৩. মুসলিম লীগের ভ্রান্ত-নীতি
মুসলিম-লীগ নেতারা দ্বিতীয় ভুল করিলেন পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করিবার উদ্যোগ না নিয়া। শুধু উদ্যোগ নিলেন না, তা নয়। পাকিস্তানী জাতীয়তা ফুরণে বাধাও দিলেন। ঐতিহাসিক কারণেই ভারতে মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানে কংগ্রেস বন্ধ করিয়া দেওয়া উচিৎ ছিল। রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্যও, সাম্প্রদায়িক প্রীতির জন্যও। বোম্বাই ও মালাবার ছাড়া ভারতের সর্বত্র মুসলিম লীগ ভাংগিয়া দেওয়া হইয়াছিল। পূর্ব-বাংলার কংগ্রেস নেতারাও কংগ্রেস ভাংগিয়া দিতে প্রস্তুত হইয়াছিলেন। মুসলিম লীগ ভাংগিয়া ন্যাশনাল লীগ করা হইলে তাঁরা তাতেই যোগ দিতেন। মুসলিম লীগ বজায় রাখা স্থির হওয়ার আগে পূর্ব-বাংলার শাসকগোষ্ঠীর মনে সত্যই ভয় সান্ধাইয়াছি। কারণ কায়েদে-আযমও ঐ মতের বলিয়া তাঁরা জানিতে পারিয়াছিলেন। হিন্দুরা কংগ্রেস ভাংগিয়া দিলে কায়েদে-আযম ও শহীদ সুহরাওয়ার্দীর নীতি আরও জোরদার হইয়া পড়ে। তাই পূর্ব-বাংলায় মন্ত্রীরা, বিশেষতঃ প্রধানমন্ত্রী খাজা নাযিমুদ্দিন, কংগ্রেস-নেতাদেরে একরূপ ধমকাইয়া কংগ্রেস ভাংগা হইতে বিরত রাখেন। খাজা নাযিমুদ্দিনের কথায় রাযী হওয়ায় মিঃ শ্রীশ চন্দ্র চাটাজীর সাথে মিঃ কামিনী কুমার দত্ত ও মিঃ ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের নেতৃত্বে অনেক কংগ্রেস-নেতার, বিশেষতঃ কুমিল্লা গ্রুপের, মনোমালিন্য হইয়া যায়। এসব কথাই তৎকালে খবরের কাগযে প্রকাশিত হইয়াছিল। আজ এসব ঘটনা স্মরণ করাইবার কারণ এই যে আমি দেখাইতে চাই মুসলিম লীগ-নেতারা নিজেরা পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করিবেন বলিয়াই পাকিস্তানী হিন্দুদের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি করিতে দেন নাই। অথচ মজা এই যে পাকিস্তান-বিরোধী ঐতিহ্য-ওয়ালা কংগ্রেস’ চালাইবার ‘অপরাধে’ পরে হিন্দুদেরে নিন্দাও করিয়াছেন মুসলিম লীগ নেতারাই। যে মনোভাবের দরুন মুসলিম লীগ-নেতারা হিন্দু নেতৃবৃন্দকে কংগ্রেস চালাইয়া যাওয়ার তাকিদ দেন, ‘ঠিক সেই মনোভাবের দরুনই তাঁরা হিন্দু-নেতৃবৃন্দকে পৃথক নির্বাচন-প্রথা দাবি কায় উস্কানি দেন। দেশের বিপুল মেজরিটি হইয়াও নিজেরা পৃথক নির্বাচন-প্রথা দাবি করাটা ভাল দেখায় না; অথচ মুসলিম লীগ-নেতারা পৃথক নির্বাচনের জন্য একেবারে উন্মাদ। কাজেই মাইনরিটি সম্প্রদায় হিন্দুদেরে দিয়া পৃথক নির্বাচন প্রথা দাবি করাইতে পারিলে কাজটা সহজ হয়। এই কারণেই মুসলিম লীগ-নেতাদের এই অপচেষ্টা। হিন্দু নেতৃবৃন্দ অসংখ্য ধন্যবাদের পাত্র এই জন্য যে নিজেরা ক্ষুদ্র মাইনরিটি হইয়াও এবং রুলিং পার্টির দ্বারা উৎসাহ প্ররোচনা এমন কি ওয়ার্নিং পাইয়াও তাঁরা পৃথক নির্বাচন-প্রথা দাবি করিতে রাযী হন নাই।
৪. কায়েদে-আযমের নীতি
এই ধরনের মনোব লইয়াই মুসলিম লীগ-নেতারা পাকিস্তান শাসন পরিচালন শুরু করেন। কাজেই যতই অযৌক্তিক হোক, নিখিল ভারত মুসলিম লীগের নাম গৌরব তার মর্যাদা ও তার জনপ্রিয়তাকে সম্বল করিয়া চলাই তাঁরা স্থির করেন। গণ-মনা কায়েদে-আযম স্পষ্টতঃই এই মতের পরিপোষক ছিলেন না। গণ পরিষদের উদ্বোধনী বক্তৃতায় তিনি তাঁর আদর্শ মতবাদ ও কার্যক্রম স্পষ্ট করিয়াই ঘোষণা করিলেন। শাসকগোষ্ঠীর তাগাদায় তিনি অবশেষে ছয় মাস পরে ১৯৪৮ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগের বৈঠক দেন। বৈঠকটা গোপনীয় হয়। খবরের কাগযের সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। বৈঠক শেষে ২৮শে ফেব্রুয়ারি গবর্নর জেনারেল-ভবন হইতে প্রচারিত পাকিস্তান সরকারের