কিন্তু মারিতে গবর্নরের ডিনার টেবিলে বসিয়াই আমরা বুঝিলাম, এই সংখ্যা সাম্যের দাবি পশ্চিম পাকিস্তানীদের স্থায়ী দাবি। পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা পাকে প্রকারে মোলায়েম ভাষায় আমাদেরে বুঝাইয়া দিলেন, কেন্দ্রীয় আইন-পরিষদে বরাবরের জন্য এই সংখ্যা-সাম্যের ব্যবস্থা না হইলে পশ্চিম পাকিস্তানবাসী কোনও শাসনত্ম গ্রহণ করিবে না। এক ইউনিট ব্যাপারেও তাঁরা এই অ্যাটিচুড গ্রহণ করিলেন। কথাবার্তায় আমাদের সমঝাইয়া দিলেন, ওটা পশ্চিম পাকিস্তানীদের নিজস্ব ঘরোয়া ব্যাপার। আমরা পূর্ব-পাকিস্তানীদের ও-ব্যাপারে কথা না বলাই ভাল। আমরা অবশেষে নিম্নলিখিত শর্তে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের এই দুইটি দাবি মানিয়া লইতে রাযী হইলাম। (১) শুধু প্রতিনিধিত্বে নয়, চাকরি-বাকরি, শিল্প-বাণিজ্য, অর্থ বন্টন সেনাবাহিনী ইত্যাদি সব-তাতেই সংখ্যা-সাম্য হইবে; (২) পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্ত শাসন দিতে হইবে; (৩) যুক্ত-নির্বাচন প্রথা প্রবর্তন করিতে হইবে; (৪) বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিতে হইবে।
৪. মারি-চুক্তি
আলোচনা দুই দিন ব্যাপী চার-পাঁচটি বৈঠকে সমাপ্ত হইল। নব গঠিত পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশের গবর্নর ও গণ-পরিষদের অস্থায়ী চেয়ারম্যান জনাব গুরমানীর চেম্বারেই এই আলোচনা সভার বৈঠক চলিতে থাকিল। প্রতিদিন দুই-এক-ঘন্টা করিয়া গণ-পরিষদের বৈঠক চলিত। বৈঠক শেষে নেতারা চেয়ারম্যানের চেম্বারে সমবেত হইতেন। অনেকক্ষণ ধরিয়াই এই আলোচনা চলিত। নবাব গুরমানী সাহেব ঠাণ্ডা মেজ ও মিঠা যবানের রাশভারী, ভদ্র ও পণ্ডিত লোক বুদ্ধি তাঁর চানক্যের মত তীক্ষ্ণ। তাঁর তর্কের ধারা ও আলোচনার এপ্রোচ হৃদয়গ্রাহী। প্রধানতঃ তাঁরই মধ্যস্থতায় অবশেষে পাঁচ দফার একটি চুক্তিপত্রের মুসাবিদা চূড়ান্ত হইল। এই পাঁচটি দফা এই
(১) পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট
(২) পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন
(৩) সকল ব্যাপারে দুই অঞ্চলের মধ্যে সংখ্যা-সাম্য
(৪) যুক্তনির্বাচন
(৫) বাংলা-উর্দু রাষ্ট্রভাষা।
প্রথমে স্থির হইয়াছিল প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ও নবাব গুরমানী মুসলিম লীগের, প্রকারান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের, পক্ষ হইতে এবং জনাব হক সাহেব ও জনাব সুহরাওয়ার্দী সাহেব অবিভক্ত যুক্তফ্রন্টের, প্রকারান্তরে পূর্ব পাকিস্তানের, পক্ষ হইতে উক্ত চুক্তিনামার স্বাক্ষর করিবেন। উক্ত নেতাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী, নবাব গুরমানী ও জনাব শহীদ সুহরাওয়ার্দীর দস্তখত হওয়ার পর নবাব গুরমানী আমাদের জানান যে হক সাহেব দস্তখত করিতে অস্বীকার করিয়াছেন। আমরা বিস্মিত দুঃখিত ও চিন্তাযুক্ত হইলাম। আঞ্চলিক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ও যুক্ত নির্বাচনের ভিত্তিতে পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে