কিন্তু আওয়ামী-নেতাদের এই আশা পূর্ণ হইল না। গবর্নর-জেনারেল ঢাকা আসিবার আগেই কাগযে বিবৃতি দিলেন যে হক সাহেবকে তিনি রাষ্ট্রের দুশমন মনে করেন না, বরঞ্চ একজন বন্ধু মনে করেন। এটা ছিল ধূর্ত গোলাম মোহাম্মদের একটা চাল। এই চালে স্বয়ং হক সাহেবও পড়িলেন। ঐ ঘোষণার পরে গবর্নর-জেনারেলের গলায় মালা দিতে হক সাহেবও প্রস্তুত হইলেন। অবশেষে ১৪ই নবেম্বর বড়লাট ঢাকা আসিলে হক সাহেব ও আতাউর রহমান সাহেব উভয়েই তাঁর গলায় মালা দিলেন। কার্যন হলে অভিনন্দন হইল। আমার মনটা এইসব ব্যাপারে এতটা তিক্ত হইয়াছিল যে আমি ঢাকা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বিমান বন্দরে গেলাম না। এই সব ফাংশনেও যোগ দিলাম না। আমার কেবলই মনে হইতেছিল যে গবর্নর-জেনারেলকে লইয়া এইরূপ লাফালাফি করা ঠিক হইতেছে না।
কিন্তু এই মাল্যদানের আশু কোনও ফল হইল না। পূর্ব-বাংলায় পার্লামেন্টারি সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইল না।
২. শহীদ সাহেবের ভল
১৯৫৪ সালের ১১ই ডিসেম্বর সুহরাওয়ার্দী সাহেব করাচি ফিরিয়া আসিলেন। তিনি ইতিপূর্বেই করাচিতে ঐ তারিখে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের একটি বৈঠক আহবান করিয়াছিলেন। সেই বৈঠকে যোগদান করিবার জন্য অন্যান্য বন্ধুদের সাথে আমিও করাচি গেলাম। যথাসময়ে আমরা শহীদ সাহেবকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা করিলাম। বিপুল সম্বর্ধনা হইল। আওয়ামী লীগের সমর্থক ছাড়াও বিমানবন্দরে বহু নেতার সমাগম হইল। কারণ ইতিমধ্যেই এই গুজব খুব জোরদার হইয়া উঠিয়াছিল যে শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করিয়া মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন বড়লাট একরূপ ঠিক করিয়াই ফেলিয়াছেন।
শহীদ সাহেবের কাঁচারি রোডের বাড়িতে যথাসময়ে আওয়ামী লীগের বর্ধিত ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বসিল। শহীদ সাহেব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করিয়া মূল্যবান বক্তৃতা করিলেন। তিনি মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিবেন কি না, সে সম্বন্ধে মেম্বরদের পরামর্শ জিগাসা করিলেন। উভয় পাকিস্তান হইতে যাঁরা বক্তৃতা করিলেন, তাঁদের প্রায় সকলেই বলিলেন : শহীদ সাহেব একমাত্র প্রধানমন্ত্রী রূপেই মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিবেন, অন্যথায় নয়। তাছাড়া একথাও কেউ-কেউ বলিলেন যে মৌঃ তমিযুদ্দিন সাহেবের রীট দরখাস্ত তখনও সিন্ধু চিফ কোর্টের বিচারাধীন রহিয়াছে। কাজেই অনিশ্চিত পরিবেশে শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হইবে না। এইভাবে শহীদ সাহেব আওয়ামী-নেতাদের মতামত জ্ঞাত হইয়া তিনি গবর্নর-জেনারেলের সাথে দেখা করিতে গেলেন। সাড়ে চার ঘন্টা কাল তাঁদের মধ্যে আলোচনা হইল। পরদিনের আওয়ামী লীগের বৈঠকে শহীদ সাহেব ঐ আলোচনার সারমর্ম প্রকাশ করলেন। তাতে বোঝা গেল, বড়লাটের মতে শহীদ সাহেবকে গোড়াতেই প্রধানমন্ত্রী কার অসুবিধা আছে। প্রথমে তাঁকে সাধারণ মন্ত্রী হিসাবেই মোহাম্মদ-আলী কেবিনেটে ঢুকিতে হইবে। তারপর অল্পদিন মধ্যেই শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করিয়া মন্ত্রিসভা পুনর্গঠিত হইবে। শহীদ সাহেব মন্ত্রিসভায় ঢুকামাত্রই তাঁর উপর শাসনত্ম রচনার ভার দেওয়া হইবে। শহীদ সাহেব আমাদিগকে বুঝাইতে চাহিলেন যে প্রধানমন্ত্রিত্বটা বড় কথা নয়, বড় কথা শাসনন্ত্র রচনা।
