৬. বিভেদের শাস্তি
যুক্তফ্রন্টের মধ্যে আওয়ামী লীগই বিপুল মেজরিটি পার্টি। সূতরাং ৯২-ক ধারা উঠিলে মন্ত্রিত্ব আওয়ামী লীগেরই প্রাপ্য। তাছাড়া বড়লাট শহীদ সাহেবকে কথা দিয়াছেন বলিয়াও তিনি আমাদেরে জানাইয়াছেন। চিফ সেক্রেটারি মিঃ এন. এম. খাও নিজ-মুখে আমাদেরে সে কথা বলিয়াছেন। তবু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী স্বয়ং ঢাকায় উপস্থিত থাকিয়া কৃষক-শ্রমিক পার্টিকে মন্ত্রিত্ব দিয়া দিলেন। অস্থায়ী গবর্নর বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের অমতেই তিনি এটা করিলেন। গবর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ তখন লণ্ডনে। শহীদ সাহেবও তাঁর সাথে। তবু তিনি এটা ঠেকাইতে পারিলেন না। প্রধান মন্ত্রীর নিজ-মুখে-কওয়া দেশদ্রোহী’ হক সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করা যায় না বলিয়া তাঁর নমিনি মিঃ আবু হোসেন সরকারকে প্রধানমন্ত্রী করা হইল। তবু মেজরিটি পার্টি আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হইল না। কৃষক শ্রমিক পার্টির মন্ত্রিসভা হওয়ায় কুড়ি জন আওয়ামী সদস্যসহ দুইজন আওয়ামী নেতা মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিলেন। নেযামে-ইসলাম পার্টি, কংগ্রেস পার্টি ও তফসিলী হিন্দুরাও মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিলেন। গণতন্ত্রী দলও এই মন্ত্রী-সভাকে সমর্থন দিল। সুতরাং কার্যতঃ এবং নামতঃও এই মন্ত্রিসভা যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা হইল। শুধু আওয়ামী লীগ পার্টি বাদ পড়িল। আওয়ামী লীগ পার্টির কুড়ি জন সদস্য আওয়ামী মুসলিম লীগ পার্টি নামে কোয়েলিশন পার্টির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এবং ১৯ জন আওয়ামী সদস্য শেষ পর্যন্ত কৃষক-শ্রমিক পার্টিতে যোগ দেওয়ায় আওয়ামী লীগের সদস্যসংখ্যা ১০৪ জনে আসিয়া দাঁড়াইল।
এটা অচিন্তনীয় ব্যাপার ছিল না। আমাদের দেশে বিশেষতঃ মুসলমানদের মধ্যে পার্টি-চৈতন্য ও পার্টি-আনুগত্য আজও দানা বাঁধে নাই। বেশ কিছুসংখ্যক লোক আজও ‘ব্যাণ্ডওয়াগেন’-নীতি, দেশী কথায় ‘মামার জয়’-নীতির অনুসারী। তাছাড়া আওয়ামী লীগের আনুগত্য দাবির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক জোর ছিল সত্য, কিন্তু নৈতিক জোর ছিল না। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ স্বাধীন ও স্বন্ত্র পার্টি হিসাবে নিজস্ব নমিনি দাঁড় করায় নাই। যুক্তফ্রন্টের অংগ দল হিসাবেই নির্বাচন করিয়াছিল। নির্বাচনী ওয়াদা একুশ দফাও আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টো ছিল না। যুক্তফ্রন্টের মেনিফেস্টো ছিল। কাজেই নির্বাচিত সদস্যদের নৈতিক ও রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল যুক্তফ্রন্টের কাছে। এ অবস্থায় ৩৯ জন আওয়ামী মেম্বরের যুক্তফ্রন্টের নামে আওয়ামী লীগ ত্যাগ করাটা আশ্চর্যের বিষয় ছিল না। বরঞ্চ আরও বেশিসংখ্যক মেম্বর যে বিদ্রোহ করেন নাই, এটা আওয়ামী লীগের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও আওয়ামী মেম্বরদের শৃংখলা-বোধের পরিচায়ক।
