দ্বিতীয় ঘটনা রাষ্ট্র ভাষার দাবি উত্থাপন। এটা লক্ষণীয় যে গৌড়াতে বাংলার দাবি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবি ছিল না। সে দাবি ছিল বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার দাবি। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কায়েদে-আযম পাকিস্তানের গভর্নর-জেনারেল হিসাবে পূর্ব-বাংলার সর্বপ্রথম সফরেই বলিয়া বসেন : ‘কেবল একমাত্র উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবে’। এতেই ব্যাপারটা জটিল আকার ধারণ করে। পূর্ব-বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাযিমুদ্দিন একটা আপোস করেন। কিন্তু কায়েদে আযমের মৃত্যুর পর তিনিই গভর্নর-জেনারেল হইয়া উন্টা মারেন। এটা না ঘটিলে কি হইত? বাংলাকে পূর্ব-বাংলার সরকারী ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করিলে এবং সম্ভব-মত উর্দুকেও পশ্চিম পাকিস্তানে ঐ স্থান দেওয়ার চেষ্টা করিলে ইংরাজী যথাস্থানে বর্তমানের মতই আসল রাষ্ট্র ভাষা এবং দুই পাকিস্তানের যোগাযোগের ভাষা থাকিয়া যাইত। বাংলা ও উর্দু ভাষা দুই অঞ্চলের সরকারী ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে প্রভূত উন্নতি করিয়া জাতীয় ভাষায় পরিণত হইত। ‘রাষ্ট্র ভাষা’ কথাটা চাপাই পড়িয়া থাকিত। রাষ্ট্রনায়কদের ভূলে অকালে রাষ্ট্র ভাষার কথাটা উঠিয়া না হক মারামারি খুনাখুনি হইয়াছে। এটাও অবশ্য একদিকে ভালই হইয়াছে। রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নটা চিরকালের জন্য ফয়সালা হইয়া গিয়াছে। এখন অতি ধীরে ধীরে বাংলা ও উর্দুকে সরকারী ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার যে শকগতির নীতি চলিতেছে, এটাও আর বেশি দিন চলিবে না বলিয়া আশা করা যায়।
১৭. আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা
আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা
সতরই অধ্যায়
১. ময়মনসিংহে সংগঠন
১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে আমি কলিকাতা ছাড়িয়া নিজ জিলা ময়মনসিংহে আসি। বেশ কিছুদিন ধরিয়া দুরন্ত আমাশয়ে ভুগিতেছিলাম। শরীরটা খুবই খারাপ যাইতেছিল। নিজের জন্মভূমি হইলেও মোহাজের। কাজেই রোজগারের জন্যই ওকালতিতে মনোযোগ দেওয়া দরকার। এ অবস্থায় স্থির করিয়াছিলাম সক্রিয় রাজনীতি হইতে কিছুদিন দূরে থাকিয়া অখণ্ড মনোযোগে ওকালতি করিব। রুও করিয়াছিলাম সেইভাবেই। কিন্তু কপাল-দোষে তা হইয়া উঠিল না। ঢেকি স্বর্গে গেলেও বাড়া বানে। আমার হইল তাই। মওলানা ভাসানী ও শহীদ সাহেব কয়েক দিনের মধ্যেই ময়মনসিংহে আসিয়া আওয়ামী লীগ সংগঠন কমিটি করিলেন। আমাকে তার সভাপতিত্বের দায়িত্ব গছাইলেন। বগা ফাঁদে পড়িল।
