সেদিন ৮ই আগস্ট ছিল গণ-পরিষদের বৈঠক শুরু হওয়ার কথা। আমরা সে বৈঠকে গেলাম। জনাব গুরমানীর সভাপতিত্বে পরিষদের বৈঠক বসিল। কিন্তু তখনও মন্ত্রিসভা গঠিত না হওয়ায় গণ-পরিষদের কাজ হইতে পারিল না। পরবর্তী ১২ই আগস্ট সরিখে স্পিকার-ডিপুটি-স্পিকার নির্বাচন হইবে ঘোষণা করিয়া ঐ তারিখ পর্যন্ত পরিষদের বৈঠক মুলতবি হইল। গণ-পরিষদ মুলতবি হওয়ায় মন্ত্রিসভা লইয়া জল্পনা করা ছাড়া আমাদের আর কাজ থাকিল না। এমন অবসর পাইলে আমি সাধারণতঃ সিনেমা দেখিয়াই সময় কাটাইতাম। কিন্তু আজ ত সিনেমা দেখা যায় না। আজ আমাদের নেতা শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বে পাঁচ-দফা চুক্তির সাফল্যে পূর্ব-বাংলার ভাগ্য তথা সারা পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নির করিতেছে সরল আন্তরিকতার সংগেই তখন এ কথা বিশ্বাস করিতাম। কাজেই এতবড় গুরুতর দায়িত্ব ফেলিয়া সিনেমা দেখা ত যায় না। দেশের জন্য সিনেমা দেখা স্যাক্রিফাইস করিলাম।
কিন্তু সারাদিনটা অমনি-অমনি গেল। কিছুই ঘটিল না। শহীদ সাহেব কমিশন পাইলেন না। পরদিন ১ই আগস্টও কমিশন আসিল না। লাতের মধ্যে খবর পাইলাম যে মুসলিম লীগ নেতারা কে.এস.পি. ও তফসিলী সহ কতিপয় হিন্দু নেতার সাথে দেন-দরবার চালাইয়াছেন। এমনও খবর পাইলাম যে ১৩ জন কে.এস.পি. ও ৫ জন হিন্দু মেম্বর বিনাশর্তে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর প্রধানমন্ত্রিত্ব মানিয়া লইবার ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছেন। কে.এস.পি-র বন্ধুদের সংগে সাক্ষাৎ করিয়া কথাটার সত্যতা যাচাই করিবার চেষ্টা করিলাম। তাঁরা যদিও এই খবরের সত্যতা অস্বীকার করিলেন, তবু আমরা তাঁদের কাছে আমাদের অভিমত ব্যক্ত করিয়া বলিলাম : যদি শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী মানিতে আপনাদের আপত্তি থাকে, তবে হক সাহেবকেই প্রধানমন্ত্রী করুন, আমরা আওয়ামী লীগ তা মানিয়া লইব। তবু পূর্ব-বাংলার প্রতিনিধিদেরে দুই ভাগ হইতে দিব না। আমাদের কথা দুই-চার জন কে.এস.পি. নেতা উৎসাহের সংগে গ্রহণ করিলেন এবং পার্টিতে আলোচনা করিবেন বলিয়া কথা দিলেন। এঁরা পরে দুঃখের সংগে জানাইলেন যে ব্যাপার অনেক দূর অগ্রসর হইয়া গিয়াছে, এখন আর পিছাইবার উপায় নাই।
সারাদিনই শহীদ সাহেবের বাসায় যাতায়াত করিয়া কাটাইলাম। জানিতে পারিলাম, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ঐদিন একাধিকবার শহীদ সাহেবের সহিত মোলাকাত করিয়া তাঁকে ডিপুটি-প্রধানমন্ত্রিত্ব অফার করিয়াছেন। নামে মাত্র চৌধুরী সাহেব প্রধানমন্ত্রী থাকিবেন। আসলে ডিপুটি-প্রধানমন্ত্রী শহীদ সাহেবই প্রধানমন্ত্রী থাকিবেন। এই ধরনের কথা চৌধুরী সাহেব তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মিষ্ট ও বিনয়-নম্র ভাষায় বলিয়া প্রস্তাবটিকে লোভনীয় করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। শহীদ সাহেব নিজে এবং আমরা সকলে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিলাম।
সন্ধ্যার দিকে শহীদ সাহেব তাঁর ‘থ্রি মাস্কটিয়ার্স’ আতাউর রহমান, মুজিবুর রহমান ও আমাকে এক কোণে ডাকিয়া নিয়া বলিলেন : ‘তোমরা এক্ষুণি পাঞ্জাব হাউসে গুরমানী সাহেবের সংগে দেখা কর।’
আমরা তখন পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের প্রতি আস্থা হারাইয়াছি। কাজেই বলিলাম : ‘রমানী সাহেবের সাথে দেখা করিয়া কোনও লাভ আছে?’
