মোহাজের-পুনর্বাসন-সমস্যা পশ্চিম বাংলা বা ভারতের চেয়ে পূর্ব-বাংলা বা পাকিস্তানের জন্য অধিকতর বিপজ্জনক গুরুত্ব সমস্যা, এটা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের কথা। পাকিস্তান নয়া রাষ্ট্র। অর্থনীতি ও শাসনযন্ত্র সকল ব্যাপারেই তাকে একেবারে শুরু হইতে শুরু করিতে হইতেছিল। তার উপর পূর্ব-বাংলা ঘনবসতিপূর্ণ ক্ষুদ্র ভৌগোলিক ইউনিট। পূর্ব-বাংলার এক কোটি হিন্দুর সব তাড়াইয়াও পশ্চিম বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা ও বিহারের আড়াই কোটি মুসলমানের স্থান হইবে না। আর এদের পুনর্বাসনের ত কথাই উঠে না। সাত কোটি (তৎকালে) লোকের দেশ পাকিস্তান ভারতে-ফেলিয়া-আসা চারকোটি মুসলমানকে জায়গা দিতে পারিবে না। অথচ পাকিস্তানের দেড়কোটি হিন্দুর স্থান করা বিশাল ভারতের জন্য মোটেই কঠিন ছিল না। বাস্তু-ত্যাগের আনুষংগিক অমানুষিক দুরবস্থা ছাড়াই এটা তার বাস্তব ভয়াবহ দিক। এইজন্য পাকিস্তানের পক্ষে বাস্তু-ত্যাগ এড়ানো ছিল বেশি প্রয়োজন। এ কাজটিতেই শহীদ সাহেব তাই আগে হাত দিয়াছিলেন। তিনি পশ্চিম-বাংলার গবর্নর ডাঃ কাটজু ও প্রধানমন্ত্রী ডাঃ প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষকে এই কারণেই পূর্ব-বাংলা সফরে অনুপ্রাণিত করিয়াছিলেন। পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাযিমুদ্দিন ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে দিয়া পশ্চিমবাংলা সফরের আয়োজনও তিনি করিতেছিলেন।
৮. পূর্ব-বাংলা সরকারের কুযুক্তি
কিন্তু পূর্ব-বাংলা সরকার শহীদ সাহেবকে ভুল বুঝিয়াছিলেন। শহীদ সাহেবের মত জনপ্রিয় নেতা পূর্ব-বাংলা সফর করিলে তৎকালীন রাষ্ট্র নায়কদের অসুবিধা হইবে, এটা ছিল তাঁদের মনের ভিতরের কথা। কিন্তু তাঁরা প্রকাশ্যভাবে যে কথাটা বলিলেন, সেটাও ছিল ভুল। তাঁরা বলিলেন : শান্তি-সেনা লইয়া শহীদ সাহেবের পূর্ব বাংলা সফরের তাৎপর্য হইবে এই যে, পূর্ব-বাংলাতেই সাম্প্রদায়িক অশাস্তি ও দাঙ্গা। চলিতেছে বেশি। এতে পূর্ব-বাংলা সরকারের তথা পাকিস্তান সরকারের বদনাম হইবে। কথাটা স্থূল দৃষ্টিতে এবং আপাতঃদৃষ্টিতেই সত্য। আসলে সত্য নয়। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে পূর্ব-বাংলায় অন্যান্য স্থানের তুলনায় সাম্প্রদায়িক দাংগা খুবই কম হইয়াছিল। এরূপ হয় নাই বলিলেও চলে। কিন্তু একটু তলাইয়া দেখিলেই বোঝা যাইবে যে পূর্ব-বাংলার হিন্দুদের মধ্যে বাস্তু-ত্যাগের হিড়িক পড়িয়াছিল। সাম্প্রদায়িক দাংগার ভয়ে নয়। অন্য কারণে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রনায়ক ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের অন্তঃসারশূন্য ইসলামী রাষ্ট্র ও শরিয়তী শাসনের শ্লোগানে হিন্দুরা সত্যই ঘাবড়াইয়াছিল। জানের