৪. হক-নেতৃত্বে অনাস্থা
যুক্তফ্রন্টের অন্তর্বিরোধ আরও বাড়িল। আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি মুজিবুর রহমান সাহেব হক সাহেবের বিরুদ্ধে এক অনাস্থা প্রস্তাব আনিলেন। এই প্রস্তাবের পক্ষে দস্তখত অভিযান শুরু হইল। অভিযানের গোড়ায় মুজিবুর রহমান সাহেব বলিলেন : এ অনাস্থা-প্রস্তাব আওয়ামী লীগের তরফ হইতে নয় যুক্তফ্রন্টের তরফ হইতে। এতে কিছু সংখ্যক আওয়ামী মেম্বর ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনার স্বাধীনতা দাবি করিলেন। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি ডাকিয়া। আওয়ামী মেম্বরদের উপর ম্যাডেট দেওয়া হইল।
এই ধরনেরসভায় কোনদিনই শান্তিপূর্ণ সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্ত হয় না। গণ্ডগোলেই সভা শেষ হয়। এই অভিজ্ঞতা আমার অনেক দিনের ছিল। কাজেই ‘ইত্তেফাঁক– সম্পাদক মানিক মিয়া সাহেব ও আমি এই অনাস্থা প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করিলাম। কিন্তু আমাদিগকে এই বলিয়া চুপ করা হইল যে এটা শহীদ সাহেবের নির্দেশ এবং মওলানা সাহেবেরও এতে মত লওয়া হইয়াছে। কিন্তু ব্যাপারটা আমার মনঃপূত হইল না।
এই ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্য আমি শেষ পর্যন্ত শহীদ সাহেবের ও মওলানা সাহেবের সহিত টেলিফোনে যোগাযোগ করিবার চেষ্টা করিলাম। শহীদ সাহেবকে পাওয়া গেল না। মওলানা সাহেবকে পাইলাম। অনাস্থা-প্রস্তাবে তাঁর অনুমোদনের কথা তিনি অস্বীকার করিলেন। বলিলেন এ কাজে বিরত থাকিবার জন্য, তিনি আমাদের কয়েকজনের নামে পত্র দিয়াছেন। আমার চিঠি ময়মনসিংহের ঠিকানায় দিয়াছেন বলিয়া তখনও আমার হাতে পৌঁছে নাই। যাহোক তিনি অনাস্থা প্রস্তাব বিবেচনার সভা স্থগিত রাখিবার জোর পরামর্শ দিলেন।
আমি তাঁর অনুরোধ রক্ষার কোনও উপায় দেখিলাম না। কাজেই সে চেষ্টা করিলাম না। বরঞ্চ আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির ম্যানডেটের জোরে জিতিবার চেষ্টা করিলাম। কিন্তু শহীদ সাহেব ঢাকা না আসায় ও মওলানা সাহেবের বিরুদ্ধতার কথা জানাজানি হইয়া যাওয়ায় জয়ের সম্ভাবনা কমিয়া গেল। আমি আপোসের চেষ্টা করিলাম। বন্ধুবর আবদুস সালাম খাঁ সাহেবই এ আপোস করাইয়া দিতে পারিতেন। কারণ তিনি পঁচিশ জনের মত আওয়ামী মেম্বর লইয়া হক সাহেবের সমর্থন করিতে ছিলেন। আমি তাঁকে এই আপোস-ফরমূলা দিলাম পার্টির সভায় একই প্রস্তাবে প্রাদেশিক নেতা হিসাবে হক সাহেবের উপর ও কেন্দ্রীয় নেতা হিসাবে শহীদ সাহেবের উপর আস্থা জ্ঞাপন করা হইবে। সালাম সাহেব আমার ফরমূলা খুবই পছন্দ করিলেন। কিন্তু বলিলেন : বড়ই দেরি হইয়া গিয়াছে। ইট ই ট লেইট। আমি তাঁকে পরামর্শ দিলাম : কিচ্ছু দেরি হয় নাই। সালাম সাহেবের আর কিছু করিতে হইবে না। তিনি সোজা হক সাহেবের কাছে গিয়া বলিবেন : আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাবের পর তাঁর আর স্বাধীনতা নাই। তিনি ইতিপূর্বে হক সাহেবকে সমর্থনের যে ওয়াদা করিয়াছিলেন তা হইতে তিনি মুক্তি চান। সত্য-সত্যই সালাম সাহেবের ঐ ওয়াদা খেলাফ করিতে হইবে না। কারণ এ কথা শোনা মাত্র হক সাহেব সালাম সাহেবকে আশপাসের জন্য ধরিবেন। সালাম সাহেব তখন আমার ফরমূলায় আপোস করাইবার সুযোগ পাইবেন।