কিন্তু মেম্বররা শহীদ সাহেবের সহিত একমত হইলেন না। তখন তিনি প্রস্তাব দিলেন যে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ হইতে ৪ জন করিয়া নেতৃস্থানীয় আওয়ামী–নেতা লইয়া গোপন পরামর্শ করিবেন। আমরা তাতেই রাযী হইলাম। হোটেল মেট্রোপপালের শহীদ সাহেবের কামরায় আটজন নেতাকে লইয়া তিনি গোপন পরামর্শ বৈঠক করিলেন। যতদূর মনে হয় পূর্ব-পাকিস্তানের পক্ষ হইতে জনাব আতাউর রহমান খাঁ, মানিক মিয়া, কোরবান আলী ও আমি ঐ বৈঠকে উপস্থিত থাকিলাম। এই বৈঠকে শহীদ সাহেব যে সব কথা বলিলেন তার সারমর্ম এই : (১) বড়লাট গোলাম মোহাম্মদ তাঁকে কসম খাইয়া বলিয়াছেন যে শহীদ সাহেবের কেবিনেটে ঢুকার তিনদিন কারও মতে তিন সপ্তাহ) মধ্যে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করিয়া মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করিবেন; (২) ঐ সময়ে আওয়ামী লীগ হইতে আরও দুইজন মন্ত্রী নেওয়া হইবে; (৩) শাসন রচনার ভার শহীদ সাহেবকে দেওয়া হইবে; (৪) ছয় মাসের মধ্যে শাসন রচনার কাজ শেষ করিয়া একটি অর্ডিন্যান্স বলে উহাকে ইন্টারিম কনস্টিটিউশন রূপে প্রয়োগ করা হইবে; (৫) ঐ শাসনতন্ত্র অনুসারে এক বছরের মধ্যে দেশময় সাধারণ নির্বাচন শেষ করা হইবে; (৬) ঐ ভাবে নির্বাচিত পার্লামেন্টের শাসনতন্ত্র যে কোনও রূপে সংশোধন করার পূর্ণ অধিকার থাকিবে।
শহীদ সাহেব আমাদিগকে আরও জানাইলেন যে বড় লাট এই সব কথা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রীর সামনেই বলিয়াছেন এবং তাঁদের সম্মতি সহকারেই বলিয়াছেন। এই ক্ষুদ্র সভারও প্রায় সকলেই আমরা গবর্নর-জেনারেলের সরলতা ও আন্তরিকতায় সন্দেহ প্রকাশ করিলাম। কাজেই আমরা সকলে যদিও এই সব শর্ত গ্রহণযোগ্য বলিয়া স্বীকার করিলাম তবু এই সব শর্ত প্রতিপালিত হওয়ার ব্যাপারে আমরা ঘোর সন্দিহান থাকিলাম। শহীদ সাহেব এই বৈঠকে আমাদের দেশ প্রেমে আবেগপূর্ণ আবেদন করিলেন। বলিলেন : দেশের শাসন ও গণতন্ত্রই বড় কথা; কোনও এক ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রিত্বটা বড় কথা নয়। আমরা শহীদ সাহেবের সহিত এ ব্যাপারে একমত হইয়াই বলিলাম : (১) প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্যই শহীদ সাহেবের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দরকার নাই। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রী হইলেই এই সব শর্ত কার্যকরী হইবে; অন্যথায় হইবে না; (২) এই সব শর্ত যে বড়লাট প্রতিপালন করিবেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী করা; (৩) অল্প কয়েকদিন পরেই যখন শহীদ সাহেবকে প্রধানমন্ত্রী রাই হইবে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরও যখন তাতে আপত্তি নাই, সে অবস্থায় সেটা এখনই কার্যে পরিণত না করার কোনও কারণ নাই।