ভয়ে নয় মানের ভয়ে। ধর্ম ও কালচার হারাইবার ভয়ে। অর্ধশতাব্দী ধরিয়া যে হিন্দুরা দেশের আযাদির জন্য জান-মাল কোরবানি করিয়াছে, স্বাধীন হওয়ার পর তারাই নিজের ধর্ম ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি লইয়া সসম্মানে দেশে বাস করিতে পারিবে না, এটা মনের দিক হইতে ছিল তাদের জন্য দুঃসহ। হিন্দু সভা ও জন-সংঘের হিন্দুরাজ ও শুদ্ধির শ্লোগান তারতীয় মুসলমানদের মনে যে স্বাভাবিক ত্রাসের সৃষ্টি করিয়াছিল পাকিস্তানের হিন্দুদের মনেও গোড়ার দিকে এমনি ত্রাসের সঞ্চার হইয়াছিল। এটা দূর করিয়া তাদের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ সৃষ্টি করাই ছিল তৎকালীন আশু কর্তব্য। পাকিস্তানের রাষ্ট্রনায়করা শুধুমাত্র দাংগা-হাংগামাহীন শান্তি স্থাপন করিয়াই মনে করিয়াছিলেন তাঁদের কর্তব্য শেষ হইল। হিন্দু-মনে নৈতিক শান্তি আনিবার কোনও চেষ্টাই তাঁরা করেন নাই। একদিকে তাঁদের এই কাজ, অপর দিকে ভারতে প্যাটেলী মনোভাব ও নীতি উভয় দেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিকে জটিলতর করিয়া কিভাবে স্পিরিট-অব-পার্টিশনকে ব্যর্থ করিয়া দিয়াছে এটা পরবর্তী কালের ইতিহাস। এইভাবে স্পিরিট-অব-পার্টিশনকে ব্যর্থ করিয়া প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িক সমস্যাটিকে আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসাবে অধিকতর শক্তিশালী করিয়া জিয়াইয়া না রাখিলে শিল্প-বাণিজ্য, কৃষি-সেচ যোগাযোগ ও যাতায়াত-ব্যবস্থায় উভয় দেশকে অর্থনৈতিক দিকে কত উন্নত করা যাইত, এই বিশ বছরে সে কথা দুই দেশের বর্তমান নেতারা বুঝিতে না পারিলেও তাঁদের ভবিষ্যৎ বংশধরেরা বুঝিতে পারিবে নিশ্চয়ই।
৯. আওয়ামী লীগের আবির্ভাব
এই মুদ্দতের অপর দুইটি বিশেষ ঘটনার একটি পূর্ব-বাংলায় ‘জনগণের মুসলিম লীগ’ অর্থাৎ আওয়ামী মুসলিম লীগের পত্তন। দ্বিতীয়টি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির উন্মেষ। দুইটাই রাষ্ট্রনায়কদের ভ্রান্ত নীতির ফলে ত্বরান্বিত হইয়াছিল। বংগীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিল ভাংগিয়া দিয়া সরকার-সমর্থকদের দিয়া এড-হক কমিটি গঠন করা হয়। এইভাবে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দরজা জনসাধারণের মুখের উপর বন্ধ করিয়া দেওয়ায় মুসলিম লীগ-কর্মীদের সামনে আর কোনও পথ খোলা থাকে নাই। তাই তারা জনগণের মুসলিম লীগ গঠন করিয়াছিল। এটা অবশ্য পরিণামে ভালই হইয়াছিল। ছাত্র-কর্মী ও জনগণের সাহায্যপুষ্ট মুসলিম লীগ দেশ শাসনের সুবিধা পাইলে পাকিস্তানের একদলীয় শাসন কায়েম হইয়া যাইত। সাত বছরের মধ্যে ১৯৫৪ সালে যেভাবে মুসলিম লীগের পতন ঘটিয়াছিল, সে অবস্থায় ওটা হইতে পারিনা।
১০. রাষ্ট্র-ভাষা দাবি
