হক সাহেব আমাদের এই গোলাবি চিত্রে টনিলেন না। বরঞ্চ আমাদিগকে মফসসলে যার-তাঁর এলাকায় গিয়া জনগণকে বিপ্লবী বেআইনী ধ্বংসাত্মক কাজে নিয়োগ করিবার অবাস্তব ইমপ্র্যাকটিক্যাল ও অনিষ্টকর উপদেশ ও পরামর্শ দিলেন। আমরা নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসিলাম। বুঝিয়া আসিলাম শেরে-বাংলা হক সাহেব বেশ একটু ভয় পাইয়াছেন। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের সংগে একটা আপোস করিবার চেষ্টা তলে-তলে করিতেছেন।
কাজেই আমরা কেউ কিছু করিলাম না। কিন্তু হক সাহেব ও যুক্তফ্রন্টের এই দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগ কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী ১৬ই জুন তারিখে এক বেতার বক্তৃতায় হক সাহেবকে স্বীকারোক্তিকারী দেশদ্রোহী বলিয়া ঘোষণা করিলেন। হক সাহেব নিজ ঘরে নযর-বন্দী হইলেন। অতঃপর তাঁর সাথে দেখা-শোনায় খুব কড়াকড়ি করা হইল। গেটে পুলিশের কাছে নাম দস্তখত দিয়া আমি কয়েকবার হক সাহেবের সাথে দেখা করিলাম। শেরে-বাংলাকে খুবই উদ্বিগ্ন দেখিলাম। অনেক জেরা করিয়াও তাঁর কথিত স্বীকারোক্তি সম্বন্ধে হা-না স্পষ্ট কিছু আদায় করিতে পারিলাম না। তিনি ঘুরাইয়া-প্যাচাইয়া এমন ধরনের সব শিশু শুলভ কথা বলিলেন, যাতে আমি বুঝিলাম তিনি ঐ গোছের কিছু-একটা করিয়া ফেলিয়াছেন।
হক সাহেব নযর-বন্দী, মওলানা ভাসানী দেশে নাই, শহীদ সাহেবও গুরুতর অসুখ অবস্থায় বিদেশে। চারিদিকেই অন্ধকার। সুই সাহসী নেতৃত্বের অভাবে ছাত্র তরুণরা, বিভ্রান্ত। শেখ মুজিবুর রহমান সহ প্রায় দুই হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী ইউনিভার্সিটির ছাত্র সহ প্রায় দুইশ ছাত্র গেরেফতার হইল। তার মধ্যে আমার দ্বিতীয় পুত্র সলিমুল্লা হলের জেনারেল সেক্রেটারি মহবুব আনামও ছিল। এমনি করিয়া দেশের আকাশে-বাতাসে নৈরাশ্যের ও অস্ফুট ক্রোধের গুমরানো ক্রন্দন শ্রুত হইতে থাকিল।
যুক্তফ্রন্টের বিজয়ে পূর্ব বাংগালীর রাষ্ট্রীয় জীবনে যে সৌভাগ্য-সূর্য উদিত হইয়াছিল, তাতেই এমনি করিয়া তাতে গ্রহণ লাগিল। পরবর্তী কালের ইতিহাস প্রমাণ করিয়াছে, সে গ্রহণ আজও ছাড়ে নাই। পিছনের দিকে তাকাইয়া এত দিন পরেও আজ মনে হয়, যদি তিন প্রধানের বিরোধ না হইত, যদি যুক্তফ্রন্টের সর্ব সম্মত মন্ত্রিসভা গঠিত হইতে পারিত, যদি হক সাহেব ও শহীদ সাহেব স্ব স্ব প্রিয়পাত্রের জন্য যিদ না করিতেন, যদি মওলানা ভাসানী নিরপেক্ষ দৃঢ়তা অবলম্বন করিতেন, যদি হক সাহেব লিডার নিযুক্ত হইয়াই গণ-পরিষদের মেম্বরগিরি নিজে ছাড়িতেন এবং অন্যান্যদেরে ছাড়িবার নির্দেশ দিতেন, যদি তিনি ২১ দফা কর্মসূচি রূপায়ণে ধীর ও দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হইতেন, যদি হক সাহেব কলিকাতা সফরে গিয়া রাজনৈতিক দুশমনদেরে অজুহাত না দিতেন, তবে পূর্ব বাংলার ভাগ্যে কি কি কল্যাণ হইতে পারিত, সারা পাকিস্তানের ভাগ্যে কি কি শুভ পরিণাম হইত, তা আজ সহজেই অনুমেয়। পূর্ব-বাংলার সরকারের জনপ্রিয়তার সংগে তাঁর ঐক্য ও স্থায়িত্বের মুখে নির্বাচনে পরাজিত সরকারী দল আমাদের দাবি মানিয়া লইতেন। গণ-পরিষদে নয়া নির্বাচন হইত। নয়া নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা অবিলম্বে পূর্ব-বাংলার গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র রচিত হইত; পাকিস্তানে গণতন্ত্র শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে রূপায়িত হত। পরবর্তীকালের ক্রমবর্ধমান চরম দূর্ভাগ্যসমূহের একটাও ঘটিতে পারিত না।
১৯. পাপ ও শাস্তি
পাপ ও শাস্তি
উনিশা অধ্যায়
১. গবর্নর-জেনারেলের রাজনীতি