এক প্রেসনোটে বলা হয়? ২১শে ফেব্রুয়ারি ও পরবর্তী কয়েকদিন করাচিতে মুসলিম লীগ কাউন্সিলের যে গোপন বৈঠক হইয়াছে, সে সম্বন্ধে ভুল সংবাদ প্রচারিত হইতেছে। প্রকৃত অবস্থা এই যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাই ছিল নিখিল-ভারত মুসলিম লীগের উদ্দেশ্য। তখন মুসলিম লীগ ভারতের সমস্ত মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব করিয়াছে। দেশ ভাগ হওয়ার পর মুসলিম লীগ এখন একটি পার্টি হিসাবে কাজ করিবে, আগের মত গোটা মুসলিম জাতির প্রতিনিধিত্ব করিবে না। তদনুসারে মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্র ও নিয়মাবলী রচিত হইয়াছে।
প্রেসনোটে যে ‘ভুল সংবাদের’ কথা বলা হইয়াছে, তা সত্য-সত্যই লীগ নেতৃবৃন্দ তেমন ‘ভুল সংবাদ’ প্রচার করিতেছিলেন। ঐ সময় ২৫শে ফেব্রুয়ারি হইতে পাকিস্তান গণ-পরিষদের বৈঠক চলিতেছিল। সেই সমাবেশের সুযোগ লইয়া মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ দাবি করিতেছিলেন যে কায়েদে-আযম মুসলিম লীগ বজায় রাখিতে রাযী হইয়াছেন। কাজেই মুসলিম লীগ তখনও মুসলমানদের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এই দাবির রাজনৈতিক তাৎপর্য গুরুতর। পরিণামে এক দলীয় ফ্যাসিম আসিতে পারে। তাই স্বয়ং কায়েদে-আযম, মুসলিম লীগ আফিস হইতে নয়, গবর্নর-জেনারেলের দফতর হইতে, সরকারীভাবে ঐ ইশতাহার জারি করেন।
৫. কায়েদের নীতি পরিত্যক্ত
কায়েদে-আযম কর্তৃক প্রচারিত এই সরকারী প্রেসনোটে সকল বিতর্কের অবসান হওয়া উচিৎ ছিল। কন্তু হয় নাই। শাসকগোষ্ঠী মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ এবং সরকার-সমর্থক সংবাদপত্র সমূহ সকলেই এর পরেও মুসলিম লীগকেই পাকিস্তানের মুসলমানদের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান বলিয়া দাবি করিতে থাকেন। কাজেই মুসলিম লীগের বিরুদ্ধতা মানে পাকিস্তানেরই বিরুদ্ধতা, এ কথা বলিতে শুরু করেন। ক্রমে তাঁরা দাবি করিতে থাকেন, ইসলামের হেফাযতের জন্যই পাকিস্তানের আবির্ভাব। সুতরাং মুসলিম লীগের বিরুদ্ধতা মানে পাকিস্তানের বিরুদ্ধতা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধতা মানে ইসলামের বিরুদ্ধতা। ঐক্য, ঈমান ও শৃংখলাই ইসলাম কায়েদে আযমেরও বাণী। কাজেই পাকিস্তানে অপযিশন পার্টি মানেই পাকিস্তান ও ইসলামের দুশমনি। কথাটা এমন জমাইয়া তোলা হইল যে শহীদ সাহেব কনস্টিটিউশন্যাল অপযিশনের কথা ভোলায় এক ছুতায় গণপরিষদ হইতে তাঁর নাম কাটিয়া দেওয়া হয় এবং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খাঁ সাহেব সুহরাওয়ার্দী সাহেবকে ‘হিন্দুস্থানের লেলাইয়া-দেওয়া পাগলা কুত্তা’ বলিয়া গাল দেন। পাকিস্তানের তৎকালীন নেতৃত্বের মগজ কতটা খারাপ হইয়াছিল শহীদ সাহেবের মত পাকিস্তান-সংগ্রামের একজন সেনাপতিকে ‘পাগলা কুত্তা’ বলা হইতেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। গণতন্ত্র বিশ্বাস, জনগণে আস্থা, রাজনৈতিক সাহস ও দূরদর্শিতা একই আত্মবিশ্বাসের বিভিন্ন দিক। একটার প্রতি অনাস্থা ও সন্দেহ আসিলে বাকীগুলির প্রতিও সন্দেহ-অবিশ্বাস আসিবেই। এ সবের প্রতি সন্দেহ একটা সাংঘাতিক পিছলা ঢাল। সে ঢালে একবার বা পড়িলে সর্বনিম্নস্তরে যাইতেই হইবে। মুসলিম লীগ-নেতারা ক্রমে এবং দ্রুত এই ঢালের তলদেশে চলিয়া গেলেন। দেশবাসীকে ত বটেই খোদ মুসলিম লীগ কর্মীদেরেই অবিশ্বাস করিতে লাগিলেন। ১৯৪৮ সালে টাংগাইল উপনির্বাচনে তরুণ মুসলিম লীগ– কর্মী শামসুল হকের হাতে পরাজিত হইয়া পূর্ব-বাংলার সরকার ও সরকারী মুসলিম লীগ ঘরের কোণে আশ্রয় লইলেন। একে-একে পঁয়ত্রিশটি বাই-ইলেকশন স্থগিত রাখিলেন।
