৩. ষড়যন্ত্র
মির্যা সাহেবড়লাট হইয়াছেন বটে কিন্তু তখনও বড়লাট ভবনে উঠিয়া যান নাই। ভিক্টোরিয়া রোডের অদূরে যে বাড়িতে তিনি আগে হইতে থাকিতেন সেখানেই রহিয়াছেন। বোঝা গেল, টেলিফোনে কথা হইয়াই ছিল। কারণ দেখিলাম মির্যা সাহেব দরজায় দাঁড়াইয়া আমাদের জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। শহীদ সাহেব ভিতরে গেলেন না। আমরা থ্রি মাক্কিটিয়ার্সকে মির্যার হাতে সমর্পণ করিয়া তিনি খানিক পরে আসিতেছেন বলিয়া চলিয়া গেলেন।
মির্যা সাহেব আমাদের লইয়া ড্রইংরুমে ঢুকিলেন। আলোচনা তিনি একতরফা ভাবেই শুরু করিলেন। তিনি যা বলিলেন তার সারমর্ম এই যে শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করার ইচ্ছা তাঁর নিজের এবং পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের সকলেরই আছে। কিন্তু আমরা নিজেরাই শহীদ সাহেবের কেসটা খারাপ করিতেছি কড়া-কড়া শর্ত দাবি করিয়া। আমরা যদি একটু নরম না হই, তবে শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্ব বিপন্ন হইতে পারে। আমরা জবাবে বলিলাম যেনূতন কোনও শর্ত-টত ত আমরা দেই নাই; মারিতে যে পাঁচদফা চুক্তিনামা স্বাক্ষরিত হইয়াছিল তাতেই ত আমরা অটল আছি। মির্যা সাহেব মাথা নাড়িয়া বলিলেন : মারি চুক্তির চেয়ে বেশি আমরা দাবি করিতেছি। প্রমাণ স্বরূপ তিনি বলিলেন যে তফসিলী হিন্দু নেতারা তার সাথে দেখা করিয়া বলিয়াছেন যে আওয়ামী লীগ নাকি তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট কয়েক বছরের জন্যও রিয়াভেশন দিতে রাযী না। এটা নাকি তাঁদের সংগে চুক্তির খেলাফ। বর্ণহিন্দু নেতাদের অনেকে মির্যা সাহেবের সাথে দেখা করিয়া নাকি তফসিলীদের এই দাবি সমর্থন করিয়াছেন। মির্যা সাহেব আরও বলিলেন যে আমরা প্যারিটির ব্যাপার নিয়া বাড়াবাড়ি করিতেছি।
আমরা তিনজনেই মির্যা সাহেবের এইসব কথা অস্বীকার করিলাম। প্রমাণ স্বরূপ মারি-চুক্তি-পত্র দেখিতে তাঁকে অনুরোধ করিলাম। তিনি বলিলেন : ‘হাতে পাঁজি মংগল বারের’ দরকার কি? তাঁর কাছে ঐ চুক্তিনামার এক কপি আছে। এখনই তা দেখা যাইতে পারে। মির্যা সাহেব ঘন্টা বাজাইয়া তাঁর সেক্রেটারিকে মারি-চুক্তিনামা আনিতে বলিলেন। সেক্রেটারি সাহেব অল্পক্ষণেই এক টুকরা টাইপ-করা কাগ হাযির করিলেন।
একটা দস্তখতহীন কাগযের টুকরা। আমাদের মুখের ভাব লক্ষ্য করিয়াই মির্যা সাহেব বলিলেন : ওটা অবশ্য অরিজিনাল নয়, টু কপি। আমরা তিন বন্ধুতে এক সংগে বুকিয়া পড়িয়া কাগযটি পড়িয়া ফেলিলাম। কাগটিতে পাঁচ-দফা এইভাবে ইংরাজীতে লেখা আছে :
(১) ওয়ান ইউনিট
(২) রিজিওন্যাল অটনমি
(৩) প্যারিটি ইন রিপ্রেয়েন্টেশন
(৪) জয়েন্ট ইলেকটরেট উইথ রির্ভেশন ফর শিডিউলড কাস্ট হিন্দুয ফর টেন ইয়ার্স
(৫) টু স্টেট ল্যাংগুয়েজেয–উর্দু এণ্ড বেংগলি।
আমরা অবাক হইলাম। প্রতিবাদ করিলাম। এটা মারি-চুক্তির ট্রু কপি নয়, বলিলাম। দুই নম্বর দফায় ‘রিজিওন্যাল অটনমির‘ আগে ‘ফুল’ কথা ছিল, সেটা বাদ দেওয়া হইয়াছে। তিন নম্বর দফায় প্যারিটির পরে “ইন অল রেসপেক্টসের” স্থলে “ইন রিপ্রেয়েন্টেশন” লেখা হইয়াছে। চার নম্বর দফায় ‘উইথ রিযার্ভেশন ইত্যাদি’ কথা নূতন যোগ করা হইয়াছে।
