রুটিন কাজ শেষ করিয়া গণ-পরিষদ ১২ই জুলাই মূলতুবি হইয়া গেল। ৮ই আগস্ট করাচিতে পরবর্তী অধিবেশন হওয়া স্থির হইল। আমরা কতিপয় বন্ধু মারি হইতে আযাদ কাশির সরকারের রাজধানী মোযাফফরাবাদ গেলাম। যুদ্ধ-বিরতি সীমারেখা পর্যন্ত ভ্রমণ করিলাম। পাকিস্তান সরকারের কাশির দফতরের সেক্রেটারি মিঃ আযফার সি, এস, পি, ও আযাদ কাশ্মির সরকারের চিফ সেক্রেটারি মিঃ আযিযুল্লা হাসান সি. এস. পি. আমাদের সংগে-সংগে থাকিয়া সকল প্রকার সুখ সুবিধার ব্যবস্থা করিলেন। আযাদ কাশ্মির হইতে ফিরিবার পথে আমি ও বন্ধুবর আতাউর রহমান এবোটাবাদে কাশ্মিরী নেতা জনাব চৌধুরী গোলাম আবাসের সংগে সাক্ষাৎ ও অনেকক্ষণ আলাপ-আলোচনা করিলাম। তথা হইতে রাওলপিণ্ডি ও লাহোর ঘুরিয়া আমরা ১৭ জুলাই তারিখে ঢাকা ফিরিয়া আসিলাম।
২১. আত্মঘাতী ওয়াদা খেলাফ
আত্মঘাতী ওয়াদা খেলাফ
একইশা অধ্যায়
১. আওয়ামী লীগের বিপর্যয়
৫ই আগস্ট তারিখে পূর্ব-বাংলা আইন পরিষদের স্পিকার-ডিপুটি স্পিকার নির্বাচন হইবে, এটা আগেই ঘোষণা করা হইয়াছিল। আমি আগের দিন ৪ঠা আগস্ট তারিখে ঢাকা পৌঁছিলাম। ঐদিনই খবরের কাগযে পড়িলাম, সুহরাওয়ার্দী সাহেব ১০ই আগস্ট তারিখে করাচিতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বিশেষ বৈঠক আহ্বান করিয়াছেন। সুহরাওয়ার্দী সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্ব সম্বন্ধে অধিকতর নিঃসন্দেহ হইলাম। ধরিয়া লইলাম প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন লাভের জন্যই এই সভা ডাল।
স্পিকার-ডিপুটি-স্পিকার নির্বাচনে আমরা হারিয়া গেলাম। সরকার পক্ষ পাইলেন ১৭০-১৭৭ ভোট, আর আওয়ামী লীগ পাইল ১২-৯৯ ভোট। আমি এতে নিরাশ হইলাম না। কারণ মন্ত্রিত্ব লাভে অসমর্থ হওয়ার পর আইন-পরিষদে মেজরিটি করার আশা সহজ ব্যাপার নয়। শুধুমাত্র মুসলিম-ভোটে গণ-পরিষদের নির্বাচনেই দেখা গিয়াছিল মুসলিম মেম্বারদের মধ্যেও আওয়ামী লীগ মেজরিটি নয়। তার উপর স্পিকার-ডিপুটি স্পিকার নির্বাচনে হিন্দু মেম্বাররা হক সাহেবের দলের পক্ষে ভোট দিবেন, এটা জানাই ছিল। এর একাধিক কারণও ছিল। আমাদের দেশে পার্টি-আনুগত্য এখনও দানা বাঁধে নাই। তাছাড়া সরকারী দলে থাকিলে নিজ-নিজ নির্বাচনী এলাকার জন্য বেশি কাজ করা যায়, এটাও বাস্তব সত্য। কাজেই প্রাদেশিক আইন-পরিষদের এই পরাজয় মানিয়াই লইয়াছিলাম। কিন্তু প্রাদেশিক পরিষদের এই পরাজয় কেন্দ্রেও (গণ-পরিষদে) আমাদের পরাজয়ের পূর্বাভাস না হয়, এই প্রার্থনা করিতে-করিতে আমরা দিনই কাটি রওয়ানা হইলাম। কিন্তু কাটি রওয়ানার আগেই আর একটি খবর পাইলাম। সেটি এই যে অসুস্থতা-হেতু বড়লাট গোলাম মোহাম্মদ দুটি নিয়াছেন; তাঁর জায়গায় ইস্কান্দর মির্যা অস্থায়ী বড়লাট হইয়াছে। সংবাদটিকে আমি শুভ মনে করিলাম না। কারণ আমাদের নেতা সুহরাওয়ার্দীর সাথে যা-কিছু ওয়ালী সওগল ও কিরা-কুরুক করিয়াছেন সবই গোলাম মোহাম্মদ সাহেব; মির্যা সাহেব তেমন কোনও ওয়াদায় বাধ্য নন। নিজের ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি হইতে গলা ফসকাইবার মতলবেই গোলাম মোহাম্মদ অসুস্থতার অজুহাতে সাময়িকভাবে গা-ঢাকা দিলেন কি না, তাই বা কে জানে?
