৪. জনগণ ও শাসক-শ্রেণী
অফিসারদের বেতনের সংগে তুলনায় যে মন্ত্রিবেতন দৃষ্টিকটু মর্যাদাহানিকর রূপে কম হইয়া পড়ে, সেটাও আমার বিবেচনার মধ্যে ছিল। আইন ও শাসনতান্ত্রিক বাধা হেতু ২১দফায় তার উল্লেখ করা হয় নাই। আমাদের দেশের শাসন-খরচা বেশি। এ সম্বন্ধে দুইমত নাই। এটাকে বহু বিশেষজ্ঞ মাথা-ভারি শাসনযন্ত্র বলিয়াছেন। রাষ্ট্রের রূপ অবাধ অর্থনীতি বা রাস্তায়ত্ত সমাজবাদ, এসব গুরুতর বিষয়ে তর্ক তুলার স্থানও এটা নয়। তার দরবারও নাই। জনগণের কল্যাণই সকল মতের চরম কথা। তা যদি হয় তবে শেষ পর্যন্ত জনগণের ইচ্ছা-অনুযায়ী সব ব্যবস্থা হইবে এটাও জানা কথা। সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ খতম হইবেই। রাষ্ট্রনায়করা যদি বিদেশী হন তবে এই মিলেনিয়াম বা সত্যযুগ লাভের প্রতিবন্ধকতা হয়। তাই স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ এ যুগের বাণী। রাষ্ট্রনায়করা দুই রকমে বিদেশী হইতে পারেন : (১) ভিন্ন দেশ হইতে আগত বিদেশী; (২) দেশজাত বিদেশী। আমরা ১৯৪৭ সালে প্রথম। শ্রেণীর বিদেশীদের হাত হইতে উদ্ধার পাইয়াছি। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণীর বিদেশীদের হাত হইতে রক্ষা পাই নাই। পাওয়ার ভরসাও দেখিতেছি না। বেশি লম্বা না করিয়া এক কথায় আমি আমার মনোভাব ব্যক্ত করিতেছি। পোশাক-পরিচ্ছদে এবং কথাবার্তায় আমাদের রাষ্ট্রনায়করা আজও বিদেশী। আমাদের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা জজ ম্যাজিস্ট্রেট প্রত্যেকে, আফিস-আদালত সেক্রেটারিয়েট, স্কুল-কলেজ সমস্ত বিভাগের এবং ব্যবসায়ী মহলের প্রায় সকলে, এখনও ইংরেজী শোশাক সগৌরবে পরিতেছেন। দেখিলে কে বুঝিবেন এটা পূর্ব-বা পশ্চিম-পাকিস্তান? জাতীয় পোশাকই জাতির স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে লক্ষণীয় ও উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। একথা সবাই যেন বেমালুম ভুলিয়া গিয়াছেন। যেমন পোশাকে, তেমনি ভাষায়। আমরা কেউ পারত পক্ষে ইংরেজী ছাড়া কথা বলি না। চিঠি-পত্র লিখি না। ইংরেজীকেই আমরা ভদ্রলোকের ভাষা মনে করি। যারা বাংলায় কথা বলি, তারাও পূর্ব-বাংলার ভাষা বলি না। পশ্চিম বাংলার কথ্য ভাষাকেই আমরা ভদ্রলোকের বাংলা মনে করিয়া থাকি। এই অবস্থার দুইটা প্রধান কুফল: (১) আমরা দেশের জনসাধারণ হইতে এমন দূরে থাকিতেছি যে কার্যতঃ আমাদিগকে বিদেশী বলা চলে। (২) আমরা নিজেরা আত্মসম্মান-বোধ হারাইতেছি এবং জনগণের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ সৃষ্টির প্রতিবন্ধকতা করিতেছি। এসব কথা ২১ দফার মন্ত্রি-বেতনের ধারার আলোচনায়। প্রাসংগিক এই জন্য যে যদি দেশের শাসকরা বিদেশী ত্যাগ করিয়া দেশী হন তবে ঐ বেতনই যথেষ্ট মনে হইবে। আমার এখনও দৃঢ় বিশ্বাস, যতই দিন যাইবে ততই এটা সত্য প্রমাণিত হইবে যে ২১ দফা পূর্ব-বাংলার জনগণের মুক্তির সনদ। যুক্তফ্রন্টের এম. এল. এ. অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম (বর্তমানে বাংলা। কলেজের প্রিন্সিপাল) একুশ দফার রূপায়ণ’ নামক যে সুচিন্তিত যুক্তিপূর্ণ বই লিখিয়াছেন, তা পড়িলেই এ বিষয়ে অনেক ভ্রান্ত ও অস্পষ্ট ধারণা দূর হইবে।
৫. যুক্তফ্রন্ট্রে প্রচারে বিলম্ব
