৬. আওয়ামী লীগ গঠনে বাধা
কাজেই ১৯৫০ সালে মওলানা ভাসানী ও জনাব শহীদ সাহেব আওয়ামী লীগ সংগঠনে যখন ময়মনসিংহে আসিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিনের ‘লাঠি’ জনাব আবদুল মোনেম খাঁর নেতৃত্বে এ শহরের মুসলিম লীগ কর্মীরা একেবারে ক্ষিপ্ত। ময়মনসিংহে নেতৃদ্বয় আসিতেছেন শুনিয়া অবধি স্থানীয় মুসলিম লীগ কর্মীরা স্বয়ং মোননম খাঁ সাহেবের ব্যক্তিগত নেতৃত্বে মাইকে পোস্টারে এই দুই বয়োজ্যেষ্ঠ শ্রদ্ধেয় নেতার বিরুদ্ধে অশ্লীল কট-কাটব্য শুরু করিলেন। শেষ পর্যন্ত গুণ্ডামি করিয়া আমাদের সভা ভাংগিয়া দিলেন। গুণ্ডামিটা করিলেন অতিশয় ভদ্রভাবে। টাউন হল ময়দানে সভা। ময়দারে একপাশে টাউন হল। অপর পাশে জিলা স্কুল বোর্ডের বিল্ডিং। টাউন হল মিউনিসিপ্যালিটির সম্পত্তি। মুসলিম লীগ-নেতা জনাব গিয়াসুদ্দিন পাঠান মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। জিলা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি জনাব আবদুল মোনেম খাঁ স্কুল বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। এই দুইটি বিলডিং-এ একাধিক মাইক হইতে একাধিক লাউডস্পিকার ফিট করা হইল। সবগুলি লাউডস্পিকারের মুখ সভামুখী করা হইল। মুসলিম লীগ-কর্মীরা দুই দালানের ভিতরে বসিলেন। ভিতর হইতে দরজা-জানালা বন্ধ করিয়া দিলেন। ‘কর্ম’ রু করিলেন। সভার কাজ শুরু হইতেই তাঁরা উভয় দালানের ভিতর হইতে শিয়াল-কুত্তা, গাধা-গরু ও হাঁস-মুরগীর ডাক শুরু করিলেন। চারগুণ মাইক ও লাউডস্পিকার এবং দশগুণ ‘বক্তার’ মোকাবেলায় আমাদের বক্তৃতা কেউ শুনিতে পাইলেন না। জিলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপার সভাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। আমি নিজে তাঁদেরে বারবার অনুরোধ করিলাম সভায় শান্তি স্থাপন করিতে। আমি ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত স্বয়ং শহীদ সাহেবও তাঁদেরে অনুরোধ করিলেন। তাঁরা নন-এলাইনমেন্ট নীতি ঘোষণা করিলেন। সভাস্থ লোকের একদল দেওয়াল বাহিয়া উপরে উঠিয়া দুষ্কৃতিকারীদের লাউডস্পিকার খুলিতে গেল। অপর দল দরজা-জানালা ভাংগিয়া ভিতরে ঢুকিয়া দুষ্কৃতিকারীদেরে নিরস্ত করিতে চাহিল। এই সময় ডি, এম, ও এস. পি. তাঁদের নিরপেক্ষ-নীতি বিসর্জন দিয়া দুস্কৃতি নিরস্তকারীদেরে নিরস্ত করিলেন। আমরা সভার আশা ত্যাগ করিলাম। নেতাদ্বয় সারা শহর পায় হাঁটিয়া জিলা বোর্ডের ডাক-বাংলায় গেলেন। সতার বিরাট অংশ তাঁদের পিছনে-পিছনে ঘটিয়া তথায় জমায়েত হইল। নেতাদ্বয় সংক্ষেপে বক্তৃতা করিলেন। জিলা আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগঠন, কমিটি গঠিত হইল।
৭. একদলীয় শাসন
পূর্ব-বাংলার তৎকালীন রাজনৈতিক আচরণের দৃষ্টান্তের হাজারের মধ্যে এটি একটি। যে সব কারণে পাকিস্তান সৃষ্টির দুই তিন বছরের মধ্যে মুসলিম লীগ ও সরকার জনগণের কাছে অপ্রিয় হইয়া উঠেন, এটি তার অন্যতম। আমি অতঃপর মুসলিম লীগের বন্ধুদেরে অনেক বুঝাইবার চেষ্টা করি। গণতন্ত্র সম্পর্কে বক্তৃতা দেই। তাঁরা হাসেন। বোধহয় আমার সরলতায় ও নির্বুদ্ধিতায়। তাঁদের কর্মীদের কর্ম তৎপরতা বাড়ে। আমার গণতন্ত্রের বুলিকে আমাদের দুর্বলতা মনে করেন জিলার নেতারা।