করাচি গিয়াই পড়িলাম একদম তোপের মুখে। গিয়া দেখিলাম মুসলিম লীগ পার্টির লিডার নির্বাচনে বিষম প্রতিযোগিতা ও তদুপযোগী প্রচারণা চলিতেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বগুড়ার মোহাম্মদ আলী ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর মধ্যে। বগুড়া যদি লিডার নির্বাচিত হন, তবে মেজরিটি পার্টি-লিডার হিসাবে তিনিই প্রধানমন্ত্রী থাকিয়া যান। কারণ তিনি বাংগালী। পক্ষান্তরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলী যদি লিডার নির্বাচিত হন, তবে যেহেতু তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী, সেই হেতু তিনি প্রধানমন্ত্রী হইবেন না, তিনি সুহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী করিবার সুপারিশ করিবেন। এ অবস্থায় বগুড়ার বদলে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর লিডার নির্বাচিত হওয়াই আমাদের স্বার্থের অনুকূল। কাজেই আমরা অর্থাৎ জনাব আতাউর রহমান, মুজিবুর রহমান ও আমি চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর পক্ষে ক্যানভাসে লাগিয়া গেলাম। আসলে ক্যানভাস করিবার কিছুই আমাদের ছিল না। পূর্ব-পাকিস্তানের কোনও মেম্বরই মুসলিম লীগে ছিলেন না। মুসলিম লীগ পার্টির সব কয়জন মেম্বরই পশ্চিম পাকিস্তানী। তাঁদের কারও উপর আমাদের কোনও প্রভাব ছিল না। কাজেই আমাদের ক্যানভাসের কানাকড়ি মূল্য ছিল না। সেকথা আমরা সরলভাবে স্বীকার করিলাম চৌধুরী মোহাম্মদ আলীসহ মুসলিম লীগ বন্ধুদের কাছে। তবু তাঁরা আমাদেরে রেহাই দিলেন না। যুক্তি দিলেন যে পশ্চিম পাকিস্তানী মুসলিম লীগারদের উপর আমাদের কোনও প্রভাব না থাকিলেও পশ্চিম পাকিস্তানী আওয়ামী নেতাদের ত আছে। তাঁদের মারফতেই আমাদের কাজ করা উচিত। কতকটা এই যুক্তিতে এবং কতকটা চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে খুশী রাখিবার জন্য আমরা ক্যানভাসে নামিয়া পড়িলাম। কে, এস. পি. নেতাদের কেউ কেউ আমাদের এই অবাংগালী-প্রীতির কঠোর নিন্দা করিলেন। বাংগালী বগুড়ার নেতৃত্ব ও প্রধানমন্ত্রিত্ব খসাইবার মত অশুভ ও অন্যায় কাজ করিয়া পূর্ব-বাংলার স্বার্থবিরোধী কাজ করিতেছি বলিয়াও শুধু মুসলিম লীগাররা নয়, অনেক কে, এস, পি. নেতাও আমাদের কাজের প্রতিবাদ করিলেন। আমরা তাঁদের বিরূপ সমালোচনা অগ্রাহ্য করিয়া চলিলাম। আমাদের যুক্তি সোজা। মুসলিম লীগ পার্টির নেতা বাংগালী বগুড়া হইলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হইবেন। আর অবাংগালী চৌধুরী মোহাম্মদ আলী হইলে চুক্তি ও প্রথামত শহীদ সাহেব প্রধানমন্ত্রী হইবেন।
