আওয়ামী লীগ-কর্মী হিসাবে এ বিষয়ে আমাদের কর্তব্য নির্ধারণের অন্য আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের অধিবেশন ডাকা অত্যাবশ্যক হইয়া উঠিল। ১৯৫৩ সালের মে মাসে ময়মনসিংহ শহরে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করা হইল। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির ভাষণে আমি যুক্তফ্রন্ট গঠন করার পক্ষে যুক্তি দেই। আবেদন করি। শেষ পর্যন্ত কাউন্সিল কৃষক শ্রমিক পার্টির সাথে যুক্তফ্রন্ট গঠন করার অনুমতি দেয়। অতঃপর হক সাহেব ও ভাসানী সাহেব যুক্তবিবৃতিতে যুক্তফুন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতাহার রচনার ভার আমার উপরই পড়ে। আমি ইতিপূর্বেই আওয়ামী লীগের ৪২ দফার একটি নির্বাচনী ইশতাহার রচনা করিয়াছিলাম। উহাকেই যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতাহার করিবার কথা মওলানা সাহেব বলিলেন। কৃষক-প্রজা পার্টির নেতারা বলিলেন তাঁদের একমাত্র আপত্তি এই যে ঐ ইশতাহারে দফার সংখ্যা বড় বেশি। উহাকে কাটিয়া-ছাঁটিয়া পঁচিশ–ত্রিশের মধ্যে আনিতে হইবে। তাঁদের সংগে আলোচনা করিয়া দেখিলাম যে ৪২ দফাঁকে কমাইয়া ২৮ দফা করিলেই তাঁদের ইচ্ছা পূর্ণ হয়। এর পর বিনা-বাধায় রচনা শেষ করার জন্য আমাকে একলা এক ঘরে বন্দী করা হইল।
২. ২১ দফা রচনা
আমি মুসাবিদায় হাত দিলাম। মুসাবিদা করিতে-করিতে হঠাৎ একটা ফন্দি আমার মাথায় ঢুকিল। এটাকে ইপিরেশন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে চিরস্থায়ী করিবার জন্য শহীদ মিনার নির্মাণ, ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষার সেবাকেন্দ্র করার তিনটি দফা আওয়ামী লীগের ৪২ দফায়ও ছিল। এই তিনটি দফাঁকে যুক্তফ্রন্টের ইশতাহারের অন্তর্ভুক্ত করিতে কৃষক-শ্রমিক পার্টির। নেতারা রাখী হইয়াছেন। সুতরাং তা হইবে। তা হইলে যুক্তফ্রন্টের মতেও ২১শে ফেব্রুয়ারি পূর্ব-বাংলার ইতিহাসে একটা স্মরণীয় দিন। কাজেই ২১ ফিগারটাকে চিরস্মরণীয় করিবার অতিরিক্ত উপায় হিসাবে যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচিকে ২১ দফার কর্মসূচি করিলে কেমন হয়? ৪২ দফা কাটিয়া ২৮ দফা করা গেলে ২৮ দফাঁকে কাটিয়া ২১ দফা করা যাইবে না কেন? নিশ্চয় করা যাইবে। তাই করিলাম। অতঃপর আমার কাজ সহজ হইয়া গেল। ইতিহাস বিখ্যাত ২১ দফা রচনা হইয়া গেল। এই একুশ দফা মেনিফেস্টো পরবর্তীকালে পূর্ব-বাংলার ছাত্র-জনতার জীবন-বাণী হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৮টি আসন দখল করিয়াছিল। শতকরা সাড়ে ১৭টি ভোট পাইয়াছিল। এত বড় জয়ের প্রধান কারণ ছিল এই ২১ দফা। আমি নিজে ছাত্র-তরুণ ও জনগণের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশিয়া বুঝিয়াছি ২১ দফা সত্য-সত্যই তাদের মধ্যে নব জীবনের একটা স্বপ্ন সৃষ্টি করিয়া ছিল। যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব-দোষে কিভাবে এই বিপ্লবাত্মক পার্লামেন্টারি জয়টা নস্যাৎ হইয়াছিল, সে কথা আমি একটু পরে বলিতেছি। যুক্তফ্রন্টের ঐ বিজয় নস্যাৎ হওয়ার পর জনগণের দুশমনরা কিভাবে ২১ দফাঁকেও নস্যাৎ করিতে চাহিয়াছে এবং অনেকখানি সফল হইয়াছে, সে কথাটাই প্রসঙ্গক্রমে ও সংক্ষেপে আমি এখানে বলিতেছি।
৩. ২১ দফার যৌক্তিকতা
