আমাদের এই বৈঠক দীর্ঘক্ষণ ধরিয়া চলিল। এই বৈঠক চলিতে থাকা কালেই ডাঃ খান সাহেব, জেনারেল আইউব ও মেজর জেনারেল ইঙ্কান্দর মির্যা তিনজন মন্ত্রী পৃথক-পৃথক ভাবে শহীদ সাহেবের সংগে দেখা করিতে আসিলেন। কি কথা তাঁদের মধ্যে হইল তার খুটিনাটি আমরা জানিলাম না। তবে শহীদ সাহেবকে মন্ত্রিসভায় নিবার প্রবল আগ্রহ যে বর্তমান মন্ত্রিসভার আছে, এটা বোঝা গেল। কিন্তু আমাদের সন্দেহ দূর হইল না। আমরা শহীদ সাহেবকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম যে আমরা প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের উপর জোর দিতেছি না, বড়লাটের আন্তরিকতার পরখ হিসাবেই এর উপর জোর দিতেছি।
আমাদের বৈঠক চলিল। কিন্তু আমার একটি ব্যবসাগত অনিবার্য কারণে ময়মনসিংহে ফিরিয়া আসা অত্যাবশ্যক হইয়া পড়িল। বড় মামলা। নানী হইবেই। আর তারিখ পাওয়া যাইবে না। টেলিগ্রাম আসিয়াছে। শহীদ সাহেবকে টেলিগ্রাম দেখাইলাম। ছুটি চাহিলাম। নিজে তিনি উকিল মানুষ। উকিলের অসুবিধা তিনি ভাল বুঝিলেন। ছুটি দিলেন। কিন্তু হুকুম দিলেন। তোমার মতামতটা সংক্ষেপে লিখিয়া রাখিয়া যাও। আমি তাই করিলাম। শহীদ সাহেবের হাতে আমার লিখিত নোটটা দিয়া ১৬ই ডিসেম্বর আমি কাটি ত্যাগ করিলাম। শহীদ সাহেব সাধারণতঃ কাগ-পত্র ফেলেন না। আমার নোটটাও ফেলেন নাই। অনেকদিন পরেও আমার হাতের-লেখা ঐ নোটটা শহীদ সাহেবের ফাঁইলে দেখিয়াছি। তাতে ৮টি দফা ছিল। উপরে বর্ণিত সর্ব সক্ষত ৩টি দফা আগে লিখিয়া পরে নিম্নলিখিত ৫টি দফা আমার ব্যক্তিগত দায়িত্বে লিখিয়াছিলাম : (৪) যুক্তফ্রন্টের একুশ দফার নির্বাচনী ওয়াদার ১৯নং দফা অনুসারে ৩ বিষয়ের কেন্দ্রীয় সরকারের বিধান শাসনতন্ত্রে লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে বড়লাট ও মন্ত্রিসভার সংগে এখনই বোঝাঁপড়া করিতে হইবে; (৫) ইন্টারিম কনস্টিটিউশন অনুসারে নির্বাচিত গণ-পরিষদের সিম্পল-মেজরিটি ভোটে শাসনতন্ত্র সংশোধনের অধিকার থাকিবে; (৬) পূর্ব-বাংলায় অবিলম্বে ৯২-ক ধারার অবসান করিয়া পার্লামেন্টারি শাসন প্রবর্তন করিতে হইবে; (৭) শহীদ সাহেবের মন্ত্রিসভায় প্রবেশের আগে বড়লাটের নিকট হইতে এইসব শর্তাবলী লিখিতভাবে আদায় করিতে হইবে; (৮) মন্ত্রিসভায় প্রবেশের আগেই শহীদ সাহেবকে একবার পূর্ব-বাংলা সফর করিতে এবং যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সাথে আলোচনা করিতে হইবে।
যে-কোন অবস্থায় ও পরিস্থিতিতে শহীদ সাহেবের একবার পূর্ব-বাংলায় আসা আমার বিবেচনায় খুব জরুরী হইয়া পড়িয়াছিল। কৃষক-শ্রমিক পার্টির নেতাদের অনেকের প্রতি কোনও-কোনও আওয়ামী নেতার মনোভাব ভাল ছিল না স্বাভাবিক কারণেই। তবুও শহীদ সাহেবকে করাচি বিমান বন্দরে অভ্যর্থনা করিবার জন্য অনেক কে, এস. পি. নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সেইদিন ও পরের দিন শহীদ সাহেবের বাড়িতেও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের বৈঠক হইতেছে এই টেকনিক্যাল গ্রাউন্ডে তাঁদের সভায় উপস্থিত থাকিতে বা শহীদ সাহেক্কের সাথে কথা বলিতে দেয়া নাই। এটা আমার কাছে অশোমনেহইয়াছিল। তারপর করাচি ত্যাগের সময় আমি জানিতে পারিলাম, ক সাহেব প্রধানমন্ত্রীর ডাকে করাচি আসিয়াছেন। এটা ফুট ভাংগার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর আরেকটা চেষ্টা, সে কথা করাটিতে সমাগত দুচারজন কে. এস. পি নেতাও বলিলেন। আমিও তাঁদের সাথে একমত হইলাম। তারা আরও বলিলেন এবং আমি একমত হইলাম যে করাচিতেই হক সাহেব ও শহীদ সাহেবের মোলাকাত হওয়া দরকার। এ সম্পর্কে আতাউর রহমান সহ আওয়ামী নেতারা আমার সাথে একমত হইলেন। এই ব্যবস্থা করিবার জন্য সকলকে অনুরোধ করিয়া আমি আশা-ভরা মন লইয়া করাচি ত্যাগ করিলাম। শহীদ সাহেবের সাথে দেখা করিবার আমার সময় হইল না।