এই আপোস হওয়ায় সকলেই খুশী হইয়াছিলেন। সারা দেশে একটা নূতন উৎসাহ-উদ্দীপনার স্পন্দন ও আশার আলো দেখা দিয়াছিল। হক সাহেবের মত প্রবীণ ও দূরদর্শী নেতা এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করিলেন না কেন তা আমরা প্রথমে বুঝিতে পারি নাই। গুরমানী সাহেব তাঁর স্বাভাবিক রসিকতাপূর্ণ ভাষায় আমাদেরে হক সাহেবের আপত্তির কারণ বুঝাইয়া দিলেন। সে কারণ এই যে হক সাহেব শহীদ সাহেবকে পূর্ববাংলার প্রতিনিধি মনে করেন না। কাজেই তাঁর সাথে তিনি পূর্ব-বাংলার পক্ষে দস্তখত করিতে রাযী নন। পূর্ব-বাংলার প্রতিনিধিরূপে জনাব আতাউর রহমান ও আবুল মনসুর দস্তখত দিলে হক সাহেব দস্তখত দিতে রাযী আছেন। হক সাহেব শহীদ সাহেবকে অপদস্থ করিবার মতলবেই এ কথা বলিয়াছেন এতে আমাদের কোনও সন্দেহ রহিল না। ফলে আতাউর রহমান ও আমি দস্তখত দিতে অস্বীকার করিলাম এবং হক সাহেব ও শহীদ সাহেবের দস্তখতেই চুক্তিপত্র সম্পাদনের জন্য যিদ করিলাম। কিন্তু শহীদ সাহেব আমাদের এই মনোভাবের প্রতিবাদ করিলেন এবং দস্তখত দিতে আমাদেরে রাযী করিলেন। কাজেই দুই অঞ্চলের পক্ষ হইতে দুইজন করিয়া চারজনের বদলে চারজন করিয়া আট জনের দস্তখতের ব্যবস্থা হইল। পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষ হইতে আতাউর রহমান ও আমার দস্তখত হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ও ডাঃ খান সাহেবের দস্তখত লওয়া হইল। ৮ই জুলাই তারিখে নবাব গুরমাণী সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে এক সুসংবাদ রূপে এই চুক্তিনামার কথা ঘোষণা করিলেন। এই বিবৃতিতে তিনি বলিলেন যে উভয় অঞ্চলের সন্তোষজনক রূপে এই চুক্তিনামা সম্পাদিত হইয়াছে।
৫. প্রধানমন্ত্রিত্বের সমঝোতা
এই চুক্তি সম্পাদন দেশের সর্বত্র একটা নূতন আশার সঞ্চার করিল বলিয়া আমি অনুভব করিলাম। যাঁদের সাথেই আমার আলাপ হইল তাঁদের সকলেই ঐ মতের বলিয়া মনে হইল। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিশ্বাস হইল যে বাস্তবিকপক্ষে এই দিন হইতেই পাকিস্তানের ভিত্তি স্থাপিত হইল। এই বিশ্বাসের আরেকটি কারণ ছিল এই যে, পাঁচ দফার বাস্তবায়নের একটা গ্যারান্টিও আমরা পাইয়াছিলাম। সে গ্যারান্টি ছিল এই যে পাঁচ দফার অতিরিক্ত একটি অলিখিত শর্ত ছিল শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্ব। শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত কোনও ব্যক্তিগত দাবি ছিল না। পাঁচ দফার রূপায়ণের জন্যই ছিল উহা অপরিহার্য। ঐ পাঁচ দফা ছিল পাকিস্তানী জাতীয়তার বুনিয়াদী মসলা। একটু গভীরভাবে চিন্তা করিলেই বোঝা যাইবে যে ঐ পাঁচটি দফাই পরস্পরের সহিত অংগাংগিভাবে জড়িত। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা দুই অঞ্চলের মধ্যে প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি দাবি করিলেন পূর্ব-পাকিস্তান সংখ্যা গুরুত্ত্বকে তাঁরা তয় করেন বলিয়া। পশ্চিম পাকিস্তানী ভাইদের মন হইতে ভয় দূর করিবার উদ্দেশ্যে যদি প্যারিটি মানিতে হয়, তবে পূর্ব পাকিস্তানীরা পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে মাইনরিটি না হইয়া যায় সে ভয়টা দূর করিবার ব্যবস্থা হওয়া দরকার। বস্তুতঃ পৃথক নির্বাচনে হিন্দুদের আসন (পূর্ব-পাকিস্তানের কোটার এক-চতুর্থাংশ) পূর্ব-পাকিস্তানের কোটা হইতেই যাইবে। পৃথক-নির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের কাছে হিন্দু প্রতিনিধিদের কোনও দায়িত্ব থাকিবে লো। তারা পৃথক দল করিবে। সে অবস্থায় মুসলিম লীগ যদি আবার দেশ শাসনের ভার পায়, তবে সে পার্টিতে পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম মেম্বারদের মোকাবিলায় পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম মেম্বররা সংখ্যালঘু হইয়া পড়িবেন। সুতরাং পূর্ব পাকিস্তানী প্রতিনিধিরা যাতে সাম্প্রদায়িক দলে বিভক্ত না হইয়া ঐক্যবদ্ধ থাকিতে পারে সেজন্য যুক্ত নির্বাচন অত্যাবশ্যক। দুইটি অঞ্চলের মধ্যে সাধারণ গণতন্ত্রের ব্যতিক্রমে যদি প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য আনিতে হয়, তবে সেটা করা যুক্তিসঙ্গত হইবে কেবলমাত্র দুইটি অঞ্চলকে লাহোর-প্রস্তাব ভিত্তিক দুইটি ‘অটমাস ও সরেন স্বন্ত্র রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা কল্পনা করিয়া। সেই অবস্থায় পাকিস্তান হইবে সত্যিকার ফেডারেল রাষ্ট্র। তা যদি হয় তবে ফেডারেশনের সকল ক্ষেত্রে : চাকরি-বাকরিতে, শিল্প-বাণিজে, কেন্দ্রীয় ও বিদেশী সাহায্য বন্টনে, এবং দুই অঞ্চলে ভৌগোলিক দূরত্ব বিবেচনা করিয়া সৈন্যবাহিনীতেও, ভারসাম্য আনিতে হইবে। পূর্ব-পাকিস্তানীরা যাতে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে ভেদ-নীতি চালানোর সুযোগ না পায় সে জন্য ঐ সব প্রদেশ ভাংগিয়া পশ্চিম পাকিস্তানকে পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায় এক প্রদেশ করিতে হইবে। এটা যদি উচিৎ বিবেচিত হয়, তবে পশ্চিম পাকিস্তানীরা যাতে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে ভেদ-নীতি চালানোর সুযোগ না পায় যুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে সেটাও সুনিশ্চিত করিতে হইবে। তাছাড়া আরেক কারণে পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা হইতে হইবে। পূর্ব-পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্ত শাসনের দাবি-মোতাবেক রেলওয়ে, ডাক ও তার, টেলিফোন, ব্রডকাস্টিং, সেচ এবং গ্যাস ও পানি বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রভৃতি বড় বড় বিষয় আঞ্চলিক সরকারের হাতে দিতে হইবে। সে কারণেও পশ্চিম পাকিস্তানকে একটিমাত্র প্রদেশে রূপান্তরিত করা দরকার। বস্তুতঃ প্রধানতঃ এই যুক্তিতেই পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতারা পূর্ব-পাকিস্তানী নেতাদেরে এক ইউনিটের নীতি গ্রহণ করাইতে পারিয়াছিলেন। বাংলা ও উর্দুকে দুইটি সমমর্যাদায় রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা নিজেরা প্যারিটি দাবি করার পরে আর ঠেকাইয়া রাখিতে পারিলেন না।
