৬. প্রচারকার্য শুরু
যুক্তফ্রন্টের প্রচারে গোড়ার দিকে কোনও সিস্টেম ছিল না। হক সাহেব ও ভাসানী সাহেবের ব্যক্তিগত সফরসূচিই ছিল যুক্তফ্রন্টের একমাত্র রসা। এই উভয় নেতার জনপ্রিয়তা ছিল এই সময় আকাশচুী। ফলে তাতেই আমাদের কাজ এরূপ চলিয়া যাইত। কিন্তু নিশ্চিত হইবার উপায় ছিল না। তার কারণ ছিল দুইটি প্রথমত জনমত তখনও তেমন সুস্পষ্ট রূপ ধারণ করে নাই। দ্বিতীয়তঃ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার মোহাম্মদ আলী ও প্রাদেশিক প্রধানন্ত্রী নুরুল আমিন সাহেব মুসলিম লীগ কমী-বাহিনী ও গ্রীন শাট নামক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী লইয়া প্রচারে নামিয়াছেন। তার উপর আই. জি. ডি. আই. জি, জিলা ম্যাজিস্ট্রেট কমিশনাররাও তাঁদের কী বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী স্পেশিয়াল ট্রেনে দেশ ভ্রমণ ও প্রচার শুরু করিয়াছেন। কায়েদে-আষমের ভগিনী মোহমো মিস ফাতেমা জিন্নাহু, মওলানা এহতেশামূল হক থানবীর নেতৃত্বে পশ্চিম পাকিস্তানের বড়-বড় আলেম পাকিস্তানের সংহতি ও ইসলামের নামে প্রচারে বাহির হইয়াছেন। এ অবস্থায় চুপ করিয়া বসিয়া থাকা যায় না।
শহীদ সাহেব সিস্টেমেটিক প্রচারের কর্মপন্থা নির্ধারণ করিলেন। পশ্চিম পাকিস্তান হইতে সীমান্ত-গান্ধী খান আবদুল গফফার খাঁ, নবাবদা নসর, শেখ হিসামুদিন, গোলাম মোহাম্মদ খা, সূন্দোর মাহমুদুল হক ওসমানী, মিয়া ইফতেখারুদ্দিন প্রভৃতি বই নেতা আনিলেন। তাঁদের সকলের সুনির্দিষ্ট সফর-তালিকা করিলেন। সেই তালিকা ঠিক-ঠিক মত পালন করিয়া শহীদ সাহেব এই নেদেত্রে লইয়া প্রচারে বাহির হইলেন। আমার জিলা ময়মনসিংহ উতয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ টার্গেট ছিল বলিয়া শহীদ সাহেবও এ জিলার প্রতি বিশেষ মন দিলেন। সব নেতাদের লইয়া তিনি এ জিলায় আসিলেন। আমার গরীবখানায় মেহমান হইলেন। ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করিতেছি দুইটি কারণে। প্রথমত, সীমান্ত পার খা ও আওয়ামী নেতা গোলাম মোহাম্মদ সুলখোরের প্রচারধারার তারিফ করিতে হয়। উভয় নেতা বিশেষতঃ গফফার খার পাঠানী ‘অশুদ্ধ’ উর্দু বাংগালী শ্রোতাদের খুবই সহজবোধ্য হইয়াছিল। তাঁর ভাংগা উর্দু আমাদের পাড়াগাঁয়ে মুসলিম জনতার যুক্তফ্রন্টের ভূমিকা যবানের প্রায় কাছাকাছি ছিল। সে ভাষায় তিনি যে সব কথা বলিয়াছিলেন, পূর্ব বাংলার শেষিত জনগণের প্রতি দরদে-রা ছিল সে সব উক্তি। এই কারণে তাঁর বক্তৃতায় জনগণের প্রতি অমন আবেদন ছিল। অন্যান্য উর্দু বক্তাদের সাথে সীমান্ত গান্ধীর পার্থক্য ছিল এইখানে। দ্বিতীয়তঃ এই উপলক্ষে আওয়ামী লীগাররা বিশেষতঃ আমি নিজে সীমান্ত-গান্ধীর পাখতুনিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত ও খুটি-নাটি প্রশ্ন করি। উত্তরে তিনি স্পষ্টই বলেন যে তাঁর দাবি, সীমান্ত প্রদেশের জাতি-গোত্রহীন ও অপমানকর নাম বদলাইয়া তার একটা জাতিভাষাগত নাম দেওয়া। যথা : বেলুচিস্তান, সিন্ধু, পাঞ্জাব ও বাংলা। এই প্রদেশের লোক পুত য় পাখতুন ভাষা– ভাষী বলিয়া তার নাম হওয়া উচিৎ পাতুনিস্তান। তাঁর দ্বিতীয় দাবি, ঐ প্রদেশ বায়ত্তশাসিত হইবে। পাকিস্তানের প্রদেশ হিসাবেই সে পাখতুনিস্তান থাকিবে। পাকিস্তানের বাইরে স্বাধীন রাষ্ট্র বা আফগানিস্তানের অংগ হিসাবে পাখতুনিস্তানের কনা তিনি কোনও দিন করেন নাই। কথাটা আমরা বিশ্বাস করিয়াছিলাম। ১৯৪৮ সালে করাটিতে পাকিস্তান গণ-পরিষদে দাঁড়াইয়া তিনি এই কথাই বলিয়াছিলেন : সে কথাও আমার মনে পড়িল। আমি কলিকাতায় বসিয়া ‘ইত্তেহাদের’ সম্পাদকীয় প্রবন্ধে তাঁর এই দাবি সমর্থন করিয়াছিলাম, সে কথাও আমার স্মৃতি-পটে উদিত হইল। পরবর্তীকালে শহীদ সাহেব গফফার খাঁর এই দাবি সমর্থন করিয়াছিলেন। ১৯৫৫ সালে মারিতে দ্বিতীয়গণ-পরিষদের প্রথম বৈঠক উপলক্ষে খান আবদুল গফফার খা তৎকালীন আইন মন্ত্রী আমাদের নেতা শহীদ সাহেবের সাথে আমাদের উপস্থিতিতে যে আলাপ করিয়াছিলেন, তাতেও এই দাবিরই তিনি পুনরাবৃত্তি করিয়াছিলেন। এই দাবির সমর্থনে ১৯৫৬ সালে শাসন বিলে আমি সীমান্ত প্রদেশের নাম পাঠানিস্তান করিবার সংশোধনী দিয়াছিলাম। পক্ষান্তরে মুসলিম লীগ নেতারা গফফার খাঁর বিরুদ্ধে কি বিভ্রান্তিক প্রচারণাটাই না করিয়াছিলেন এবং আজও করিতেছেন।
এইভাবে সীমান্ত গান্ধীর রাজনীতি সম্বন্ধে আমাদের কর্মীদের অনেক ভ্রান্ত ধারণা হইয়াছিলভার ফলে তাঁর প্রচারকার্য যুক্তফ্রন্টের খুবই কাজে লাগিয়াছিল।
৭. জনগণের সাড়া
যাহোক হক-ভাসানী-সুহরাওয়ার্দীর সমবায়ে দেশময় যে প্রাণ-চাঞ্চল্যের বন্যা আসিল, তাতে মুসলিম লীগের মত ক্ষমতাসীন দল ভাসিয়া গেল। ফল যে এমন হইবে, পনর দিন আগেও আমি তা বুঝিতে পারি নাই। জনগণের উৎসাহ পল্লীগ্রামের নারীজাতির মধ্যেও ছড়াইয়া পড়িল। আমার নিজের এলাকায় দেখিয়াছি পর্দা রক্ষা করিয়াও দলে-দলে মেয়েরা ভোট-কেন্দ্রে আসিয়াছে। পর্দা রক্ষার জন্য তারা এইরূপ অভিনব ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়াছে। চারজন যুবক একটা মশারির চার কোণা ধরিয়াছে। পনর বিশজন মেয়ে-ভোটার এই মশারির নিচে খিচি-বিচি করিয়া ঢুকিয়াছে। তারপর মশারি চলিয়াছে। মশারির মধ্যে মেয়েরা চলিয়াছে। প্রতি গ্রাম হইতে। মিছিল করিয়া ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসিয়াছে। কাগ ও বাঁশের খাবাসি দিয়া যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন-প্রতীক বিশাল আকারের নৌকা বানাইয়া লইয়াছে জনসাধারণ নিজেরাই। সেই