২০শে ডিসেম্বর বাসায় বসিয়াই রেডিও শুনিলাম,শহীদ সাহেব মন্ত্রিসভায় প্রবেশ করিয়াছেন। আমার আশঙ্কা দৃঢ় হইল। মনটা খারাপ হইল। শহীদ সাহেবকে মোবারকবাদ পাঠাইতে মন উঠিল না। কাজেই বিলম্ব করিলাম। বন্ধু-বান্ধবের পীড়াপীড়িতে অবশেষে যাও একটি টেলিগ্রাম করিলাম, তাতে লিখিলাম। ‘গ্রেচুলেশনস। হোপ ইউ যা এ্যাকুটেড ওয়াইলি।’ শহীদ সাহেব পরে বলিয়া ছিলেন আমার টেলিগ্রামে তিনি দুঃখিত হইয়াছিলেন। জবাবে আমি বলিয়াছিলাম। ‘আমি ভাঁর চেয়ে বেশিদুঃখিত হইয়াছিলাম।‘
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুইটি কারণে আমার মন সান্ত্বনা পাইল। এক, শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ সাহেবের উদ্যোগে মুক্তি পাইলেন। দুই, শীঘ্রই মওলানা ভাসানী সাহেবকে দেশে ফিরিতে দেওয়া হইবেলিয়া সংবাদ প্রচারিত হইল।
৩. ভুলের মাশুল
অল্পদিন মধ্যেই প্রমাণিত হইল যে শহীদ সাহেবকে ধাঙ্গ দেওয়া হইয়াছে। একমাত্র মুজিবুর রহমান সাহেবকে মুক্তি দেওয়া ছাড়া আর কোনও ব্যাপারে বড়লাট বা তাঁর সহ-ঘরা শহীদ সাহেবের কথা রাখিতেছেন না, এটা স্পষ্ট হইয়া গেল। মওলানা ভাসানীকে দেশে ফিরিবার আদেশ ক্রমেই বিলম্বিত হইতে লাগিল। আওয়ামী লীগ হইতে আরও দুইজন মন্ত্রী গ্রহণ করা ত দূরের কথা, শহীদ সাহেবের অমতে হক সাহেবের দলের বন্ধু আবু হোসেন সরকারকে ৪ঠা জানুয়ারি মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করা হইল। বক্সের কাগমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে এবং হক সাহেব ও শহীদ সাহেকের বিবৃতিতে বোঝা গেল, যুক্তফ্রন্টে বেশ বড় রকমের ভাংগন ধরিয়াছে। আমার বরাবর ধারণা ছিল যে গবর্নর-জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ নিজে এবং তাঁর পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী, হক সাহেব ও শহীদ সাহেবের মধ্যে বিরোধ বাঁধাইয়া যুক্তফ্রন্ট ভাংগিবার ষড়যন্ত্র করিতেছেন। মওলানা ভাসানী দেশে থাকিলে এই চেষ্টায় তাঁরা সফল হইতে পারিবেন না এই আশঙ্কাতেই তাঁরা মওলানা সাহেবকে দেশে ফিরিতে দিতেছিলেন না। এই ব্যাপারে কি শহীদ সাহেব, কি হক সাহেব, দুই জনের একজনও দেশকে উপযুক্ত নেতৃত্ব দিতে পারিতেছেন না বলিয়া আমার মনটা খুবই খারাপ হইয়াছিল। দুই নেতাই শাসন-নিয়ন্ত্রণের উর্ধ্বে। একজনের কথায় নির্ভর করা যায় না; আরেকজন কারও পরামর্শ মানেন না। এ অবস্থায় একটি মাত্র লোক যিনি উভয়কে শাসন করিতে পারিতেন, তিনি ছিলেন মওলানা ভাসানী। দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি ঠিক এই সময়েই দেশে নাই। আজ আমার মনে হইতেছে, মওলানা সাহেবের ঐ সময়ে বিদেশে যাওয়াটা ঠিক হয় নাই। তিনি থাকিলে বোধ হয় হক সাহেব ও শহীদ সাহেবের ঐ ব্যক্তিগত বিরোধ এবং পরিণামে যুক্তফ্রন্টের ভাংগন রোধ করিতে পারিতেন। কিন্তু আমার মনে হইলে কি হইবে? পার্টির বা দেশের সবচেয়ে যে সংকট মুহূর্তে মওলানা সাহেবের প্রয়োজন হইয়াছে সবচেয়ে বেশি, ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি দুপ্য হইয়াছেন।