যুক্তফ্রন্ট গঠনে গোড়ার দিকে দুই দলের কোনও কোনও উপনেতার মধ্যে কোনও কোনও বিষয়ে মন-কষাকষি হইল। সে মন-কষাকষি দুই প্রধান নেতা হক সাহেব ও ভাসানী সাহেবের মধ্যে সংক্রমিত হইল। ফলে যুক্তফ্রন্টের ভিত্তি পাকা যুক্তফ্রন্টের ভূমিকা হইতে অযথা বিলম্ব হইল। যুক্তফ্রন্ট ভাঙ্গিয়া যায় যায় আর কি? হক সাহেবের সমর্থক ও ভাসানী সাহেবের সমর্থকদের মধ্যে ঢাকা শহরে বেশকিছুটা বিক্ষোভ প্রতিবিক্ষোভও হইয়া গেল। খোদা-খোদা করিয়া শেষ রক্ষা পাইল। শহীদ সাহেবের দূরদশী আত্মত্যাগের ফলেই এটা সম্ভব হইল। হক সাহেব, ভাসানী সাহেব ও শহীদ সাহেবের দ্বারা সুপ্রিম নমিনেটিং বোর্ড গঠিত হইবে এটা স্পষ্টই বোঝা গেল। এতে আওয়ামী-নেতৃত্ব ভারি হইয়া যাইবে, নমিনেশনে কৃষক-শ্রমিক পার্টির প্রতি অবিচার হইবে, প্রধানতঃ এই ধারণার বশেই এই ভুল বুঝাবুঝির শুরু। এই ভুল বুঝাবুঝি দূর করিলেন স্বয়ং শহীদ সাহেব। তিনি বলিলেন : সুপ্রিম পার্লামেন্টারি বোর্ড হইকেন মাত্র দুইজ : হক সাহেব ও ভাসানী সাহেব। তিনি নিজে হইবেন মাত্র ‘গ্লরিফাইড হেডক্লার্ক’। নমিনেশনের ব্যাপারে তিনি হক-ভাসানীর যুক্ত সিদ্ধান্ত মানিয়া লইবেন। শহীদ সাহেবের এ ঘোষণায় সমস্ত ভুল বুঝাবুঝি দূর হইল।
এ সবের দরল যুক্তফ্রন্টের প্রচারকার্য বিলম্বিত হইল। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের সহায় হইলেন আল্লা। মুসলিম লীগের সুবিধার জন্যই বোধ হয় কর্তৃপক্ষ নির্বাচন এক মাস পিছাইয়া দিয়া ফেব্রুয়ারি হইতে ৮ই মার্চ নিয়া গেলেন। এই মূলতবিটা যুক্তফ্রন্টের বরাতে শাপে বর এবং মুসলিম লীগের রাতে বরে শাপ হইল। যুক্তফ্রন্টের সেক্রেটারিদ্বয় : জনাব আতাউর রহমান খী ও চৌধুরী কফিলুদিন যাঁর-তাঁর নির্বাচনী এলাকায় মনোযোগ দিতে বাধ্য হইলেন। হক সাহেব ও ভাসানী সাহেব প্রচার উপলক্ষে মফসসলেই থাকিলেন। আফিস সেক্রেটারি জনাব কমরুদ্দিন আহমদের সাহায্যে শহীদ সাহেব একাই যুক্তফ্রন্টের ‘রিফাইড হেড ক্লার্ক’ রূপে যুক্তফ্রন্ট আফিস জীবন্ত রাখিলেন। প্রার্থীগণের ভিড় তাঁর কাছেই হইতে থাকিল। আহার-নিদ্রা ত্যাগ করিয়া তিনি সত্য-সত্যই চবিশ ঘন্টা প্রার্থীদের দাবি-দাওয়া শুনিতে লাগিলেন। দুই শ সাইত্রিশটি মুসলিম আসনের জন্য এগার শর বেশি মনোনয়ন-প্রার্থী দরখাস্ত করিলেন। এদের প্রত্যেকের এবং তাঁদের সমর্থকদের সকলের সাথে দেখা করা ও তাঁদের কথা শোনা ছিল একটা অমানুষিক দানবীয় ব্যাপার। শহীদ সাহেব এই দানবীয় কাজটিই করিলেন হাসি মুখে। গোসল বাদ দিতে হইল। মোলাকাতীদের সামনেই তিনি গোগ্রাসে মুরগীর আধার ঠাকরাইয়া খাইয়া-খাইয়া দিনের-পর-রাত ও রাতের পর-দিন কাটাইতে লাগিলেন। তথাকথিত সুপ্রিম পার্লামেন্টারি বোর্ড মানে হক সাহেব ওভাসানী সাহেব প্রার্থী মনোনয়নের ধারে-কাছেও আসিলেন না। সব দায়িত্ব বর্তাইল শহীদ সাহেবের কাঁধে। তিনি আওয়ামী লীগ-কৃষক-শ্রমিক দলের প্রায় বিশ জন নেতা লইয়া একটি সিলেকশন বোর্ড করিলেন। বাছাইর কাজ এঁরাই করিলেন। প্রায় সব গুলি বাছাই উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে হওয়ায় নিবিরোধে শহীদ সাহেব এ কাজ করিতে পারিলেন। এক স্তরে প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের ভিড় এড়াইবার জন্য শহীদ সাহেব সিলেকশন বোর্ডের আমাদের সকলকে লইয়া পলাইয়া চৌধুরী হামিদুল হক সাহেবের আন্দর বাড়িতে আশ্রয় লইলেন। সেখানে নন-স্টপ বৈঠকে নমিনেশনের কাজ শেষ করা হইল। সবাই ভালয় ভালয় হইয়া গেল। যদিও হক সাহেব ও ভাসানী সাহেব মফসসলে বসিয়াই এখানে-ওখানে দুই একটা নমিনেশনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিয়া কিছু-কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করিয়াছিলেন, কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু ক্ষতি হয় নাই। দুই এক জায়গায় যুক্তফ্রন্টের অফিশিয়াল নমিনি হারিয়া গেলেও তাতে খাঁটি জন প্রতিনিধিরাই নির্বাচিত হইয়াছিলেন।