সাধারণ নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করিয়া মুসলিম লীগ নেতারা পূর্ব– বাংলার জনপ্রিতিনিধিদের জনপ্রিয় সরকারের বিরুদ্ধে এই অনিয়মতান্ত্রিক প্রতিশোধ নিয়া বেশি দিন সুখের ভাত খাইতে পারিলেন না। পাঁচ মাস যাইতে-নাযাইতেই গবর্নর-জেনারেল ২৩শে অক্টোবর তারিকে গণ-পরিষদ ভাংগিয়া দিলেন। গবর্নর জেনারেলের এই কাজের আইনগত প্রশ্নের দিক পরে পাকিস্তানের ফেডারেল কোর্টে বিস্তারিত আলোচনা হইয়াছিল। গণ-পরিষদের প্রেসিডেন্ট মৌঃ তমিযুদ্দিন খাঁ সাহেব গবর্নর-জেনারেলের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করিয়া সিন্ধু চিফ কোর্টে রীটের মামলা দায়ের করেন। চিফ কোট তমিযুদ্দিন খাঁ সাহেবের পক্ষে রায় দেন। গবর্নমেন্ট এই রায়ের বিরুদ্ধে ফেডারেল কোর্টে আপিল করেন। সেই সংগে গবর্নর-জেনারেলও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ২১৩ ধারার বিধান মতে ফেডারেল কোর্টের নিকট একটি রেফারেন্স করেন। ফেডারেল কোর্টে দীর্ঘদিন সওয়াল-জবাব হইয়াছিল। সে সব কথা এবং তার ফলাফল সবাই জানেন। এটাও জানা কথা যে গবর্নর-জেনারেলের এই কাজে পূর্ব-বাংলার জনসাধারণ এবং তাদের নেতাদের বেশির ভাগ আনন্দিত হইয়াছিলেন। অবশ্য এই আনন্দের মধ্যে কোনও সচেতন বুদ্ধি বা আদর্শবাদ ছিল না। এটা ছিল যালেম শত্রুকে নাজেহাল হইতে দেখার স্বাভাবিক অথচ নীচ অন্যায় অথচ তীব্র আনন্দ। গবর্নর-জেনারেলের এই কাজ অনিয়মতান্ত্রিক ডিক্টেটরি হইয়াছিল, একথা সবাই বুঝিয়াছিলেন। তবু আনন্দিত হইয়াছিলেন। কারণ স্বয়ং মুসলিম লীগ নেতারাই এই অনিয়মতান্ত্রিক ব্যভিচার শুরু করিয়াছিলেন। খাজা নাযিমুদ্দিনের সম্পূর্ণ বেআইনী ভাবে গবর্নর-জেনারেল হইতে প্রধানমন্ত্রী হওয়া, অনিয়মতান্ত্রিক ভাবেই প্রধানমন্ত্রিত্ব হইতে তাঁর বরখাস্ত, বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর অসংগতভাবে প্রধানমন্ত্রিত্ব দখল, পূর্ব-বাংলায় ৯২-ক ধারার প্রবর্তন, ইত্যাদি সব অনিয়মতান্ত্রিক কুকর্ম হয় মুসলিম লীগ-নেতারা নিজেরাই করিয়াছিলেন, নয় ত বুরোক্র্যাসির এ সব কাজে সহযোগিতা করিয়াছিলেন। কাজেই মুসলিম লীগ-নেতারা যখন পরের-জন্য—নিজেদের—খুঁদা কুঁয়ায় নিজেরাই পড়িলেন, তখন তাদের জন্য অশ্রুপাত করিবার কেউ রহিল না। তাঁদের দ্বারা উৎপীড়িত পূর্ব-বাংলার জনগণও তাদের নেতারা স্বভাবতঃই এটাকে শত্রুপক্ষের গৃহযুদ্ধ এবং এক শক্ত কর্তৃক আরেক শত্রুর নিধন মনে করিয়াছিলেন। আমার মানসিক প্রতিক্রিয়াও অবিকল ঐরূপ হইয়াছিল। কিন্তু বন্ধুবর আতাউর রহমান সাহেব যখন গবর্নর-জেনারেল গোলাম মোহাম্মদকে অভিনন্দন দিবার প্রস্তাব করিলেন, তখন আমি তাঁকে সমর্থন করিতে পারিলাম না। যুক্তফ্রন্টের আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা আতাউর রহমান সাহেবের প্রস্তাব সমর্থন করিলেন। ইতিমধ্যে পূর্ব-বাংলার ৯২-ক ধারা তুলিয়া পার্লামেন্টারি সরকার পুনঃ প্রতিষ্ঠার আলোচনা শুরু হওয়ায় প্রধানমন্ত্রিত্ব লইয়া কৃষক-শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেশ তীব্র হইয়া উঠিয়াছিল। হক সাহেবকে কেন্দ্রীয় সরকার দেশদ্রোহী ঘোষণা করায় এবং তিনি রাজনীতি হইতে অবসর গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই আশা হইয়াছিল যে প্রধান। মন্ত্রিত্ব তাঁদের হাতেই আসিবে। মন্ত্রিত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গবর্নর-জেনারেল গোলাম মোহাম্মদই সর্বময় কর্তা, এটা ছিল জানা কথা। অতএব যুক্তফ্রন্টের পক্ষ হইতে যিনি গবর্নর-জেনারেলের গলায় মালা দিবেন, কার্যতঃ যুক্তফ্রন্টের নেতা হিসাবে তিনিই মন্ত্রিসভা গঠনে আহুত হইবেন। এ ধারণায় নেতাদেরে পাইয়া বসিল।
