খুব বিশ্রী ও অভদ্রভাবে ৯২-ক ধারা জারি হইয়াছিল। একথা না বলিয়া উপায় নাই। ১২-ক ধারা জারি করিবার সংগে-সংগে অন্যতম মন্ত্রী আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি শেখ মুজিবুর রহমানকে সরকারী মন্ত্রিভবন হইতে গেরেফতার করা হইল। আমাদের বাড়ি হইতে সরকারী গাড়ি টেলিফোন পিয়ন চাপরাশী গার্ড সবই তুলিয়া নেওয়া হইল। সুপ্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ এই যে মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পরও পনর দিন মন্ত্রীরা সরকারী বাড়িতে থাকিতে এবং সমস্ত সুবিধা ওঅধিকার ভোগ করিতে পাবেন। কিন্তু আমাদের বেলা তা করা হইল না। পরদিন সকালে উঠিয়া আমরা একেবারে মাঠে মারা যাইবার উপক্রম হইলাম। আগের দিন, যারা সরকারী উর্দি-পরা সরকারী প্রহরি-বেষ্টিত অবস্থায় সরকারী গাড়িতে চলাফেরা করিতেছিলাম, তারাই পরদিন ঈদের মাঠে গেলাম কয়েক মাইল রাস্তা হাঁটিয়া। কারণ মন্ত্রি-ভবনের মত বড়লোকের এলাকায় রিকশা পাওয়ার উপায় নাই। এজন্য আমি কোনও দুঃখ করিলাম না। কেন্দ্রীয় সরকার যেরূপ ভীত-চকিত অবস্থায় এই ৯২-ক ধারা প্রবর্তন করিয়াছিলেন তাতে তাঁরা যে রাতের বেলাই আমাদিগকে সরকারী ভবন হইতে ধাক্কাইয়া বাহির করিয়া দেন নাই, অথবা আমাদের পিঠের নিচে হইতে সরকারী খাট-পালং এবং আমাদের পাছার নিচে হইতে চেয়ার-সোফা টানিয়া নেন নাই, এজন্য আমি মনে-মনে কেন্দ্রীয় সরকারকে ধন্যবাদ দিলাম। চৌধুরী খালিকুযযামানকে গবর্নরি হইতে এবং হাফিয ইসহাককে চিফ সেক্রেটারিগিরি হইতে যেভাবে জরুরী তারের আগায় বরতরফ করিলেন এবং গবর্নর রূপে মেজর-জেনারেল ইসকান্দর মির্যা এবং চিফ সেক্রেটারি রূপে মিঃ এন, এম. খ যেরূপ তলোয়ার ঘুরাইতে-ঘুরাইতে ভারতের আকাশ-বাতাস কম্পিত করিয়া ‘ধর-ধর-মার-মার’ বলিতে-বলিতে পূর্ব-বাংলার দিকে বাতাসের আগে ছুটিয়া আসিতেছিলেন, তাতে সকলেরই বোধ হয় মনে হইয়াছিল তাঁর পূর্ব-বাংলার বিদ্রোহ দমন করিতেই আসিতেছেন। নব-নিযুক্ত গবর্নর ইসকান্দর মির্যা ভারতের বুকে দৌড়াইতে-দৌড়াইতেই ঘোষণা করিলেন : ‘ভাসানীকে আমি গুলি করিয়া হত্যা করিব।‘ বলা আবশ্যক মওলানা ভাসানী তখন পূর্ব-বাংলায় ছিলেন না। তিনি বর্ধিত হক মন্ত্রিসভার শপথের পরেই বিশ্বশান্তি সম্মিলনে যোগ দিবার জন্য সুইডেনের রাজধানী স্টকহমে চলিয়া গিয়াছিলেন।
১১. নেতৃত্বের দুর্বলতা
