প্রথম পরিচয়ের বিশ্রম্ভালাপের মধ্যে আমি নাহক সিরিয়াস আলোচনার আমদানি করিয়াছি। রসালাপ আর জমিবেনা। শহীদ সাহেব এই ধরনের মন্তব্য করিয়া আমার হাত ধরিয়া টানিয়া ভিতরের দিকে নিতে চাইলেন। কিন্তু জেনারেল আইয়ুব আমাকে ছাড়িলেন না। তিনি আমার অপর হাত টানিয়া ধরিয়া বলিলেন : ‘আপনি খুব যরুরী কথাই তুলিয়াছেন। আমি আপনাকে আমার কথার তাৎপর্য না বুঝাইয়া ছাড়িব না।’ তিনি আমাকে টানিয়া নিয়া একটি দেওয়ানে বসাইলেন। নিজেও পাশে বসিলেন। অগত্যা শহীদ সাহেব আতাউর রহমান সাহেবকে লইয়া ভিতরে চলিয়া গেলেন। প্রধান সেনাপতি-দেশরক্ষা মন্ত্রী নিজের ঐ উক্তির সমর্থনে যা-যা বলিলেন তা শুনিয়া আমার চক্ষু চড়কগাছ! আমাদের প্রধান সেনাপতির মুখেও অবিকল কলিকাতার মুসলিম বস্তিওয়ালার কথাই শুনিলাম। তারত যদি পূর্ব-বাংলা আক্রমণ করে, তবে পাকিস্তান বাহিনী দিল্লির লালকেল্লা ও লোকসভার শিখরে পাকিস্তানী পতাকা উড্ডীন করিবে। হিন্দুস্থান অতঃপর পূর্ব-পাকিস্তান ফিরাইয়া দিয়া আপোস করিবে।
খুব গরম তর্ক বাধিয়া গেল। অতিকষ্টে আমি মনের রাগ সামলাইয়া বলিলাম : ‘তবে কি যতদিন পশ্চিম পাকিস্তানী ভাইরা হিন্দুস্থানের রাজধানী দখল করিয়া আমাদিগকে উদ্ধার না করিবেন, ততদিন আমাদিগকে হিন্দুস্থানের মিলিটারি অকুপেশনে থাকিতে হইবে? আমাদের সহায়-সম্পত্তি, ধর্ম-কৃষ্টি ও মা-বোনের ই যৎ-অমতের ততদিন কি হাল হইবে?’
আমাদের প্রধান সেনাপতি-দেশরক্ষা মন্ত্রী নিরুদ্বেগে জবাব দিলেন, সামরিক বিশেষজ্ঞ হিসাবে তিনি সত্য কথাই বলিয়াছেন। সত্য গোপন করিয়া তিনি নিজের কর্তব্যে ক্রটি করিতে পারেন না।
আমি তখন বলিলাম : আপনার কথা সত্য ধরিয়া নিলেও ওটা কেবল সম্ভব হিন্দুস্থান পূর্ব-পাকিস্তান আক্রমণ করিলে। কিন্তু পূর্ব দক্ষিণ বা উত্তর দিক হইতে কেউ পূর্ব-পাকিস্তান আক্রমণ করিলে আপনারা আমাদেরে কিভাবে রক্ষা করিবেন? নিরপেক্ষ হিন্দুস্থান তার উপর দিয়া সৈন্য চালনা করিতে দিবে কেন?
আমাদের প্রধান সেনাপতি এ কথার জবাবে শুধু বলিলেন : হিন্দুস্থান ছাড়া আর কোনও দেশ পূর্ব-পাকিস্তান আক্রমণ করিবে না।
এমন এক-পা-ওয়ালা থিওরির উপর তর্ক চলে না। আমি তখন তকের মোড় ঘুরাইয়া আক্রমণাত্মক তর্ক শুরু করিলাম। তিনি যখন একবার আমাকে বলিলেন, এসব সামরিক ব্যাপার আমার মত উম্মি লোকের (লেম্যানের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, তখন আমি জবাবে বলিলাম। আমি উম্মি বটে, কিন্তু একাধিক সামরিক বিশেষ আমাকে বলিয়াছেন ওয়েস্ট পাকিস্তান ইয ইনডিফেনসিবুল। ডিফেন্স-অব-ওয়েস্ট পাকিস্তান লাইফ ইন ইস্ট পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তান অরক্ষণীয়; পূর্ব-পাকিস্তানে দাঁড়াইয়াই পশ্চিম পাকিস্তান রক্ষা করিতে হইবে।
জেনারেল হাসিয়া আমার কথা উড়াইয়া দিতে গেলেন। কিন্তু আমি তাঁর বাধা ঠেলিয়া আমার কথিত সামরিক বিশেষজ্ঞদের যুক্তিটাও জেনারেলকে শুনাইলাম। আমি বলিলাম : ঐসব সামরিক বিশেষজ্ঞের অভিমত এই ছুরি যেমন সহজে কেক ভেদ করিয়া যায়, হিন্দুস্থানের সাজোয়া ট্যাংক বাহিনী তেমনি সহজে পশ্চিম পাকিস্তান ভেদ করিবে। পক্ষান্তরে নদী-নালা–জংগল-বহুল পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুস্থান বাহিনীকে পূর্ব-পাকিস্তানের গেরিলা বাহিনীর হাতে নাজেহাল হইতে হইবে। অধিকন্তু হিন্দুস্থানের অধিকাংশ সামরিক টার্গেট পূর্ব-পাকিস্তানের বমিং রেঞ্জের মধ্যে হওয়ায় দুর্লংঘ্য পূর্ব-পাকিস্তান ভাসমান এয়ারক্র্যাফট-ক্যারিয়ারের কাজ করিবে।