এইসব পরিবর্তন কে করিল? কবে করিল? স্বাক্ষরিত চুক্তিনামায় কোনও পরিবর্তন করার অধিকার কারও নাই। আমরা অরিজিনাল চুক্তিনামা দেখিতে এবং দেখাইতে বড়লাটকে অনুরোধ করিলাম। খুব জোরের সংগেই বলিলাম,দুরভিসন্ধিমূলে কেহ বড়লাটকে ঐ বিকৃত নকল দিয়াছেন।
বড়লাট মির্যা সাহেব উক্ত নকলের খাঁটিত্ব লইয়া আমাদের সাথে তর্ক করিলেন না। বরঞ্চ তিনি প্রথমে তফসিলী হিন্দুদের জন্য রিতেশনের প্রয়োজনীয়তার উপর বক্তৃতা করিলেন। দশ বছর নাই হোক, অন্ততঃ পাঁচ বছর দিতে আমাদের আপত্তি করা উচিৎ নয়, এই উপদেশ আমাদেরে দিলেন। আমরা মির্যা সাহেবের মূল্যবান বক্তৃতার সারমর্ম হম করিতে-করিতে বিদায় হইলাম। কারণ ইতিমধ্যে শহীদ সাহেব স্বয়ং আমাদের নিতে আসিলেন। আমরা তিন বন্ধুই মির্যার কথা একই রকম বুঝিলাম। তা এই যে (১) মির্যাসাহেব এবং সম্ভবতঃ মুসলিম লীগ-নেতারা কংগ্রেস ও তফসিলী হিন্দুদের সাথে একটা পৃথক সমঝোতার চেষ্টা করিতেছেন বা করিয়া ফেলিয়াছেন; (২) মুসলিম লীগ নেতারা শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করার ওয়াদা হইতে গলা ফসকাইবার সাধ্যমত চেষ্টা করিতেছেন।
বড়লাটের নিকট হইতে ফিরিবার পথেই গাড়িতে শহীদ সাহেবকে সব কথা বলিলাম এবং আমাদের আশংকার কথাও তাঁকে জানাইলাম। সব শুনিয়া শহীদ সাহেব বলিলেন : কোনও চিন্তার কারণ নাই। সব ঠিক আছে। হয়ত আগামীকালই একটা সুখবর পাইবে।
আমরা আশা-নিরাশার মধ্যে রাত কাটাইলাম বটে, কিন্তু পরদিন ৮ই আগস্ট সত্যই সুখবর পাইলাম। মুসলিম লীগ পার্টির তরফ হইতে একটা ঘোষণা খবরের কাগযে বাহির হইয়াছে। তাতে বলা হইয়াছে, মুসলিম লীগের বৈঠকে মুসলিম লীগ আওয়ামী লীগ কোয়েলিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছে। শহীদ সাহেবকে কোয়েলিশনের নেতা হিসাবে গ্রহণ করা হইয়াছে। ঐ সংবাদে আরও বলা হইয়াছে যে শহীদ সাহেব তাঁর মন্ত্রিসভার নামের তালিকাও প্রস্তুত করিয়া ফেলিয়াছেন। প্রদিনই শপথগ্রহণ কার্য সম্পন্ন হইবে।
বুঝিলাম আমাদের সন্দেহ অমূলক। শহীদ সাহেবের কথাই ঠিক। যতই হউক, তিনি আমাদের চেয়ে বেশি খবর রাখেন ত। ঐ সংবাদটির সংগে-সংগে আরেকটি খবরও ঐদিনকার কাগযে বাহির হইয়াছে। ভাতে চৌধুরী মোহাম্মদ আলী বলিয়াছেন যে, মুসলিম লীগ পার্টি চৌধুরী সাহেবকেই মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষমতা দিয়া প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছে। আমরা চৌধুরী সাহেবের ঘোষণা ভাল অর্থেই গ্রহণ করিলাম। মুসলিম লীগ পার্টি তাদের লিডারকে মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষমতা ত দিবেই। সেই ক্ষমতাবলেই ত তিনি শহীদ সাহেবেকে মন্ত্রিসভা গঠনের অনুরোধ করিবেন এবং শহীদ সাহেবকে কমিশন করিবার জন্য বড়লাটকে সুপারিশ তিনিই করিবেন। পার্লামেন্টারি পদ্ধতি অনুসারে বড়লাটের উপর মেজরিটি পার্টির লিডারের সে সুপারিশ বাধ্যকর হইবে।
