২. বিশ্বাস ভংগ
পরদিন ৭ই আগস্ট। বিকালেই মুসলিম লীগ পার্টির লিডার নির্বাচন। অসহ্য আগ্রহাতিশয্যে ঘরে বসিয়া থাকিতে পারিলাম না। ন্যাশনাল এসেমরি বিডিং–এ গিয়া লাইব্রেরির বই-পুস্তক ঘাটিয়া সময় কাটাইতে লাগিলাম। বস্তুতঃ ন্যাশনাল এসেরির লাইব্রেরিটি দেখিয়া আমি প্রথম দিনেই এত মুগ্ধ হইয়াছিলাম যে পরবর্তীকালে করাচি থাকাকালে অধিকাংশ সময় আমি এই লাইব্রেরিতে কাটাইতাম। যা হউক, লাইব্রেরিতে বসিয়া খবর পাইলাম, মুসলিম লীগ পার্টির সভা হইয়া গিয়াছে। চৌধুরী মোহাম্মদ আলী লিডার নির্বাচিত হইয়াছেন। এর অর্থ শহীদ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হইয়া গিয়াছেন। কাজেই আমার আনন্দ আর ধরে না। শহীদ সাহেবকে এই শুভ সংবাদ দিবার জন্য ছুটিয়া লাইব্রেরি হইতে বাহির হইলাম। শহীদ সাহেব তখনও আইনমন্ত্রী। তাঁর বসিবার ঘর আমার জানা। ওটা এসেমরি বিডিং-এর দক্ষিণ অংশে। লাইব্রেরিটা বিডিং-এর উত্তর-পূর্ব অংশে। কাজেই বিডিং-এর পূর্ব দিককার দীর্ঘ বারান্দার সবটুকু মাড়াইয়া আমাকে শহীদ সাহেবের কামরায় যাইতে হইবে। সিঁড়িঘর পার হইয়া খানিকদূর আসিতেই খোদ চৌধুরী মোহাম্মদ আলী সাহেবের সাথে দেখা। হাসিমুখে সালামালেকুম দিয়াই বলিলাম কংগ্রেচুলেশন্স। চৌধুরী সাহেবও হাসিমুখে বলিলেন : ‘ওয়ালেকুম সালাম : মেনি থ্যাংকস’ বলিয়া অতিরিক্ত নুইয়া সালামের জবাব দিলেন ও মুসাফেহা করিলেন। আর কোনও কথা না বলিয়া ব্যস্ততার সংগে সামনের দিকে অগ্রসর হইলেন। আমিও শহীদ সাহেবের তালাশে আগ বাড়িলাম। দেখিলাম, তিনি অপর দিক হইতে আসিতেছেন। মুখ- হাসি লইয়া দূর হইতেই দরা গলায় বলিলাম শুনছেন ত? চৌধুরী মোহাম্মদ আলী লিডার ইলেকটেড হৈয়া গেছেন।
শহীদ সাহেব কোনও ভাবান্তর না দেখাইয়া সহজভাবে বলিলেন : হ্যাঁ শুনেছি।
গতি না থামাইয়া আমার হাত ধরিয়া চলিতে লাগিলেন।
আমি বলিলাম : এইমাত্র চৌধুরী সাহেবের সাথে আমার দেখা হইছে।
শহীদ সাহেব বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন : এরই মধ্যে বেশ তারপর?
আমি : তারপর আমি তাঁকে কংগ্রেচুলেট করলাম।
শহীদ সাহেব : বেশ করেছ। কিন্তু তিনিও কি তোমাকে কংগ্রেচুলেট করলেন?
‘একথার অর্থ কি? তিনি আমাকে কংগ্রেচুলেট করবেন কেন?’–আমি বলিলাম।
শহীদ সাহেব গম্ভীর হইয়া উঠিলেন। বলিলেন : তবে তিনি তোমাকে। কংগ্রেচুলেট করেন নাই। অশুভ লক্ষণ।
আমি : এতে আপনি অশুভ কি দেখলেন?