নেতা ও মন্ত্রীর সাথে আলাপ করিয়া আমি একটা ব্যাপারে বিস্মিত হইলাম। বুঝিলাম, ১৯৪৮ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি গভর্নর-জেনারেল কায়েদে-আযম জিন্না পাকিস্তানের মুসলিম লীগের স্ট্যাটাস ও মর্যাদা সম্পর্কে যে সরকারী প্রেস-নোট জারি করিয়া গিয়াছেন, এঁরা হয় তা জানেন না, নয় ত ভুলিয়া গিয়াছেন, অথবা ইচ্ছা করিয়া চাপিয়া যাইতেছেন।
এই প্রেস-ননটের দিকে বন্ধুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিলাম। ইহার মধ্যে কায়েদে– আযমের দূরদৃষ্টি ও উইযডম নিহিত আছে, এটা অনুসরণ না করিলে মুসলিম-লীগ নেতাদের নিজেদের এবং পরিণামে পাকিস্তানের ক্ষতি হইবে, কত যুক্তি দিলাম। ক্ষমতাসীনরা কখনও নিজেরা না ঠকিয়া শিখেন না। আমাদের নেতারাও শিখিলেন না। মুসলিম লীগকেই একমাত্র পার্টি দাবি করিয়া চলিলেন।
১৯৫০ সালের স্বাধীনতা দিবস-উৎসবে ইন্তেযাম কমিটিতে ডি, এম. মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের সভাপতিদ্বয়কে দাওয়াত করিলেন যাঁর তাঁর প্রতিষ্ঠানের সভাপতি রূপে। আমাকে করিলেন ব্যক্তিগত ভাবে। আমি প্রতিবাদ করিলাম। ডি. এম. মুসলিম লীগ-নেতাদের দোহাই দিলেন। নেতারা বলিলেন। তাঁরা আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। ফলে আমি ইন্তেযাম কমিটিতে যোগ দিলাম না।
পরবর্তী স্বাধীনতা দিবসের ইন্তেযাম কমিটিতে আমাকে আওয়ামী লীগের সভাপতিরূপেই ডাকা হইল। আমি গেলাম। অন্যান্য প্রস্তাবের পর আমি প্রস্তাব করিলাম : আযাদি দিবসের জনসভায় জিলা ম্যাজিস্ট্রেট সভাপতিত্ব করিবেন। বরাবর জিলা মুসলিম লীগের সভাপতি জনসভার সভাপতি হন। আমার যুক্তি এই যে আযাদি দিবসের উৎসব সরকারী অনুষ্ঠান, মুসলিম লীগ-অনুষ্ঠান নয়। সরকারী অনুষ্ঠানকে পার্টি-অনুষ্ঠানে পরিণত করিলে জাতীয় অনুষ্ঠানেরই অমর্যাদা করা হয়।
যুক্তিপূর্ণ হওয়ার দরুনই হোক, অথবা সরকারী কর্মচারিদের সুবিধার খাতিরেই হোক, অধিকাংশ সরকারী কর্মচারি আমার প্রস্তাব সমর্থন করিলেন। বলা আবশ্যক, সরকারী-অনুষ্ঠান বলিয়া ইন্তেযাম কমিটিতে সরকারী কর্মচারিরাই মেজরিটি থাকিতেন। পুলিশ সুপার মিঃ মহিউদ্দিন আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে আমার প্রস্তাব সেকেণ্ড করিলেন। উপস্থিত লীগ-নেতারা গর্জিয়া উঠিলেন। টেলিগ্রামে বদলি করাইবেন বলিয়া ভয় দেখাইলেন। তাঁদের কেউ-কেউ ঘাবড়াইলেনও। অতঃপর ঢাকা ও করাচির অনুষ্ঠানে যথাক্রমে লাট ও বড়লাট সভাপতিত্ব করেন, এই নযির দিয়া ব্যাপারটা গবর্ণমেন্টের কাছে রেফার করিবার সুপারিশ করিলাম। সকলে এতে রাযী হইলেন। পরদিনই সরকারী নির্দেশ আসিল। আমার মতই ঠিক প্রমাণিত হইয়াছে। স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠান এইভাবে মুসলিম লীগের কবলমুক্ত হইল। জিলা মুসলিম লীগ সভাপতির বদলে জিলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে স্বাধীনতা দিবসের জনসভা অনুষ্ঠিত হইল। আওয়ামী লীগ নেতারা বক্তৃতা করিবার সুযোগ পাইলেন। এটাকে স্থানীয় জনগণ আওয়ামী লীগের জয় বলিয়া মানিয়া নিল।
