৮. দুর্বলতার বীজ
কিন্তু ভোটারদের এই আশা ও আস্থার মর্যাদা নেতারা দিতে পারিলেন না। লিডার নির্বাচনের দিন হইতেই, বরঞ্চ আগে হইতেই, আমাদের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। এই ফাটল রোধ করার চেষ্টা একমাত্র শহীদ সাহেব ছাড়া আর কেউ করেন নাই। সে কথাটাই এখানে বলিতেছি।
কৃষক-শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে, আরও নির্দিষ্ট করিয়া বলিলে হক সাহেব ও শহীদ সাহেবের মধ্যে মনের অমিল আগে হইতেই ছিল। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী মনোনয়নে সে বিরোধ ক্রিয়া করিয়াছিল আরও প্রসারিত রূপে। কারণ এই দুই মহান নেতার নিচে উভয় দলের আরও অনেক নেতা ছিলেন। নিজ-নিজ দলীয় স্বার্থ-বোধ তাঁদের ব্যবহারে ও কাজে-কর্মে নিশ্চয় প্রতিফলিত হইয়াছিল। এটা দানা বাঁধে লিডার নির্বাচন উপলক্ষ করিয়া। যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী নির্বাচিত হইয়াছিলেন মোট ২২৮ জন। এঁরা সকলেই মুসলমান। যুক্তফ্রন্ট শুধু মুসলিম আসনই কনটেস্ট করিয়াছিল। ২৩৭টি মুসলিম সিটের মধ্যে ২২৮টিই দখল করিয়াছিল। এই ২২৮টির মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৩, কৃষক-শ্রমিক ৪৮, নেযামে-ইসলাম ২২, গণতন্ত্রী ১৩ ও খিলাফতে রবানী ২ জন পাইয়াছিল। নিযামে-ইসলাম দল কার্যতঃ হক সাহেবের পৃষ্ঠপোষিত দল বলিয়া তাকেও কে. এস. পি. দল বলা যাইতে পারিত। কাজেই হক সাহেবের নিজ মেষর ছিলেন ৭০ জন। গণতন্ত্রী ও ররাণী পার্টির সদস্যরা প্রোগ্রামের ভিত্তিতে উভয় দলের মধ্যে ব্যালান্স রাখিবেন, এটা বুঝা যাইতেছিল।
১৯৫৪ সালের ২রা এপ্রিল লিডার নির্বাচনের দিন নির্ধারিত হইল। আগের রাত্রে আওয়ামী লীগ দলীয় মেম্বরদের একটি ইনফর্মাল বৈঠক হইল সিমসন রোডস্থ যুক্তফ্রন্ট অফিসে। ঐ সভায় তরুণ মেম্বরদের অনেকেই প্রায় একবাক্যে শহীদ সাহেবকে এইরূপ পরামর্শ দেনঃ লিডার নির্বাচনের আগেই হক সাহেবকে মন্ত্রি-সভার তালিকা প্রস্তুত ও পোর্টফলিও ভাগ করিতে হইবে। গবর্নরের নিকট একটি চিঠির আকারে ঐরূপ তালিকা করিয়া তাতে হক সাহেবের দস্তখত দিতে হইবে। তার তিটি কপি হইবে। একটি হক সাহেবের ও অপরটি ভাসানী সাহেবের নিকট থাকিবে। তৃতীয়টি গবর্নরের নিকট দাখিল করিবার জন্য শহীদ সাহেবের হাতে থাকিতে হইবে। এই দলিলে দস্তখত না হওয়া পর্যন্ত হক সাহেবকে লিডার নির্বাচন করা হইবেনা। কথাগুলি অবশ্য একসঙ্গে বলা হয় নাই, একজনও বলেন নাই। সকলে মিলিয়া বলিয়াছিলেন, কথায়-কথায় উঠিয়াছিল। কিন্তু শহীদ সাহেব এক কথায় ওদের সকলের সকল প্রস্তাব উড়াইয়া দিলেন। তিনি বলিলেন : জনগণ হক সাহেবকে আগেই লিডার নির্বাচন করিয়া রাখিয়াছে। মেম্বররাও সেই ওয়াদা করিয়া ভোট আনিয়াছেন। এখন আর তাঁর উপর কোনও শর্ত আরোপ করা চলে না। করিলে এটা হইবে হদ্দ বেইমানি। প্রস্তাবকরা অবশ্যই বলিলেন : তাঁরা সত্যসত্যই হক সাহেবকে ছাড়া অন্য কাউকে লিডার নির্বাচন করিতে চান না। শুধু চাপ দিয়া একটা সর্বদলীয় উঁচুস্তরের মন্ত্রিসভা গঠন করিতে চান। তাঁরা বলিলেন : বিনাশর্তে হক সাহেবকে স্বাধীনভাবে ছাড়িয়া দিলে লিডার নির্বাচিত হওয়ার সংগে-সংগে তিনি তাঁর পার্শ্ব চরদের দ্বারা বিপথে পরিচালিত হইবেন। শহীদ সাহেব ভাসানী সাহেব একত্রে চেষ্টা করিয়াও হক সাহেবকে আর ওদের খপ্পর হইতে বাঁচাইতে পারিবেন না। হক সাহেবের রাজনীতিক জীবনের ইতিহাস হইতে তাঁরা একাধিক নয়ির দিলেন। তাঁদের যুক্তি শহীদ সাহেবের মনঃপুত হইল না। তিনি এসব যুক্তিকে সন্দেহ-পরায়ণ ক্ষুদ্র মনের পরিচায়ক বলিলেন। তিনি