এইভাবে আওয়ামী লীগ পার্টি আইন-পরিষদের মুসলিম অংশেও মাইনরিটি পার্টিতে পরিণত হইল। অতঃপর আইন-পরিষদের মেম্বরদের ভোটে যে ৩১ জন মুসলমান গণ-পরিষদের মেম্বর নির্বাচিত হইলেন, তাতে আওয়ামী লীগ পাইল মাত্র ১২টি। পক্ষান্তরে কৃষক-শ্রমিক ও নেযামে ইসলাম-গণন্ত্রী কোয়েলিশন পাইল ১৬টি। মুসলিম লীগ ১টি ও স্বতন্ত্র ২টি। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীই এই একমাত্র মুসলিম লীগ সদস্য।
এইভাবে আমাদের ভুল ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর অপচেষ্টায় আওয়ামী লীগ পার্টি পর পর তিন-তিনটা মার খাইল। যুক্তফ্রন্ট ভাংগিল। মেজরিটি-পার্টি আওয়ামী লীগ মাইনরিটি হইল। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে মোহাম্মদ আলীর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী শহীদ সাহেব মাইনরিটি-নেতা হইলেন।
২০. ঐতিহাসিক মারি-প্যাকট
ঐতিহাসিক মারি-প্যাকট
বিশা অধ্যায়
১. নয়া গণ-পরিষদ
মন্ত্রিত্ব আদায়ে এবং পরিণামে নয়া গণ-পরিষদের নির্বাচনে কৃষক-শ্রমিক পার্টি মুসলিম লীগের ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সাথে খুব ঘনিষ্ঠ হইয়া পড়িয়াছিল। এতে আমাদের মধ্যে অনেকেই যুক্তফ্রন্টের ১৬ জন মুসলিম গণ-পরিষদ মেম্বরকে কার্যতঃ মোহাম্মদ আলীর দলের লোক বলিয়াই মনে করিতে লাগিলেন। আমি কিন্তু অতটা নিরাশ হইলাম না। আমার মনে হইল, হক সাহেব শহীদ সাহেবের সহিত ব্যক্তিগত বিরোধের দরুন এবং নিজের দলকে ক্ষমতায় বসাইবার উদ্দেশ্যে, প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সাথে ঐ সুবিধার বিবাহ’ ম্যারেজ-অব-কনভিনিয়েন্স করিয়াছেন। সে আবশ্যকতা এখন ফুরাইয়াছে। তিনি পূর্ব-বাংলার গদিতে নিজের পার্টিকে বসাইয়াছেন। তাঁর দওলতে গণ-পরিষদের নির্বাচনেও তাঁর দল মেজরিটি হইয়াছে। এইবার আওয়ামী লীগের সহিত একযোগে কাজ করায় তাঁর কোনও আপত্তি হইবে না। কারণ তিনটি : প্রথমতঃ একুশ দফা নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে প্রাদেশিক সরকার হিসাবে তাঁর পার্টির দায়িত্বই বেশি। দ্বিতীয়ত: একুশ দফার ও আঞ্চলিক পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের সমর্থক মেম্বাররাই তাঁর দলে বেশি প্রভাবশালী। তৃতীয়তঃ তিন-তিনটা সম্মুখযুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করিয়া হক সাহেব নিশ্চয় এখন বিজয়ীর উদার মনোভাব অবলম্বন করিবেন। এইসব কারণে এবং সর্বোপরি কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠীর মোকাবেলায় পূর্ব-বাংলার ঐক্যের অপরিহার্য প্রয়োজনে কে, এস, পি আওয়ামী লীগের একযোগে কাজ করার আশায় বুক বাঁধিয়া আমি পশ্চিমের তীর্থক্ষেত্রে রওয়ানা হইলাম।