সালাম সাহেব আমার অনুরোধ রাখিতে পারেন নাই। ফলে নির্ধারিত দিনে ১৯৫৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি এসেমরি হলের রিফ্রেশমেন্ট রুমে যুক্তফ্রন্টের এই ঐতিহাসিক বৈঠক বসিল। সভার প্রাক্কালেও উভয় পক্ষের আপোস-কামী কতিপয় সদস্যের সহযোগিতায় আপোসের একটা চেষ্টা করিলাম। কিন্তু উভয় পক্ষের চরমপন্থীদেরই জয় হইল। সভার কাজ শুরু হইল। এ ধরনের সভায় বরাবর যা হইয়া থাকে তাই হইল। উভয় পক্ষের প্রস্তাব পাস হইল। উভয় পক্ষই জিতিল। উভয় পক্ষের খবরের কাগযে যার-তার প্রস্তাবের সমর্থকদের যেসংখ্যা বাহির হইল তার যোগফল মোট মেম্বরের চেয়ে বেশি। উভয় পক্ষই জয় দাবি করিলেন। আওয়ামী লীগ ওয়ালারা বলিলেন : আওয়ামী লীগের জয়। কৃষক-শ্রমিক ওয়ালারা বলিলেন : কৃষক-শ্রমিক পার্টির জয়। দুই দলের কেউ তখন বুঝিলেন না যে জয় তাঁদের কারও হয় নাই। আসল জয় হইয়াছে গণ-দুশমন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি।
৫. আশার আলো নিভিল
এই ভাবে যুক্তফ্রন্ট ভাংগিয়া গেল। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের বড় শরিক আওয়ামী লীগ এই ভাংগনের কোনও সুবিধা উপভোগ করিতে পারিল না। বরঞ্চ ছোট শরিক কৃষক শ্রমিক পার্টিই দৃশ্যতঃ এবং স্পষ্টতঃ সব সুবিধা লুটিতে লাগিল। আওয়ামী লীগের নেতা শহীদ সাহেব কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকার দরুন আওয়ামী লীগের কোনও সুবিধা ত হইলই না, বরঞ্চ প্রতিপদে বেকায়দা হইতে লাগিল। গবর্নর-জেনারেল এই সময়ে কতকগুলি বেআইনী ও অগণতান্ত্রিক অর্ডিন্যান্স জারি করিলেন। কৃষক-শ্রমিক পার্টি ও তার নেতা হক সাহেব জনসভা করিয়া এবং বিবৃতি দিয়া সে সবের প্রতিবাদ করিতে লাগিলেন। তাঁদের দলের প্রতিনিধি মিঃ আবু হোসেন সরকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এইসব অগণতান্ত্রিক কাজের জন্য শুধু শহীদ সাহেবকেই দোষী করিতে লাগিলেন। আওয়ামী লীগ আত্মপক্ষ সমর্থনে কোনও সাফাই দিতে পারিল না। কারণ শহীদ সাহেবের মুখ চাহিয়া ঐ সব অগণতান্ত্রিক অর্ডিন্যান্সের প্রতিবাদও তাঁরা করিলেন না। আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীকে দেশে ফিরাইয়া আনার আন্দোলন ও জনসভা আওয়ামী লীগের বদলে কৃষক-শ্রমিক পার্টিই করিতে লাগিল। এতে আওয়ামী লীগের মর্যাদা দ্রুত হ্রাস পাইতে লাগিল। এই সময় গবর্নর-জেনারেল একটি গণ-পরিষদের বদলে একটি শাসনতন্ত্র কনভেনশন গঠনের জন্য এক অর্ডিন্যান্স জারি করিলেন। এটা স্পষ্টতঃই অগণতান্ত্রিক হইল। কৃষক-শ্রমিক পার্টি এই অগণতান্ত্রিক পন্থার তীব্র প্রতিবাদ করিল। তাছাড়া কনভেনশনের সদস্যসংখ্যায় দুই পাকিস্তানের প্যারিটি-প্রবর্তন করায় পূর্ব-বাংলার সর্বত্র ইহার প্রতিবাদ উঠিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ শহীদ সাহেবের খাতিরে এ সব অন্যায়েরও প্রতিবাদ হইতে বিরত রহিল। আমরা আওয়ামী লীগের কর্মীরা শরমে মরমে মরিতে লাগিলাম। মওলানা ভাসানী