শহীদ সাহেব : বোকারাম। কিছুই বুঝতেছ না? তাঁর ওয়াদা রক্ষার ইচ্ছা থাকলে তিনি তোমাকেই কংগ্রেচুলেট করতেন।
এতক্ষণে শহীদ সাহেবের কথার তাৎপর্য বুঝিলাম। কিন্তু তাঁর এই সন্দেহকে আমি অমূলক বলিয়া উড়াইয়া দিলাম।
বাসায় ফিরিলাম।
গরমের দিন। লম্বা বিকাল। তবু বিকালের চা খাইতে প্রায় সন্ধ্যা হয়-হয়। এমন সময় খবর পাইলাম: বগুড়া প্রধান মন্ত্রিত্বে পদত্যাগ করিয়াছেন। নয়া মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য শহীদ সাহেব কমিশন পাইয়াছেন। লন্ডনের বি.বি.সি, হইতে এই ঘোষণা করা হইয়াছে। পাকিস্তান রেডিও হইতে না হইয়া বি.বি.সি. হইতে ঘোষণা? হইতে পারে। আমরা এখনও বৃটিশ ডমিনিয়ন ত।
চৌধুরী মোহাম্মদ আলী তবে নিজের ওয়াদা রক্ষা করিয়াছেন। শুকর আলহামদুলিল্লাহ। ধন্যবাদ চৌধুরী সাহেবকে। এমন ধার্মিক সত্যবাদী লোকটির প্রতি কি অন্যায় সন্দেহই না করিতেছিলাম। আমরা সবাই ছুটিলাম ক্লিফটনে শহীদ সাহেবের বাড়িতে। গিয়া দেখি এলাহি কারবার। কি ভিড়। সিঁড়িতে পর্যন্ত লোক ভর্তি। হইবেনা ভিড়। প্রধানমন্ত্রীর বাড়িত।
অতি কষ্টে ভিড় ঠেলিয়া উপরে উঠিলাম। ভিতরে গেলাম। কামরা ভর্তি লোক। সাহেবের সাথে দেখা হইল। দেখা হইল মানে আমরা তাঁকে দেখিলাম। তিনি আমাদেরে দেখিলেন কিনা সেটা জানিবার উপায় নাই। কিন্তু আমরা ধরিয়া নিলাম তিনি আমাদিগকে দেখিয়াছেন। লিডারের বেলা অধিকাংশ সময়ই অমন ধরিয়াই নিতে হইত। তাই আমরা গুজবের কথা বলিলাম। কমিশন আসিয়াছে কিনা জিগ্গাস করিলাম। উপস্থিত সকলেই প্রায় সমস্বরেই বলিলেন : ওটা গুজব নয়, সত্য। অনেকেই নিজ কানেবি.বি.সি, শুনিয়াছেন বলিলেন। কমিশন আসিল বলিয়া। সব ঠিক আছে। স্বয়ং বড়লাটের বাড়ির খবর। টাইপ-টুইপ হইতে একটু সময় কি আর লাগে না? শহীদ সাহেব মৃদু হাসিয়া বুঝাইলেন বক্তাদের কথা সত্য। কম্পিত বুকে অপেক্ষা করিতে লাগিলাম।অনেকে আসিলেন। তার মধ্যে অফিসার চেহারার লোকও ছিলেন অনেক। তাঁরা সবাই আসিলেন শহীদ সাহেবকে কংগ্রেচুলেট করিতে। বড়লাটের কমিশন লইয়া কেউ আসিলেন না। ইতিমধ্যে ঘন-ঘন যরূরী টেলিফোন আসিতে লাগিল। টেলিফোন হাতে নিয়াই কয়েকবারই শহীদ সাহেব আমাদের সবাইকে বাহিরে যাইতে বলিলেন। গোপনীয় কথা। হইবে না গোপনীয়? সম্ভবত বড়লাটের সাথেই প্রধানমন্ত্রীর কথা! প্রতিবারই বেশ অনেক্ষণ কথা বলার পর আমাদের ভিতরে ডাকিলেন। ইতিমধ্যে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীও তাঁর সংগে দেখা করিয়া গেলেন। কিন্তু উভয়ের মধ্যে কি কথা হইল আমরা জানিলাম না। সন্ধ্যার পর শহীদ সাহেব, আতাউর রহমান, মুজিবুর রহমান ও আমি এই তিনজনকে তাঁর গাড়িতে লইয়া বাহির হইলেন। সোজা গিয়া হাযির হইলেন অস্থায়ী বড়লাট ইস্কান্দর মির্যার বাড়িতে।
