বস্তুতঃ পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের ছিল এটা নয়া এপ্রোচ। শহীদ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পার্টি নীতি-হিসাবেই এটা গ্রহণ করিয়াছিল। ফলে গণ পরিষদের প্রথম বৈঠকেই এই নয়া-নীতি ঘোষণা করা হয়। শহীদ সাহেব তখন মন্ত্রিসভার মেম্বর ছিলেন বলিয়া নিজের মুখে এই নীতি ঘোষণা না করিয়া আমার মুখ দিয়া কওয়াইয়াছিলেন। আমার বক্তৃতায় আমি বলিয়াছিলাম পূর্ব-বাংলায় মুসলিম লীগ নেতৃত্ব মনে করিতেন পশ্চিম পাকিস্তান চারটি প্রদেশে বিভক্ত থাকাই পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের অনুকূল। তাঁরা বিশ্বাস করিতেন, এই বিভেদের সুযোগ লইয়া পূর্ব পাকিস্তানীরা করাচি বসিয়াই গোটা পাকিস্তান শাসন করিবে। ঢাকায় স্বায়ত্তশাসন নিবার দরকার নাই। আমরা আওয়ামী লীগাররা এই নীতিতে বিশ্বাসী নই। আমরা চাই পশ্চিম পাকিস্তানের সবগুলি প্রদেশ ঐক্যবদ্ধ হইয়া পূর্ব-বাংলার সমান স্বায়ত্ত শাসিত হউক। সমান ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী স্বায়ত্তশাসিত দুইটি অঞ্চলের বুঝা-পড়া ও আদান-প্রদানের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী পাকিস্তান গড়িয়া উঠুক, এটাই আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শ। সমবেত পশ্চিম পাকিস্তানী মেম্বাররা তুমূল হর্ষ ধ্বনি ও করতালিতে এই নীতিকে অভিনন্দিত করিয়াছিলেন। কিন্তু পরে আদান প্রদানের বেলা তাঁরাই ‘বাংগালকে হাইকোট’ দেখাইয়াছিলেন।
৬. কৃষক-শ্রমিক পার্টির দলীয় সংকীর্ণতা
কিন্তু শহীদ সাহেকে প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবিটা পূর্ব-পাকিস্তানের সকলের দাবি ছিল না। বরঞ্চ যুক্তফ্রন্টের অন্যতম প্রধান অংশ কৃষক-শ্রমিক পার্টি ও তার নেতা হক সাহেব শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্বের বিরোধীই ছিলেন। এর কোনও নীতিগত কারণ ছিল না। ব্যক্তিগতই ছিল বেশি। মাত্র পাঁচ-ছয় মাস আগে ১৯৫৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ পার্টি যুক্তফ্রন্ট নেতা হক সাহেবের বিরুদ্ধে যখন অনাস্থা-প্রস্তাব দেয় এবং যার ফলে যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া যায়, সেই সময় আমি উভয় দলের কাছে একটি আপোস প্রস্তাব দিয়াছিলাম। সেটি ছিল এই : যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক নেতা হক সাহেব এবং কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ সাহেব, এটা যুক্তফ্রন্ট পার্টি ফর্মাল প্রস্তাবাকারে মানিয়া নিতে হইবে। কৃষক-শ্রমিক পার্টির অনেকে এবং আওয়ামী লীগ পার্টির কেহ কেহ এই ফর্মুলা মানিয়া লইতে রাযী ছিলেন। কিন্তু শহীদ সাহেব স্বয়ং এই অপোসে ব্যক্তিগতভাবে সক্রিয় সাপোর্ট না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই ফর্মুলা গৃহীত হয় নাই। ফলে যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া যায়। হক সাহেবের দল প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সাথে মিশিয়া তয়-তদবির করিয়া পূর্ববাংলার মন্ত্রিত্ব দখল করেন।