আওয়ামী লীগ বা যে-কোন সরকার-বিরোধী (অপযিশন) দল গঠন করা তৎকালে সহজ ছিল না। তার কারণ গণ-মন অপযিশন দলের জন্য প্রস্তুত ছিল না তা নয়। বরঞ্চ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একাধিক পার্টি থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গণ-মন বিশেষতঃ পূর্ব-বাংলার জনসাধারণ খুবই সচেতন ছিল। নয়া রাষ্ট্রে অহেতুক সরকার বিরোধিতা করিয়া ফর্মেটিভ মুতে কেউ পাকিস্তানের অনিষ্ট করিয়া না বসে, সেদিকেও জনগণের সজাগ নজর ছিল। সেজন্য পাকিস্তান-আন্দোলনের যাঁরা বিরোধিতা করিয়াছিলেন, তাঁদের কেউ অপযিশন পার্টি করিলে জনগণ অবশ্যই সন্দেহের চোখে দেখিত এবং সরকার তাতে বাধা দিলে জনগণের সমর্থন পাইতেন। কিন্তু ব্যাপারটা তেমন ছিল না। পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের আবশ্যিক প্রয়োজনে শহীদ সুহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর মত পাকিস্তান-সংগ্রামের প্রধান-প্রধান নেতারা যখন অপযিশন পার্টি গঠন করিতে চান, তখনও সরকার পক্ষ তাঁদের কাজে আইনী বেআইনী বাধা দান করেন। হিন্দুদের দ্বারা গঠিত অপযিশন পার্টির বিরুদ্ধে সরকার। পবু অতি সহজেই জনসাধারণের মনকে সন্দিগ্ধ করিয়া তুলিতে পারিতেন। ফলতঃ অনেক হিন্দু নেতার নিতান্ত সদিচ্ছাপ্রণোদিত সমালোচনাকেও সরকার ও সরকারী দলের লোকেরা দূরভিসন্ধিমূলক বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। এ সম্পর্কে সরকারী দলের কার্যকলাপ শুধু গণতন্ত্র-বিরোধীই ছিল না; পরিণামে পাকিস্তানের স্বার্থ বিরোধীও ছিল।
২. মুসলিম লীগের অদূরদর্শিতা
প্রথমতঃ, অদূরদর্শিতার ফলেই মুসলিম লীগের দরজা জনসাধারণের মুখের উপর বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। আমার নেতা ও তৎকালীন মনিব শহীদ সাহেবের মতের বিরুদ্ধে ‘ইত্তেহাদে’ আমি যে মুসলিম লীগ বজায় রাখিবার সুপারিশ করিয়াছিলাম, সেটা ছিল বিভাগ-পূর্ব কালের মতই প্রতিনিধিত্বমূলক মুসলিম লীগ। পাকিস্তানের আগে ও পরে একাধিক বার কায়েদে-আযম বলিয়াছিলেনপাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রূপ পাকিস্তানের জনগণই নিজ হাতে গঠন করিবে। মুসলিম লীগ সরকারই পাকিস্তানের কস্টিটিউশন রচনা করিবেন এ কথার মানেই জনগণ করিবে। সুতরাং পাকিস্তান হাসিলের সংগে সংগেই মুসলিম লীগের দরজা জনগণের মুখের উপর বন্ধ করিয়া দেওয়া শুধু রাজনৈতিক অপরাধ ছিল না, নৈতিক মর্যাল ও এথিক্যাল অপরাধও ছিল। নেতারা শুধুমাত্র কোটারি-স্বার্থ রক্ষার জন্য মুসলিম লীগকে পকেটস্থ করিলেন। এই কাজে তাঁরা প্রথম অসাধুতার আশ্রয় নিলেন বাংলা বাঁটোয়ারা হইয়াছে এই অজুহাতে বাংলার মুসলিম লীগ ভাংগিয়া দিয়া। কাজটা করিলেন তাঁরা এমন বেহায়া-বেশরমের মত যে পাঞ্জাব ভাগ হওয়া