পরদিন বেলা দুইটায় সিমসন রোডস্থ যুক্তফ্রন্ট অফিসে যুক্তফ্রন্ট পার্টির এক সভা ডাকা হইল। উক্ত সভায় যাইবার জন্য আমরা জনাব আবু হোসেন সরকারের সরকারী বাড়িতে সমবেত হইলাম। পদচ্যুত মন্ত্রীদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া আর সকলে এবং প্রায় শ-দেড়েক এম, এল, এ, ঐ সভায় সমবেত হইলাম। সমবেত মেম্বরদের মধ্যে কেউ-কেউ জানাইলেন যে যুক্তফ্রন্ট আফিস পুলিশে ঘেরাও করিয়াছে। পার্টির লিডার হক সাহেবকে সভায় আসিতে দেওয়া হইতেছে না। ব্যাপার জানিবার জন্য মিঃ আবদুস সালাম খাঁ ও আমি একটি বেসরকারী জিপে চড়িয়া সিমসন রোডে গেলাম। গেটে পুলিশ আমাদের পথরোধ করিয়া দাঁড়াইল। একজন অফিসার আসিয়া আমাদিগকে জানাইলেন : যুক্তফ্রন্ট আফিস তালাবদ্ধ করা হইয়াছে। এখানে কোনও সভা করিতে দেওয়া হইবে না। যতদূর মনে পড়ে, ঐ অফিসারটি হোম ডিপার্টমেন্টের একটি আদেশনামাও আমাদিগকে দেখাইয়াছিলেন।
আমরা ফিরিয়া আসিয়া অবস্থা রিপোর্ট করিলাম। তখন সর্বসম্মতিক্রমে ঐ ইনফরম্যাল মিটিংকেই যুক্তফ্রন্টের ফরম্যাল মিটি ঘোষণা না হইল। লিডার উপস্থিত না থাকায় এবং পার্টির কোনও ডিপুটি লিডার না থাকায় সর্বসম্মতিক্রমে চৌধুরী আশরাফুদ্দিন আহমদ সভাপতি নির্বাচিত হইলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের এই অনিয়মতান্ত্রিক ৯২-ক ধারা প্রবর্তনের নিন্দা করিয়া, পার্টি-লিভারকে নষবশী ও অন্যতম মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে গেরফতার করার তীব্র প্রতিবাদ করিয়া সর্ব সম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হইল। অতঃপর কর্মপন্থা হিসাবে কেন্দ্রীয় সরকারের এই আদেশ অমান্য করিয়া ভূতপূর্ব মন্ত্রিগণের এবং এম, এল, এ. গণের সমবেতভাবে কারাবরণ করার প্রশ্ন আলোচিত হইল। এই কর্মপন্থায় অধিকাংশের সমর্থন দেখা গেল। এই সংগ্রামে পার্টি-লিডারের নেতৃত্বের আশায় তার সাথে সাক্ষাৎ করা হির হইল। প্রস্তাবিত সংগ্রামে পার্টিকে নিয়ন্ত্রিত করিবার জন্য মৌঃ আতাউর রহমান খ, মৌঃ কফিলুদ্দিন চৌধুরী ও মোঃ আবদুল লতিফ বিশ্বাসকে লইয়া একটি সূতোর বোর্ড গঠন করা হইল। সভা চলিতে থাকা অবস্থায় এখানেও পুলিশের হামলা হইল। পুলিশ অফিসাররা আমাদিগকে তৎক্ষণাৎ ঐ স্থান ত্যাগ করিতে নির্দেশ দিলেন।
সভা ভাংগিয়া গেল। আমরা বেশ কয়েকজন তখন হক সাহেবের সঙ্গে দেখা করিয়া সমস্ত অবস্থা ও আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানাইলাম এবং আইন অমান্যে। আমাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করিতে অনুরোধ করিলাম। আমরা তাঁকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম যে তাঁর নেতৃত্বে যদি আমরা মন্ত্রীরা এবংসমবেত শ দেড়েক এম, এল, এ. জেলে যাই, তবে কেন্দ্রীয় সরকার এক সপ্তাহ কালও ২-ক ধারা চালু রাখিতে পারিবেন না। সপ্তাহ পার না হইতেই কেন্দ্রীয় সরকার হক মন্ত্রিসভাকে পুনর্বহাল করিবেন আর জনগণ আমাদিগকে জেলগেটে মাল্য-ভূষিত করিয়া মিছিল করিয়া সেক্রেটারিয়েটে লইয়া আসিবে।