এই পরিবেশে কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য শহীদ সাহেবকে কৃষক-শ্রমিক পার্টি সমর্থন করিবে, এটা আশা করা বাতুলতা। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীও এটা জানিতেন। তবু মোহাম্মদ আলীর, সম্ভবত, আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা আমাদের সাথে এই অলিখিত চুক্তি করিয়াছিলেন এবং আমরা তাঁদের ওয়াদায় বিশ্বাস করিয়াছিলাম। পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার সাহেব গণ-পরিষদের মেম্বর না হইয়াও মারিতে হাযির হইলেন এবং মোহাম্মদ আলীর প্রধানমন্ত্রিত্ব বহাল রাখিবার চেষ্টা-তদবির করিলেন। আবু হোসেন সরকার আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রাজনৈতিক বর্তমান মতভেদ আমাদের সে বন্ধুত্ব নষ্ট করিতে পারে নাই। তাঁর সাথে দেখা করিলাম। অনেক তর্ক-বিতর্ক করিলাম। বোঝা গেল, তিনি হক সাহেবের নির্দেশেই মোহাম্মদ আলীর সমর্থন তথা শহীদ সাহেবের বিরোধিতা করিতেছেন। পূর্ব-বাংলার গণপ্রতিনিধি ঐতিহাসিক নির্বাচন বিজয়ী যুক্তফ্রন্টের দুই অংশ আজ ক্ষমতা দখলের আশায় পরাজিত কেন্দ্রীয় সরকারেই দুইটি মুরুব্বি ধরিয়াছি : তাঁরা ধরিয়াছেন মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলীকে; আমরা ধরিয়াছি সরকারী কর্মচারি বড়লাট গোলাম মোহাম্মদকে। অদৃষ্টের কি পরিহাস। উভয় বন্ধুই দুঃখের হাসি হাসিলাম। কিন্তু তখন বুঝি নাই, পরে বুঝিয়াছিলাম, বন্ধুবর ঐ দুঃখের হাসির নিচে একটি মিচকি হাসি হাসিয়াছিলেন। তার কারণ ছিল। প্রাদেশিক মন্ত্রিত্ব দখলের বেলা আমাদের মুরুব্বি ফাঁকি দিয়াছিলেন। তাঁদের মুরুব্বির কথা ঠিক রাখিয়াছিলেন। কেন্দ্রের প্রধান মন্ত্রিত্বের বেলাও আমাদের মুরুব্বি আবার ফাঁকি দিতে পারেন, বন্ধুবরের মিচকি হাসির ভাই ছিল তাৎপর্য।
আমার নিজের এবং আমাদের দলের আরও দুই-একজনেয় সে আশংকা ছিল। কিন্তু শহীদ সাহেব আমাদের সন্দেহকে তুড়ি মারিয়া উড়াইয়া দিতেন। প্রচলিত কনভেনশন অনুসারে এবার প্রধানমন্ত্রীকে পূর্ব-পাকিস্তানী হইতেই হইবে। কারণ বড়লাট গোলাম মোহাম্মদ পশ্চিম পাকিস্তানী। সে হিসাবে ভূতপূর্ব যুক্তফ্রন্ট অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বা কে. এস. পি-র একজনকে প্রধানমন্ত্রী করিতেই হবে। পূর্ব সমঝোতা মতে এবং হক সাহেব প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রাথ না থাকায় সকলেই ধরিয়া লইলেন শহীদ সাহেবই একমাত্র প্রার্থী এবং যোগ্যতায় তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ অবস্থায় কে, এস, পি-র কেউ-কেউ বিশেষতঃ বন্ধুবর আবু হোসেন তলে-তলে বগুড়ার প্রধানমন্ত্রিত্ব বহাল রাখিবার চেষ্টা করিতেছেন, এ গুজবে আমাদের অনেকেই বিশেষ আমল দিলেন না। কারণ কৃষক-শ্রমিক সদস্যরা মুসলিম লীগারকে প্রধানমন্ত্রী করিবেন, এটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু পর-পর দুইটা আকস্মিক ঘটনায় বা ঘোষণায় আমরা আওয়ামীরা নিরাশ হইলাম; কোনও কোনও কে. এস. পি. নেতা দাঁত বাহির করিলেন; মুসলিম লীগ-নেতারা আস্তিনের নিচে মুচকি হাসিলেন। ঘটনা বা ঘোষণা দুইটি এই : জনাব গুরমানী আমাদের জানাইলেন, ঘোরতর অসুস্থতা হেতু গবর্নর জেনারেল করাচি হইতে নড়িতে পারেন না। কাজেই তাঁর মারি আসা ও মন্ত্রিসভার পুনর্গঠন উভয়টাই স্থগিত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দর মির্যা আমাদেরে একটা টেলিগ্রাম দেখাইয়া বলিলেন, আফগানিস্তান আমাদের সীমান্তে বিপুল সৈন্যবাহিনী সমাবেশ করিয়াছে। সম্ভবতঃ আমাদের সীমান্তে প্রবেশ করিয়াছে। কাজেই এটা মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের জন্য মোনাসের সময় নয়।