জেনারেল আমার এই সব যুক্তির কোনও জবাব দিলেন না। শুধু মৃদু হাসিলেন। আমার অজ্ঞতার জন্যই বোধ হয় এই হাসি। কিন্তু আমি শেষে বলিলাম : সত্য কথা যেটাই থোক পাকিস্তানের মেজরিটি বাসিন্দার রক্ষার জন্য অন্ততঃ অর্ধেক সৈন্যবাহিনী ও অর্ধেক অস্ত্র তৈরির কারখানা পূর্ব-পাকিস্তানে মোতায়েন ও কায়েম করা দরকার। এবার জেনারেল হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন : এটা সামরিক ব্যাপারে আপনার অজ্ঞতার আরেকটা প্রমাণ। আমাদের সৈন্যবাহিনী দুইভাগে বিভক্ত হইলে আমাদের যুদ্ধ-ক্ষমতা (স্ট্রাইকিং পাওয়ার) অর্ধেক হইয়া যাইবে।
ভিতর হইতে খানার তাকিদ পুনঃ পুনঃ আসিতে থাকায় আমরা শেষ পর্যন্ত উঠিলাম। কিন্তু পূর্ব-পাকিস্তান রক্ষার জন্য আমাদের দেশরক্ষা কর্তৃপক্ষ এর চেয়ে কোনও ভাল রাস্তার চিন্তা করেন না দেখিয়া আমার মনটা আরও বেশি খারাপ হইয়া গেল।
৩. দুই অঞ্চলের আপোস–চেষ্টা
ডিনার টেবিলে প্রথমে খোশ-আলাপের আকারে এবং ডিনারের পরে গবর্নর শুরমানীর চেম্বারে বসিয়া উভয় পাকিস্তানের সমঝোতার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনার কথা সিরিয়াসলি আলোচিত হইল। এই আলোচনা চলিল ধারাবাহিক দুই-তিন দিন ধরিয়া অনেকগুলি বৈঠকে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা স্পষ্ট ও দৃঢ়তার সাথে আমাদিগকে বুঝাইয়া দিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানের এত্ত্ব ও সংখ্যা-গুরুত্বকে তাঁরা ভয় পান। মেজরিটির জোরে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে প্রাধান্য করিবে। সেজন্য দরকার দুই পাকিস্তানে প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা-সাম্য। শুধু সংখ্যা-সাম্য হইলেও চলিবে না। পূর্ব পাকিস্তান একদম জোট বাঁধা এক-রংগা একটি ভূখণ্ডের একটি প্রদেশ। আর পশ্চিম পাকিস্তান পাঁচ ভাগে বিভক্ত পাঁচ-রংগা পাঁচটি প্রদেশ। পূর্ব পাকিস্তানীরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের এই অনৈক্যের সুযোগ লইয়া তাদের মধ্যে অনবরত ভেদাভেদ সৃষ্টি করিবে এবং ‘ডিভাইড এন্ড রুল’-নীতি অবলম্বন করিয়া সারা পাকিস্তানে সর্দারি করিবে। অতএব, প্রথমতঃ পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যা গুরুত্ব মাইয়া সংখ্যা-সাম্য প্যারিটি আনিতে হইবে; দ্বিতীয়তঃ পশ্চিম পাকিস্তানের সবগুলি প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্য একত্রিত করিয়া একটি মাত্র প্রদেশ করা মানিতে হইবে। এই দুইটা কাজই ইতিপূর্বেই গবর্নর-জেনারেলের অর্ডিন্যান্স বলে সমাধা হইয়াই গিয়াছিল। নয়া গণ-পরিষদে গবর্নর-জেনারেলের আদেশ-বলে ৮০ জন মেম্বর করা হইয়াছিল ৪০ ৪০ করিয়া। পূর্ব-বাংলার কৃষক-শ্রমিক পার্টি বিশেষতঃ তার নেতা হক সাহেব এই ব্যবস্থার প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীও এই প্যারিটি-ব্যবস্থা মানিয়া লইতে অসম্মত হন। এই লইয়া আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি ও আওয়ামী লীগ-ভুক্ত এম. এল. এ-দের যুক্ত সভার ঐতিহাসিক মারি-প্যান্ট একাধিক বৈঠক বসিয়াছিল। খুব জোরদার আলোচনা হইয়াছিল। শহীদ সাহেবের কথায় শেষ পর্যন্ত এটা জানা গিয়াছিল যে পূর্ব-বাংলার প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি-ব্যবস্থা মানিয়া না নিলে নয়া পরিষদ গঠনে গবর্নর-জেনারেল ও পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা রাযী হইবেন না। অগত্যা আওয়ামী লীগ এই প্রতিনিধিত্বের প্যারিটি মানিয়া লইয়াছিল। কিন্তু এটা পরিষ্কার বোঝান হইয়াছিল যে শুধু নয়া গণ-পরিষদের বেলাই এই সংখ্যা-সাম্য মানিয়া লওয়া হইল। এটা অস্থায়ী ব্যবস্থা হইবে। বরাবরের জন্য এটা হইবে না। এসবই নয়া গণ-পরিষদ গঠনের আগের কথা।