কলিকাতা হইতে কনভেনশনের প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়া আওয়ামী লীগের মুখ রক্ষা করিলেন। এই সময়ে কনভেনশনের পক্ষে ক্যানভাস করিবার জন্য শহীদ সাহেব ও ইঙ্কান্দর মির্যা ঢাকায় আসিলেন। উদ্দেশ্য ও শহীদ সাহেব আওয়ামী লীগকে ও মির্যা সাহেব কৃষক-শ্রমিক পার্টিকে কনভেনশন গ্রহণ করাইবেন। একই সময়ে গবর্নমেন্ট হাউসের এক অংশে শহীদ সাহেব আওয়ামী লীগকে লইয়া এবং অপর অংশে মির্যা সাহেব কৃষক-শ্রমিক পার্টিকে লইয়া দরবারে বসিলেন। শহীদ সাহেবের পরামর্শে আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত কনভেনশন সম্পর্কে এই মত প্রকাশ করিল যে যদি মওলানা ভাসানী ঢাকায় আসিয়া আওয়ামী লীগের সভায় কনভেনশন সমর্থন করেন, তবে আওয়ামী লীগ তাতেই রাযী আছে। পক্ষান্তরে গবর্নমেন্ট হাউসের অপর অংশে ইস্কান্দর মির্যা কৃষক-শ্রমিক পার্টিকে যা বুঝাইলেন, তার ফল এই হইল যে পরদিনই হক সাহেব নিজ বাড়িতে কৃষক-শ্রমিক পার্টির আনুষ্ঠানিক সভা ডাকিয়া কনভেনশন ও প্যারিটির তীব্র প্রতিবাদ করিলেন এবং সার্বভৌম ক্ষমতা সম্পন্ন গণ পরিষদ দাবি করিলেন। ঐ সংগে প্রস্তাবিত কনভেনশন বয়কট করার প্রস্তাবও গৃহীত হইল। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগও বয়কটের প্রস্তাব করিল। আর সব পার্টিই গণতন্ত্র ও পূর্ব-বাংলার স্বার্থে সগ্রামে অবতীর্ণ হইল। শুধু আওয়ামী লীগ চুপ করিয়া থাকিল। কনভেনশনের নির্বাচনের নমিনেশন পেপার দাখিলের দিন তারিখ পিছাইয়া দিয়া মির্যা সাহেব ও শহীদ সাহেব করাচি ফিরিয়া গেলেন। দিন সাতেক পরে ২৫শে এপ্রিল তারিখে কলিকাতা হইতে মওলানা ভাসানীকে সংগে লইয়া শহীদ সাহেব আবার ঢাকায় আসিলেন। আমাদের মধ্যে বিপুল আনন্দ ও আশা জাগিল। আওয়ামী লীগের সভা বসিল। শহীদ সাহেবের প্রাণস্পর্শী বক্তৃতা শুনিয়া আওয়ামী লীগ কভেনশন সম্পর্কে চিন্তা করিবার এবং আরও আলোচনা করিবার সময় চাহিল। শহীদ সাহেব এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যুক্তি দিলেন। মওলানা সাহেব অগত্যা নমিনেশন পেপার দাখিলের পক্ষে মত দিলেন। পরদিন আমরা নমিনেশন পেপার দাখিল করিলাম। আর কোনও পার্টি নমিনেশন ফাঁইল করিল না। আমরা অনেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হইবার আশায় মনে-মনে খুশি হইলাম। কিন্তু বড়লাট নমিনেশন পেপার দাখিলের তারিখ আবার পিছাইয়া দিলেন। আমরা নিরাশ হইলাম। মওলানা ভাসানীর গাল খাইলাম। কিন্তু এর পরেও আমাদের কপালে আরও অপমান ছিল। ১০ই এপ্রিল ফেডারেল কোর্ট কনভেনশন গঠনে বড়লাটের ক্ষমতা নাই, সাধারণ গণ-পরিষদ গঠন করিতে হইবে, বলিয়া রায় দিলেন। ১৯৫৫ সালের ২৮শে মে বড়লাট ফেডারেল কোর্টের রায় মোতাবেক নয়া গণ-পরিষদ গঠনের অর্ডিন্যান্স জারি করিলেন। গণতন্ত্রের নিশ্চিত জয় হইল। কিন্তু এ জয়ে আওয়ামী লীগ শরিক হইতে পারিল না। গণতন্ত্রের জয়ও যে কোনও দিন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের পরাজয় ও লজ্জার কারণ। হইতে পারে, ঐ দিনই প্রথম আমার সে কথা মনে পড়িয়াছিল। কিন্তু এখানেই আমাদের পরাজয়ের শেষ হয় নাই। দুর্দশা আরও ছিল বরাতে।
