গণ-পরিষদের পয়লা বৈঠক ৭ই জুলাই মারিতে ডাকা হইয়াছিল। ৫ই জুলাই আমরা পূর্ব-বাংলার অনেক মেম্বর ঢাকা বিমান বন্দর হইতে পশ্চিম-মুখী রওয়ানা হইলাম। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক আগে হইতেই লাহোরে ডাকা হইযাছিল। আতাউর রহমান, মুজিবুর রহমান ও আমি সে সভায় যোগ দিবার জন্য একত্রে লাহোর উপস্থিত হইলাম। পশ্চিম পাঞ্জাব আইন-পরিষদের সদস্য ভবন পিপল হাউসে আমাদের থাকার ও ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকের স্থান করা হইয়াছিল। সদস্য ভবনের কমনরুমে ঐ বৈঠক হইল। গণ-পরিষদের মেম্বর ছাড়া আরও অনেক নেতা ঐ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নবাবদা নসরু খাঁ ও মানকি শরিফের পীর সাহেবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভবিষ্যত শাসনতন্ত্রের কাঠাম ও মোহাম্মদ আলী-মন্ত্রিসভায় শহীদ সাহেবের অবস্থিতি এই দুইটাই সভার প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল। এ বিষয়ে কতিপয় প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া প্রথম দিনের বৈঠক সমাপ্ত হইল। মারিতে গণ-পরিষদের বৈঠক শুরু হইবার আগেই গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ-সতার সম্ভাবনার কথা বলিয়া শহীদ সাহেব আমাদের তিনজন ও মানকি শরিফের পীর সাহেবকে লইয়া মোটর যোগে মারি রওয়ানা হইলেন। নবাবদা নসরুল্লার সভাপতিত্বে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক চলিতে থাকিল। অন্যান্য মেম্বারদেরে সভাশেষে ট্রেনে আসিতে উপদেশ দেওয়া হইল। লাহোর হইতে পিণ্ডি ট্রেনের রাস্তা। পিণ্ডি হইতে মারি পর্যন্ত বাস সার্ভিস। সীমান্ত গান্ধী খান আব্দুল গাফফার খাঁর ঐ সময় আলোচনার জন্য মারিতে আসিবার কথা ছিল বলিয়া মানকির পীর সাহেবকে সংগে নেওয়া খুবই আবশ্যক ছিল। দীর্ঘক্ষণের মোটর-পথেও আমরা দেশের এবং সীমান্তের বিভিন্ন সমস্যা ও ভবিষ্যত লইয়া অনেক অনেক শিক্ষাপ্রদ আলোচনা করিলাম। বস্তুতঃ মানকির পীর সাহেবের সহিত ঘনিষ্ঠ হইবার এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় সুযোগ। পীর সাহেব মাত্র ত্রিশ বছরের তরুণ যুবক হইলেও দাড়ি-মোচে আরও বেশি বয়সের মনে হইত। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা পাণ্ডিত্য, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও দূরদর্শিতায় তিনি অনেক প্রৌঢ় বৃদ্ধের চেয়েও জ্ঞানী ছিলেন। তাঁর দেশপ্রেম ও রাজনীতি-জ্ঞান আমাকে অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর অনুরক্ত করিয়া তুলিয়াছিল।
মারিতে পৌঁছিয়া আমরা হোটেল সিসিল ও ব্রাইটল্যাও হোটেলে ছড়াইয়া পড়িলাম। আতাউর রহমান ও আমি হোটেল সিসিলে একতলার একই কামরায় থাকিলাম। মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ মেম্বররা হোটেল সিসিলের দুতলা দখল করিলেন। হক সাহেবের দল ব্রাইটল্যাণ্ড দখল করিলেন। শহীদ সাহেব আমাদের খুব কাছেই মন্ত্রী হিসাবে তিন-চার কামরার একটা সুইট দখল করিলেন। ৭ই জুলাই হইতে ১৪ই জুলাই পর্যন্ত গণ-পরিষদের বৈঠক চলিল। আমরা দিন-দশেক মারিতে ছিলাম। এই দশদিনে আমরা মারির দর্শনীয় সকল স্থান দেখিয়া ফেলিলাম। লোয়ার টুপান্থ ক্যাডেট স্কুলের বাংগালী ছাত্ররা আমাদেরে দাওয়াত করিয়াছিল। সেখানেও গেলাম। মন্ত্রীদের অভ্যর্থনা-অভিনন্দনের সব পার্টিতেও গেলাম। প্রতি সন্ধ্যায় ‘মলে’ বেড়াইতাম। এছাড়া সুযোগ পাইলেই আমি পায়ে হাঁটিয়া বেড়াইতাম। এটা আমার চিরকালের অভ্যাস। পাহাড়ের খাড়া ঢালু জায়গায় রাস্তা হাঁটা সহজ নয়। তবু আমি নিরুৎসাহ হই নাই। কারণ পথ-ঘাটের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাকে খেচিয়া লইয়া যাইত। নয় হাজার ফুট উচা পর্বতের মাথায় এই সুন্দর শহরটি। সবার উপরে পানির বিশাল রিযার্ভয়ার। পার্শ্ববর্তী পর্বত হইতে বড়-বড় পাইপের সাহায্যে এখানে পানি আনা ও পরিশোধিত করিয়া সর্বত্র সরবরাহ করা হয়। আমার কাছে হোটেল সিসিলটাই সবচেয়ে ভাল লাগিয়াছিল। এটি একটি অত্যুচ্চ খাড়া ঠেসের উপর অবস্থিত। রেলিং-ঘেরা বাগ-বাগিচাওয়ালা সুসজ্জিত আংগিনায় বসিয়া আমরা গভীর খাদ দেখিতাম। আমাদের অনেক নিচে দিয়া মেঘ ও বৃষ্টি হইতে থাকিত। মেঘের উপরে বসিয়া উপরে সূর্যকিরণ ও নিচে মেঘের চলাচল ও বৃষ্টিপাত দেখা সে কি অপূর্ব।