নৌকা কাঁধে করিয়া ‘যুক্তফ্রন্ট যিন্দাবাদ’ ‘ইক-ভাসানী বিন্দাবাদ’ যিকির দিতে-দিতে তারা ভোটকেন্দ্রে আসিয়াছে। এতে ভোটর ফলাফল আগেই বুঝা গিয়াছিল। তোটাররা এই ভোট-যুদ্ধকে একটা পবিত্র জেহাদ মনে করিয়াছে। কাজেই সকলেই এটাকে নিজের কাজ মনে করিয়াছে। পয়সা দিয়া, তয় বা লোভ দেখাইয়া কাইতে হয় নাই। শুধু যুক্তফ্রন্টকে ভোট দেওয়াই তারা পবিত্র কর্তব্য মনে করে নাই। অপর পক্ষে ভোট দেওয়াকে তারা জনগণের দুশমনি মনে করিয়াছে। আমার নিজের-দেখা একটা সত্য ঘটনা বলি। আমার প্রতিদ্বন্দী মুসলিম লীগ-প্রার্থী ছিলেন আমার সোদর-এতিম বন্ধু ও আত্মীয় ‘আজাদ’-সম্পাদক জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দিন। ভোটার ও জনগণের এই মতিগতি দেখিয়া আমরা উভয়েই বুঝিলাম, শামসুদ্দিন সাহেবের যামিন বাযেয়াফত হইয়া যাইতেছে। উতয়ে একত্রে তাঁর যামিনের টাকা বাঁচাইবার চেষ্টা করিলাম। উভয়ে এক গাড়িতে উঠিলাম। ভোটার ও ওয়ার্কারদেরে বুঝাইলাম। কিছু ভোট শামসুদ্দিন সাহেবকে দিয়া তাঁর যামিনের টাকা বাঁচানো দরকার। শামসুদ্দিন সাহেবের টাকা ত আমাদেরই টাকা। শামসুদ্দিন সাহেবের টাকা বাঁচাইতে কারও আপত্তি ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হইল, মুসলিম লীগকে ভোট দিতে হয় যে। ও-কাজ করিতে ত কেউ রাযী না। কাজেই শামসুদ্দিন সাহেবের যামিন বাযেয়াফত হইল। মোট একত্রিশ হাজার রেকর্ডেড ভোটের মধ্যে তিনি পাইলেন মাত্র যোল শ। এটা শুধু আমার এলাকার কথা নয়। পূর্ব-বাংলার সর্বত্রই এই অবস্থা। যুক্তফ্রন্টের এই জয়কে দেশে-বিদেশে অনেকেই ব্যালট-বাক্সে—’বিপ্লব’ আখ্যায়িত করিয়াছেন। দেশের জনগণ স্বেচ্ছায়, নিজেদের টাকায়, বাজি পোড়াইয়া আনন্দ-উৎসব করিয়া মিছিল বাহির করিয়া স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস করিয়াছে। নূরুল আমিন-বিজয়ী খালেক নেওয়াযকে লইয়া ঢাকা শহরবাসী যে অভাবনীয় অভূতপূর্ব মিছিল করিয়াছিল, তার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। যুক্তফ্রন্টের তিন-নেতার এক নেতা শহীদ সাহেবকে করাচিছে যে রাজকীয় সম্বর্ধনা দেওয়া হইয়াছিল, মুসলিম লীগের মুখপত্র ‘ডনের’ ভাষায় ইহা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দিনে কায়েদে আযমের সম্বর্ধনার চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না। করাচির নাগরিকদের এই সম্বর্ধনা শুধু পূর্ব-বাংলার স্বার্থে দেওয় হয় নাই। করাচিবাসী পূর্ব-বাংলার জনগণের এই বিজয়কে নিশ্চয়ই গণতার জয় মনে করিয়াছিল। জনগণের এই জয়ের প্রতীক হিসাবেই শহীদ সাহেবকেরাচি এই সম্বর্ধনা দিয়াছিল। নইলে করাচির স্থায়ী বাশো শহীদ সাহেবকে নিজের ঘর এই সম্বর্ধনা দেওয়ার কোনও যুক্তি ছিল না।