২১ দফাঁকে জনগণের শত্রুরা প্রথমতঃ ইউটোপিয়া ও মিথ্যা স্তোক বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। তাঁদের মতে ২১ দফার বেশির ভাগ ওয়াদাই ইম্প্যাকটিকেবল। যুক্তফ্রন্টের নেতারা জানিয়া-শুনিয়াই এইসব মিথ্যা ওয়াদা করিয়াছেন। ভোটারগণকে মিথ্যা স্তোক দিয়া ভোট নেওয়া হইয়াছে। ঐসব ওয়াদা পূরণের ইচ্ছা যুক্তফ্রন্ট নেতাদের ছিল না। দ্বিতীয়তঃ অনেকে বলিয়াছেন যে কি যুক্তফ্রন্টের নেতারা, কি প্রার্থীরা, কি ভোটাররা কেউ ১১ দফার বিষয় সিরিয়াসলি চিন্তাও করেন নাই। ঐসব ওয়াদার মর্ম বুঝিয়া ভোটাররাও ভোট দেয় নাই। প্রার্থীরাও ভোট চাহেন নাই। শুধু মুসলিম লীগ-নেতাদেরে গাল দিয়া এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ডাহা-ডাহা মিথ্যা অভিযোগ করিয়া ভোটারগণকে ভুল বুঝানো ও ক্ষেপানো হইয়াছে। মুসলিম লীগের উপর রাগ করিয়া ভোটাররা এই নিগেটিভ’ ভোট দিয়াছে। এই দুই শ্রেণীর বিরোধী দল ছাড়া যুক্তফ্রন্টের ভিতরেও ২১ দফার বিরোধী অনেকে ছিলেন। এদের কেউ-কেউ ২১ দফার এক হাজার টাকা মন্ত্রি-বেতনের দফাটাকে অবাস্তব এবং সাধারণ নির্বাচনের ছয় মাস আগে মন্ত্রিসভার পদত্যাগের দফাটাকে অতিরিক্ত সাধুতা বলিয়া অভিহিত করেন। ২১ দফার রচয়িতা বলিয়া আমাকেই এদের নিন্দা সহিতে হইত। বিশেষতঃ এক হাজার টাকা মন্ত্রি-বেতনে কি করিয়া চলিতে পারে? যেখানে সরকারী কর্মচারিরা তিন হাজার, হাইকোর্টের জজের চার হাজার টাকা বেতন পান, সেখানে সকল কর্মচারি ও বিচারকের কর্তা মন্ত্রীরা হাজার টাকা বেতনে মান-মর্যাদা ও শান শওকত বজায় রাখিয়া চলিতে পারেন না। আমার মাথার এই সিধা সহজ কথাটা না ঢুকায় তাঁরা নিজেদের মধ্যে আমাকে হয় নির্বোধ নয় একরোখা সোজা কথায় পাগল) বলিয়া অভিহিত করিতেন। কিন্তু প্রকাশ্যভাবে কিছু বলিতেন না। তথাপি তাঁদের মতামত আমার কানে আসিত। আমি তাঁদের অভিমত মন দিয়া বিচার করিয়াছি। কিন্তু আমার মত পরিবর্তনের কোনও কারণ আজও খুঁজিয়া পাই নাই। পূর্ণ-আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন রাষ্ট্রভাষা বর্ধমান হাউস শহীদ মিনার ইত্যাদি সব বিষয়ের দাবি যে নিতান্ত বাস্তব ও যুক্তিসংগত ছিল, কাজের মধ্যে দিয়া ও জনগণের পূর্ণ সমর্থনে আজ তা প্রমাণিত হইয়াছে। শুধু বাকি আছে হাজার টাকা মন্ত্রি-বেতনের দফাটা। জন গণের নির্বাচিত প্রতিনিধি মন্ত্রীদের বেতন কি হইবে, তা বিচার করিবার মাপকাঠি আমার মতে দুইটিঃ (১) জনগণের মাথাপিছু আয়ের অনুপাত; (২) দেশে জীবন যাত্রার সাধারণ মানের অনুপাত। আমার ব্যক্তিগত মত এই যে চালে-চলনে এবং খোরাকে-পোশাকে জাতীয় নেতারা জনগণ হইতে খুব বেশি দূরে থাকিবেন না। আমার এই অভিমত কোনও অস্পষ্ট অনির্দিষ্ট ও অবাস্তব আইডিয়েলিযম নয়। এর বুনিয়াদ গণিতিক ও স্ট্যাটিসটিক্যাল। ভারতের কংগ্রেসী মন্ত্রীরা এবং চীনের ও ভিয়েৎনামের জাতীয় নেতা মাওসেতুং ও হোচিমিনের জীবন-মান ও বেতনই এ ব্যাপারের আদর্শ নযির। আমার দেশবাসীর গড়পড়তা মাথাপিছু আয় কত এবং তাদের সাধারণ জীবন মান কি, এ সম্পর্কে দুই মত হওয়ার উপায় নাই। সরকারী কর্মচারি ও নির্বাচিত প্রতিনিধি প্রভৃতি দেশ-শাসকগণ জনগণের জীবন-মান হইতে কতদূরে যাইতে পারেন, তারও একটা সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রেওয়াজ আছে। এই তিনটি ফ্যাক্টর একত্র করিয়া বিচার করিলে বুঝা যাইবে যে ২১ দফার মন্ত্রি-বেতনের ধারাটা অবাস্তব পাগলামি নয়।