যাহোক, গণ-পরিষদ শুরু হইবার আগের দিন আমরা মারি পৌঁছিবার সাথে সাথেই শহীদ সাহেব আমাকে জানাইলেন যে রাত্রে গবর্নমেন্ট হাউসে ডিনারের দাওয়াত আছে। নবাব মুশতাক আহমদ গুরমানী তখন নব-গঠিত পশ্চিম পাকিস্তান প্রদেশের গবর্নর। তাঁরই মারিস্থ বাসভবনে এই দাওয়াত। তিনি গণ-পরিষদের একজন মেম্বর। গবর্নর-জেনারেল কর্তৃক মনোনীত গণ-পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যানও বটে তিনি। সুতরাং এটা শুধু ভদ্রতার ডিনার নয় বুঝিলাম। শহীদ সাহেব ঈশারায় বলিলেনও যে এতে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা হইতে পারে।
২. পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা
যথাসময়ের বেশ খানিক্ষণ আগেই শহীদ সাহেব তাঁর গাড়িতে করিয়া আতাউর রহমান ও আমাকে লইয়া গবর্নমেন্ট হাউসে গেলেন। গবর্নমেন্ট হাউসের লাউঞ্জে সর্বপ্রথমেই কাল মোচওয়ালা ছয় ফুটের বেশি লম্বা বিশাল আকারের এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা। শহীদ সাহেব পরিচয় করাইয়া দিলেন : ইনিই আমাদের প্রধান সেনাপতি ও বর্তমানে একই সংগে দেশরক্ষা মন্ত্রী জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খাঁ। সজোরে করমর্দন করিলাম। সংগে-সংগেই সদ্য-ঘটিত একটা ঘটনা মনে পড়িয়া গেল। গবর্নর-জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের ‘মিনিস্ট্রি অব ট্যালেন্টসের’ উনি যেদিন দেশরক্ষা মন্ত্রী হন, তাঁর কয় দিন পরে লাহোর কর্পোরেশন তাঁকে একটি মানপত্র দিয়াছিল। এই মানপত্রের জবাবে অন্যান্য ভাল কথার মধ্যে তিনি বলিয়াছিলেন : “ইস্ট পাকিস্তান ইয় ইনডিফেনসিবল। ডিফেনস অব ইস্ট পাকিস্তান লাইফ ইন ওয়েস্ট পাকিস্তান।” সরকারী দায়িত্বশীল লোকের মুখে ঐ ধরনের কথা শুনিয়া আমি যারপর নাই চটিয়া গিয়াছিলাম। এই ধরনের বিপজ্জনক কথা দায়িত্বশীল নেতার মুখের উপযোগী নয়। কলিকাতার তাঁতি বাগান রোডে থাকাকালে প্রতিবেশী বস্তিওয়ালা মুসলমান ভাইদের মুখে এই ধরনের কথা শুনিতাম। পরে পাকিস্তানে আসিয়া মোহাজের-ভাইদের অনেকের মুখেও শুনিয়াছি। তারা বলিত : হিন্দুস্থান পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করিলে আমাদের সেনাবাহিনী হিন্দুস্থান আক্রমণ করিয়া কয়েক ঘন্টার মধ্যে দিল্লি দখল করিবে। হিন্দুস্থান বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তান হইতে লেজ গুটাইয়া চলিয়া যাইবে। এই ধরনের গাল-গল্পকে আমি চা-স্টল কাফিখানা বা ভাড়ির আড়ার ব্যাপার মনে করিতাম। এ-কথার তাৎপর্য ছিল এই যে, বাংগালী অসামরিক কাপুরুষের জাত। যুদ্ধ তারা জানে না। পূর্ব-বাংলা তারা রক্ষা করিতে পারিবেনা। পশ্চিম পাকস্তানীরাই এদেশ রক্ষা করিবে। এই তাৎপর্যের জন্যই বোধ হয় আমার মেজ গরম হইত। আজ আমাদের প্রধান সেনাপতি-দেশরক্ষা মন্ত্রীর মুখে একথা শুনিয়া স্বভাবতঃই আমি তাঁর উপরও রাগ করিয়াছিলাম। অতএব, প্রাথমিক আলাপ-পরিচয় শেষ হওয়ামাত্র আমি ঐ কথাটা তুলিলাম এবং খুব সম্ভব অভদ্রভাবেই তুলিলাম। কারণ আগেই বলিয়াছি ঐ ধরনের কথা শুনিলে আমার মেজ ঠিক থাকিত না। কাজেই বলিলাম : ‘আপনি ঐ ধরনের কথা কিরূপে বলিলেন : দেশের প্রধান সেনাপতি দেশরক্ষা মন্ত্রী হিসাবে ঐ কথা বলিয়া আপনি সম্পূর্ণ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়াছেন। নিজের দেশের বেশির ভাগই অরক্ষণীয়, একথা কোনও দেশের প্রধান সেনাপতি ঘরের চালে দাঁড়াইয়া চিৎকার করিয়া ঘোষণা করিতে পারেন না।