শহীদ সাহেব বলিলেন : ‘লাভ-লোকসানের কথা নয়। গুরমানী সাহেব তোমাদের তিন জনের নাম করিয়াই তাঁর সাথে দেখা করিতে অনুরোধ করিয়াছেন। তোমাদেরে পাঠাইব বলিয়া আমি ওয়াদা করিয়াছি।‘
৪. আশা কুহকিনী
নেতার ওয়াদা রক্ষার জন্য কতকটা, আর মানুষের আশার শেষ নাই বলিয়াও কতকটা, আমরা গুরমানী সাহেবের সাথে দেখা করিতে পাঞ্জাব হাউসে গেলাম। শহীদ সাহেবের গাড়িতেই গেলাম। লোকজন আমাদের জন্য সিঁড়িতেই দাঁড়াইয়া অপেক্ষা করিতেছিলেন। বোঝা গেল, আমাদের পাঠাইয়া শহীদ সাহেব গুরমানী সাহেবকে ফোন করিয়া দিয়াছেন। লোকজনের মধ্যে অফিসার-গোছের একজন আমাদের পথ দেখাইয়া গুরমানী সাহেবের ড্রইংরুমে নিয়া গেলেন। ঢুকিয়াই দেখিলাম একদম ‘হাউস ফুল’। এক চৌধুরী মোহাম্মদ আলী বাদে পশ্চিম পাকিস্তানের সকল প্রদেশের নেতারা সেখানে জমায়েত হইয়াছেন। জনাব গুরমানী ছাড়া দওলতানা, চুন্দ্রিগড়, দস্তী, খুরো, রাশদী, তালপুর ও হারুনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সকলে উঠিয়া অতিরিক্ত তাযিমের সাথে আমাদেরে অভ্যর্থনা করিলেন। আমরা না বসা পর্যন্ত কেউ বসিলেন না। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। আমরা তিন বন্ধুতে চাওয়া-চাওয়ি করিলাম। সব ফতেহ কোনও আশা নাই।
গুরমানী সাহেবই প্রথমে কথা বলিলেন। তিনি প্রথমে আমাদেরে জানাইলেন যে চৌধুরী মোহাম্মদ আলী একটা যরুরী কাজে আটকিয়া যাওয়ায় তাঁর আসিতে একটু দেরি হইবে। ইতিমধ্যে আমাদের আলোচনা চলিতে থাকুক। আলোচনার বিষয় কি আমরা জানিতাম না বলিয়া আমরা চুপ করিয়া রহিলাম। গুরমানী সাহেব তাঁর স্বভাব সিদ্ধ মিঠা যবানে ডিপ্লম্যাটিক ল্যাংগুয়েজে অনেক আকাশ-পাতাল ভ্রমণ করিয়া যা বলিলেন তার সারমর্ম এই : শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করিবার পথে বিপুল বাধা সৃষ্টি হইয়াছে। সেসব বাধার মধ্যে মাত্র দুইটির কথাই তিনি বলিতেছেন। প্রথমতঃ আওয়ামী লীগ পূর্ব-পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টি নয়। তবু তাঁরা প্রধানমন্ত্রিত্ব এবং তার সাথে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও সর্ব-বিষয়ে প্যারিটি দাবি করিতেছেন। নিরঙ্কুশ যুক্ত-নির্বাচন দাবি করার দরুন হিন্দু সদস্যরাও আওয়ামী লীগকে সমর্থন করিতেছেন না। পক্ষান্তরে হক সাহেবের যুক্তফ্রন্ট পার্টি পূর্ব-পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টি হইয়াও প্রধানমন্ত্রিত্ব দাবি করিতেছে না। চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকেই তাঁরা প্রধানমন্ত্রী করিতে রাযী আছেন। প্যারিটি ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন সম্বন্ধে তাঁদের কোন দাবি নাই। এর উপর হিন্দু মেম্বররাও হক সাহেবের পার্টিকেই সমর্থন করিতেছেন। এ অবস্থায় শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করিতে মুসলিম লীগ পার্টিকে আর কিছুতেই রাযী করান যাইতেছে না। দ্বিতীয়তঃ শহীদ সাহেব পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যতম বিশিষ্ট ও সম্মানিত মুসলিম লীগ নেতা জনাব খুরোর বিরুদ্ধে বিষোদগার করিয়া অবস্থা এমন তিক্ত করিয়া ফেলিয়াছেন যে গুরমানী সাহেব সহ উপস্থিত সকল নেতার সমবেত চেষ্টা সত্ত্বেও মুসলিম লীগ পার্টি মেম্বরগণকে শহীদ সাহেবের প্রতি নরম করা যাইতেছে না। সেজন্য গুরমানী সাহেব সহ উপস্থিত সকল লীগ-নেতাই খুব দুঃখিত। শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করিবার যে ওয়াদা তাঁরা করিয়াছিলেন, সে ওয়াদা রক্ষা করিতে পারিলেন না বলিয়া তাঁরা নিরতিশয় লজ্জিত।
