মেজরিটির স্টিমরোলার চালাইয়া এক ইউনিট আইন পাস করাইয়া ফেলিলেন। এটা ১৯৫৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বরের ঘটনা। দুইদিন পরেই ৩রা অক্টোবর গবর্নর-জেনারেলের অনুমোদন সহ উক্ত আইন গেযেট হইয়া গেল। ৬ই অক্টোবর নয়া প্রদেশের গবর্নর হইলেন নবাব মুশতাক আহমদ গুরমানী। অর্ডিন্যান্সের-বলে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিম পাকিস্তানের গবর্নর তিনি আগে হইতেই ছিলেন। এবার ডাঃ খান সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্বে নয়া মন্ত্রিসভা গঠিত হইয়া গেল। সবই রেডিই ছিল। ১৪ই অক্টোবর জাবেতা তাবে পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশ প্রতিষ্ঠিত হইল।
৬. শাসনতন্ত্র রচনা
অতঃপর ১৯৫৬ সালের ১২ জানুয়ারি হইতে শাসনতন্ত্র রচনায় হাত দেওয়া হইল। সর্ব-সম্মত শাসনতন্ত্র রচনার জন্য আমরা সকল প্রকার চেষ্টা করিলাম। পাকিস্তানের বয়স আট বছর হইয়া যাওয়ার পরেও শাসনতন্ত্র রচিত না হওয়া একটা পরম লজ্জার ও দুর্ভাগ্যের বিষয় ছিল। এ সম্বন্ধে পযিশন দল ও অপযিশন দলের সবাই একমত হইলাম। সেজন্য শাসনতন্ত্র রচনার কাজে সহযোগিতা করিতে আমরা সর্বদাই প্রস্তুত ও আগ্রহশীল ছিলাম। অপযিশন বলিতে তখন কার্যতঃ এক আওয়ামী লীগ। গোড়াতে কিছুদিন অপযিশনে বসিয়া অবশেষে হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবও মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ায় আওয়ামী লীগ ব্যতীত আর যাঁরা অপযিশনে রহিলেন, তাঁদের মধ্যে জনাব ফিরোয় খা নুন ও নবাব মোযাফফর আলী কিযিলবাস ও আযাদ পাকিস্তান পার্টির একমাত্র প্রতিনিধি মিয়া ইফতিখারুদ্দিন এবং স্বাধীন মুসলিম লীগ-মেম্বর জনাব ফযলুর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য। পূর্ব-বাংলার স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে এঁরা কেউ আওয়ামী লীগের সমর্থন না করায় শাসনতন্ত্রকে গণমুখী করিবার ব্যাপারে এঁরা কোনও কাজে লাগিলেন না। ফলে পাঁচ দফা মারি-চুক্তি কার্যকরী করিবার ব্যাপারে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইলাম। যুক্ত-নির্বাচন প্রথাও গ্রহণ করা হইল না। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ত দূরেই থাকিল। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনকে অধিকতর সংকুচিত করা হইল। আমাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় আমরা ‘জীবন-মরণ সংগ্রামের পথ’ বাছিয়া লইলাম।