আশ্বাস দিলেন, অতীতে যাই হইয়া থাকুক, জীবন সন্ধ্যায় হক সাহেব আর ভুল করিবেন না। যাঁরা শহীদ সাহেবের আশ্বাস মানিলেন, তাঁরা চুপ করিলেন। যাঁরা করিলেন না, শহীদ সাহেব ধমকাইয়া তাঁদের চুপ কইলেন। তিনি আরও বলিলেন, কোনও ক্রমেই মন্ত্রিসভা গঠনে বিঘ্ন সৃষ্টি করা উচিৎ নয়। কারণ সাত-আট দিন আগে (২৩শে মার্চ) চন্দ্রঘোনা কাগযের কলে বাংগালী ও উর্দুভাষী শ্রমিকদের মধ্যে এক রক্ষক্ষয়ী দাংগা হইয়া যাওয়ায় গবর্নর চৌধুরী খালিকুযমান হক সাহেবকে তাড়াতাড়ি মন্ত্রিসভা গঠনের তাকিদ দিতেছেন। ভাসানী সাহেব এ ব্যাপারে কিছু বলিলেন না। তরুণদের প্রস্তাব গৃহীত হইল না। তাঁদের প্রায় সার্বজনীন অসন্তোষের মধ্যে অনেক রাত্রে সভা ভংগ হইল।
৯. ভাংগন শুরু
পরদিন ২রা এপ্রিল মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে যুক্তফ্রন্ট পার্টির প্রথম অধিবেশন হইল। সর্বসম্মতিক্রমে হক সাহেব লিডার নির্বাচিত হইলেন। শহীদ সাহেব তাঁকে মোবারকবাদ দিলেন। মওলানা সাহেব মোনাজাত করিলেন। ডিপুটি-লিডার, সেক্রেটারি, হুইপ প্রভৃতি আর কোনও কর্মকর্তা নির্বাচন না করিয়া শুধু গণ-পরিষদ সম্পর্কে একটি প্রস্তাব পাস করিয়াই সভা ভংগ হইল।
আওয়ামী লীগের তরুণ এম, এল, এ.-রা যা আশঙ্কা করিয়াছিলেন, তাই হইল। মন্ত্রিসভা গঠন লইয়া হক সাহেবের সাথে শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেবের মতান্তর হইল। এই মতান্তর শুধু দূর্ভাগ্যজনক ছিল না, এজাজনকও ছিল। কারণ এ মতান্তর পজিসি লইয়া হয় নাই, হইয়াছিল মন্ত্রিত্ব লইয়া। সে মতভেদও মাত্র দুইদলের দুইজন তরুণের মন্ত্রিত্ব লইয়া। যে দশ-এগার জন সিনিয়র পলিটিশিয়ান লইয়া হক মন্ত্রিসভা গঠিত হইবে, হক সাহেবের নেতৃবৃন্দের ও এম. এল. এ.-দের, এমনকি জনসাধারণের, তা একরূপ জানাই ছিল। যে দুইজন তরুণের মন্ত্রিত্ব লইয়া মতভেদ শুরু হয়, তার একজন কৃষক-শ্রমিক পার্টির, অপর জন আওয়ামী লীগের। একজন হক সাহেবের প্রিয়পাত্র, অপরজন শহীদ সাহেবের। হক সাহেব পার্টিলিডার নির্বাচিত হওয়ার পরেই তাঁর বাড়িতে তিন-নেতার যে বৈঠক হয়, এতেই এই বিরোধ দেখা দেয়। হক সাহেব তাঁর লোকটির নাম প্রস্তাব করায় শহীদ সাহেবও তাঁর লোকটির নাম করেন। এটা ছিল নিছক বিদাশিদির ব্যাপার। নইলে শহীদ সাহেবের লোকটিকে মন্ত্রী করার ইচ্ছা শহীদ সাহেবের নিজেরই ছিল না। বস্তুতঃ ঐ দিনই সকালের দিকে কিছু সংখ্যক আওয়ামী লীগ-কমী ঐ লোককে মন্ত্রী করার দাবি করাতে শহীদ সাহেব কমীদেরে ত ধমকাইয়া দেনই, উপরন্তু তাঁর প্রিয়পাত্রটিকেও ধমকাইয়া দেন। তাঁকে বলেন যে তিনিই ঐসব ছেলে-ছোকরা যোগাড় করিয়া আনিয়াছেন। তিনি অবশ্যই প্রতিবাদ করেন। কিন্তু শহীদ সাহেব সে প্রতিবাদে বিশ্বাস করেন নাই। যা হোক শহীদ সাহেব তাঁকে এই বলিয়া সান্তনা দিয়া বিদায় করেন যে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি করা তিনি আগে হইতেই ঠিক করিয়া রাখিয়াছেন। শহীদ সাহেব উপস্থিত সকলের সামনেই তাঁকে ভালরূপে বুঝাইয়া দেন যে ঐ কাজে তাঁর দুইটা উদ্দেশ্য রহিয়াছে। প্রথমতঃ হক সাহেবের মত অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান ও এডমিনিস্ট্রেটরের সাথে কাজ করিয়া তিনি অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করিতে পারিবেন। দ্বিতীয়তঃ হক সাহেবকে দিয়া আওয়ামী লীগ সংগঠনের এবং নির্বাচন-প্রতিশ্রুতি পালনের তাতে অধিকতর সুবিধা হইবে। শহীদ সাহেবের এই সারবান যুক্তিতে আমরা সকলেই খুশী হইয়াছিলাম। তিনিও শহীদ সাহেবের উপদেশ মানিয়া লইয়াছিলেন।
