৮. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
এই অবস্থায় আসিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ক্ষমতাসীন দলের অন্যান্য মারাত্মক ভুলের মত এটাও ছিল একটা মারাত্মক ভুল। সম্ভবতঃ সব চাইতে মারাত্মক। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের মুখের ভাষা রাষ্ট্রভাষা হইবে, এটা বুঝিতে প্রতিভার দরকার ষ্ম না। সবাই এটা বুঝিয়াছিলেন। আমাদের মত ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র কর্মীরা মুখ ফুটিয়া তা বহু আগেই বলিয়াছিলাম। কলিকাতাস্থ পূর্ব-পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি পাকিস্তান সৃষ্টির তিন বছর আগে বাংলার জনগণকে বলিয়াছিল পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষা হইবে বাংলা। তখন অবশ্য লাহোর-প্রস্তাব-মত পূর্ব-পাকিস্তানকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবেই ধরা হইয়াছিল। পাকিস্তান হওয়ার পর ঢাকার শিক্ষক-ছাত্র, যুবক-তরুণরা মিলিয়া তমদুন মজলিসের পক্ষ হইতে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে যে পুস্তিকা বাহির করেন, তাতে অন্যান্যের সাথে আমারও একটা লেখা ছিল। তাতে বাংলাকে সরকারী ভাষা করার দাবি করা হইয়াছিল। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন পূর্ব-বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাযিমের মারাত্মক ভুলে রাষ্ট্রভাষার ব্যাপারটা বিতর্কের বিষয় হইয়া পড়ে, তখনও আমার সভাপতিত্বে কলিকাতাস্থ বংগীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতির এক অধিবেশনে বাংলাকে সরকারী ভাষা করিবার প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাযিমুদ্দিনের প্রতিবাদে ঢাকা শহরে হরতাল হয়। ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এতেও নেতাদের চোখ খুলে না। পাকিস্তানের মেজরিটির ভাষা বাংলাকে অগ্রাহ্য করিয়া উর্দুর ডবল মার্চ চলিতে থাকে। ক্ষমতাসীন দলের পূর্ব-বাংগালী মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা এর প্রতিবাদে বা বাংলার সমর্থনে টু শব্দটি করেন না। এতেই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বিক্ষোভে ফাটিয়া পড়ে। একমাত্র ‘আজাদ’-সম্পাদক ও মুসলিম লীগ দলীয় এম, এল, এ. জনাব আবুল কালাম, শামসুদ্দিন সরকারী নীতির প্রতিবাদে মেম্বরগিরিতে ইস্তাফা দিয়া ছাত্র-তরুণদের প্রশংসা অর্জন করেন।
ময়মনসিংহ জিলায় আন্দোলনকে সম্পূর্ণ অহিংস ও শান্তিপূর্ণ রাখা আমি কর্তব্য মনে করিলাম। আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জনাব হাশিমুদ্দিন আহমদ, আনন্দ মোহন কলেজের তৎকালীন ভাইস-প্রিন্সিপাল সৈয়দ বদরুদ্দিন হোসেন ও আমি এই তিন জনের একটি কমিটি অব-এ্যাকশন গঠন করিয়া সমস্ত ক্ষমতা এই কমিটির হাতে কেন্দ্রীভূত করিলাম। এই কমিটির নির্দেশ ও অনুমোদন ব্যতীত কেউ কিছু করিতে পারিবে না, নির্দেশ দেওয়া হইল। শান্তিপূর্ণ ভাবে হরতালমিছিল ও সভা-সমিতি চলিতে লাগিল। আমলাতন্ত্র উস্কানি দিয়া শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে অশান্ত করিয়া ভোলায় উস্তাদ। আমার জিলা-কর্তৃপক্ষও সে উস্তাদি দেখাইলেন। আমি বাদে কমিটি-অব এ্যাকশনের দুইজন মেম্বরকেই তারা নিরাপত্তা আইনে বন্দী করিলেন। আমার দুই ছেলে মহবুব আনাম ও মতলুব আনাম সহ ২৭ জন কলেজছাত্রকেও ওঁদের সংগে জেলে নিয়া গেলেন। অতি কষ্টে আমি শহরের ছাত্র-জনতার ক্রোধ প্রশমিত করিতে লাগিলাম। কিন্তু মফসসলে এই সংবাদ পৌঁছা মাত্র চারদিক হইতে হাজারে-হাজার লোক শহরে জমায়েত হইল। এই মারমুখী জনতা কোট-আদালত ঘিরিয়া ফেলিল। কর্তৃপক্ষ ঘাবড়াইলেন। শান্তি রক্ষার জন্য এবং জনতাকে নিরস্ত করিবার জন্য আমাকে ধরিলেন। আমি দালানের ছাদে দাঁড়াইয়া মেগাফোন মূখে জনতার উদ্দেশ্যে গলাকাটা বক্তৃতা করিলাম। নিজের পরিচয় দিলাম। শান্তি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও অশান্তির বিপদের কথা বলিলাম। ধৃত নেতা-ছাত্রদেরে খালাস করিবার ওয়াদা করিলাম। আল্লার মেহেরবানিতে জনতার সুমতি হইল। প্রায় তিন-চার ঘন্টা-স্থায়ী বিক্ষোক্সে পরে জনতা শহর ছাড়িয়া চলিয়া গেল।
সরকার ও মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে গণ-মন বিক্ষুব্ধ হইল। আরও দুই বছরে গণ মনের তিক্ততা চরমে নিয়া অবশেষে ১৯৫৪ সালে লীগ-নেতারা সাধারণ নির্বাচন দিলেন। গণ-মন তিক্ত হইলেও এতটা তিক্ত যে হইয়াছে, তা আমি বুঝিতে পারি নাই। বোধ হয় মুসলিম লীগ-নেতারাও পারেন নাই। কাজেই কেন্দ্রে ও প্রদেশে ক্ষমতাসীন দলের সাথে নির্বাচন যুদ্ধে জিতা কঠিন বিবেচিত হইল। সরকার-বিরোধী প্রগতিবাদী সমস্ত শক্তির সম্মিলিত চেষ্টার প্রয়োজন অনুভূত হইল।
১৮. যুক্তফ্রন্টের ভূমিকা
যুক্তফ্রন্টের ভূমিকা
আঠারই অধ্যায়
১. যুক্তফ্রন্ট গঠন
এই সময় জনাব ফযলুল হক সাহেব পূর্ব-বাংলা সরকারের এডভোকেট জেনারেলের চাকুরিতে ইস্তাফা দিয়া রাজনীতিতে প্রবেশ করিলেন। মওলানা ভাসানী ও জনাব শহীদ সুহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে এবং ছাত্র-তরুণদের সক্রিয় সমর্থনে ইতিমধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ খুবই জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হইয়াছে। কাজেই সকলেই আশা করিল হক সাহেব আওয়ামী লীগেই যোগ দিবেন। দু-একটা জনসভায় বক্তৃতায় এবং বিবৃতিতে তিনি তেমন কথা বলিলেনও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি কৃষক-শ্রমিক পার্টি নামে একটি পার্টি গঠন করিলেন। সুতরাং হক সাহেবের সহযোগিতার খাতিরে একাধিক পার্টির সমন্বয়ে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করা ছাড়া উপায় থাকি না। যতই দিন যাইতে লাগিল, ছাত্র-তরুণ প্রভৃতি প্রগতিবাদী চিন্তাশীলদের মধ্যে এবং শেষ পর্যন্ত জনসাধারণের মধ্যে এইরূপ যুক্তফ্রন্ট গঠন করার দাবি সার্বজনীন হইয়া উঠিল।