সত্ত্বেও পাঞ্জাবের মুসলিম লীগ ভাংগিলেন না। ফলে পক্ষপাতিত্ব-দোষে বামাল গেরেফতার হইলেন। দ্বিতীয় অসাধুতা করিলেন তাঁরা নিজেদের বাধ্য-অনুগত লোক দিয়া এডহক কমিটি গঠন করিয়া। তৃতীয় অসাধু কাজ করিলেন নয়া মুসলিম লীগ গঠনের জন্য প্রাইমারি মেম্বারশিপের রশিদ বই বগলদাবা করিয়া। মুসলিম লীগ কর্মীদের পক্ষে জনাব। আতাউর রহমান খাঁ ও বেগম আনোয়ারা খাতুন প্রথমে মওলানা আকরম খাঁ ও পরে চৌধুর খালিকুয্যামানের কাছে দরবার করিয়াও রশিদ বই পান নাই। তাঁরা নাকি স্পষ্টই বলিয়াছিলেন, এখন তাঁরা আর লীগের বেশি মেম্বর করিতে চান না। তাদের যুক্তি ছিল, এখন শুধু গঠনমূলক কাজ দরকার। হৈ হৈ করিলে তাতে কাজের বিঘ্ন সৃষ্টি হইবে। এসব কথা আমি কলিকাতা বসিয়া খবরের কাগযে পড়িয়াছিলাম। নিজের কাগ্য ‘ইত্তেহাদে’ এই অদূরদর্শিতার কঠোর নিন্দা করিয়াছিলাম। বলিয়াছিলাম, যে সব দেশে একদলীয় শাসন চালু আছে, সেখানেও রুলিং পার্টির দরজা এমন করিয়া বন্ধ করা হয় নাই। লীগ-নেতৃত্বের এই মনোভাব ছিল অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক। কায়েদে-আযমের জীবমানেই শাসকগোষ্ঠী ও তাঁদের সমর্থক এই নীতি অনুসরণ করিয়াছিলেন দেখিয়া আমার মনে কম ধান্ধা লাগে নাই। তবে কি মুসলিম লীগ নেতারা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের পন্থা অনুসরণ করিতেছেন? কমিউনিস্ট বা ফ্যাসিস্ট ইত্যাদি বিপ্লবী পার্টির সাংগঠনিক জোট ঐক্য ও শক্তির জন্য এবং নেতৃত্বের নিরাপত্তার খাতিরে অনেক সময় সাবধানতা অবলম্বনের দরকার হয়। পার্টি-আদর্শের বিরোধী লোকেরা নিতান্ত গণতান্ত্রিক উপায়ে পার্টিতে ঢুকিয়া বিভীষণ পঞ্চম বাহিনীর কাজ করিতে পারে। সেজন্য পার্টির এক্সেসিভ গ্রোথের ‘অতিরিক্ত বৃদ্ধির’ বিরুদ্ধে ঐ সব পার্টি হুশিয়ার থাকে। কিন্তু মুসলিম লীগ তেমন ফ্যাসিস্ট পার্টি ছিল না। কাজেই ঐ সাবধানতার কোনও দরকারও তার ছিল না। অগত্যা মুসলিম লীগ কর্মীরা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে প্রথমে নারায়ণগঞ্জে ও পরে টাঙ্গাইলে কমী-সম্মিলনী করিয়া নেতাদের কাজের তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং মুসলিম লীগের দরজা খুলিয়া দিবার দাবি করেন। নেতারা কর্ণপাত না করায় ১৯৪৯ সালে কর্মীরা নিজেরাই মুসলিম লীগ গঠন করেন। সরকারী মুসলিম লীগ হইতে পার্থক্য দেখাইবার জন্য তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নাম রাখিলেন? জনগণের (আওয়ামী) মুসলিম লীগ। আমি কলিকাতা থাকিতেই এসব ঘটিয়াছিল এবং ‘ইত্তেহাদের’ পুরা সমর্থন পাইয়াছিল। কাজেই ময়মনসিংহে যখন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের কাজ হাতে নিলাম, তখন মতের ও মনের দিক দিয়া নয়া কোনও কাজ করিলাম না।
