কংগ্রেসের মতই মুসলিম লীগও দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক শাসন চাহিয়াছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক স্বাধীন ভারতে স্বভাবতঃ এবং ন্যায়তঃ যে হিন্দু-মেজরিটি শাসন হইবে, এতে মুসলমানরা নিজেদেরে নিরাপদ মনে করিতে পারে নাই। তাই বলিয়া দেশপ্রেমিক স্বাধীনতাকামী মুসলমানরা হিন্দু-মেজরিটি শাসন এড়াইবার উদ্দেশ্যে ভারতের স্বাধীনতা ঠেকাইয়া রাখিতে ইংরাজকে সাহায্য করিতেও রাযী হয় নাই। এটাই জিন্না-নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য। তিনিই প্রথম হিন্দু ভাইকে বলিলেন : ‘চল, পৃথকভাবে তুমিও শাসন কর, আমিও শাসন করি।‘ ইংরাজকে তিনি বলিলেন : ‘ডিভাইড এণ্ড কুইট’। হিন্দু-নেতৃত্ব এতে রাযী হইলেন। ইংরাজ-সরকার তা মানিতে বাধ্য হইলেন। এরই ফলে বিনা-ব্রাদম-এওয়াজে দেশ ভাগ ও দুই রাষ্ট্র হইয়াছে। এটাই স্পিরিট-অব-পার্টিশন। আপোসে দুই রাষ্ট্র সৃষ্টিতে আসলে হিন্দু ও মুসলিম উভয় নেতৃত্বের জয়ই সূচিত হইয়াছে।
কিন্তু জনতার হৈ-চৈ-এর কানতালা-লাগা আবহাওয়ায় দুই পক্ষই পরে এটাকে যার-তার পরাজয় মনে করিলেন। হিন্দু-নেতৃত্ব তা করিলেন ভারত-মাতা দ্বিখণ্ডিত হওয়া মানিয়া নিতে হইল বলিয়া; মুসলিম নেতৃত্ব তা করিলেন ‘পোকায় খাওয়া কাটা-ছিঁড়া’ পাকিস্তান নিতে হইল বলিয়া। দুইপক্ষের চোখেই সেই যে ছানি পড়িল সেটা ভাল হওয়ার বদলে দিন-দিন বাড়িয়াই চলিল। মহান দুই জাতির পিতৃদ্বয়ের অকালমৃত্যুতে সে স্পিরিটের কথা নেতারা ভুলিয়া গেলেন। ফলে এই স্পিরিট কোথায় কিভাবে লংঘিত হইয়াছে এবং তার কি কি কুফল হইয়াছে, সে সব কথা যথাস্থানে বলা হইবে।
৭. পশ্চিমবাংলা সরকারের সুবুদ্ধি
এখানে স্পিরিট-অব-পার্টিশনের এত বিস্তারিত উল্লেখ প্রয়োজন হইয়াছে এই জন্য যে আলোচ্য মুদ্দতে আমার জ্ঞানের মধ্যে শুধু পশ্চিম-বাংলা সরকারই কাজে কর্মে এই স্পিরিট বজায় রাখিয়া চলিয়াছিলেন। এই স্পিরিটের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিক বাস্তু-ত্যাগ রোধ করা। অন্যান্য জায়গার মত দুই বাংলাতেও বাস্তু ত্যাগের হিড়িক চলিয়াছিল। ছয়-সাত বছর ধরিয়া যে প্রচার-প্রচারণা চলিয়াছিল, যেরূপ বিষাক্ত আবহাওয়া তাতে সৃষ্ট হইয়াছিল, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সে মনোভাবের যে বাস্তবরূপ দেখা দিয়াছিল, তার পরে শেষের ছয় মাসেই এই মহান স্পিরিট নেতৃবৃন্দ গ্রহণ করেন। কিন্তু গণ-মন এই স্পিরিট গ্রহণ করিতে পারে নাই স্বাভাবিক কারণেই। গণ-মনে এই উপলব্ধি ঘটাইবার জন্য প্রচুর ও ব্যাপক প্রচার-প্রপাগাণ্ডার দরকার ছিল। পশ্চিম-বাংলা সরকার ও জনাব শহীদ সুহরাওয়ার্দী এই মহান কাজটিই শুরু করিয়াছিলেন। ডাঃ প্রফুল্ল ঘোষ ও ডাঃ বিধান রায়ের প্রধান মন্ত্রিত্বের আমলে তাঁদের সহকর্মী মন্ত্রীদের সমবেত চেষ্টায় এই নীতিই চলিয়াছিল। আমাকে এবং অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দকে তাঁরা সরকারী সাহায্যে সরকারী জীপ গাড়িতে পুলিশের সহযোগিতায় মুসলিম এলাকাসমূহে সফর করাইয়াছেন। কোনও কোনও স্থানে হিন্দু মন্ত্রী ও নেতারা আমাদের সাথে গিয়াছেন। সর্বত্র একই কথা বলা হইয়াছেঃ ‘এ দেশ আপনাদের। বা ত্যাগ করিবেন না। আপনাদের নিরাপত্তার সর্বপ্রকার ব্যবস্থা করা হইয়াছে।
শহীদ সাহেবও ঠিক এই কাজটিই করিতেছিলেন। তিনি শুধু অল-ইণ্ডিয়া মুসলিম কভেনশন ডাকিয়া এই বাণীই প্রচার করেন নাই। তিনি শুধু মাইনরিটি চার্টার রচনা করিয়া উভয় সরকারের তাতে দস্তখত লইবার চেষ্টাই করেন নাই। তিনি শান্তি সেনা গঠন করিয়া উভয় বাংলায় ব্যাপক সফরের আয়োজনও করিয়াছিলেন। তিনি প্রথমে পূর্ব-বাংলা সফরে আসেন। এর অপরিহার্য আশু কারণ ছিল। পূর্ব বাংলার হিন্দুদের মধ্যেই বাস্তু-ত্যাগের হিড়িক পড়িয়াছিল বেশি। এটা ঠেকাইতে না পারিলে এই সব বাস্তুত্যাগীর চাপে পশ্চিম বাংলার মুসলমানদের জীবন অতিষ্ঠ হইয়া পড়িবার সম্ভাবনা ছিল। এই হিড়িক কমাইবার জন্যই পূর্ব-বাংলার হিন্দুদের ত্রাসের ভাব দূর করার ও নিরাপত্তা-বোধ সৃষ্টি করার দরকার ছিল। অবস্থা-গতিকে পূর্ব-বাংলার হিন্দুরা কেবল হিন্দু নেতৃবৃন্দের মুখের কথাতেই তেমন সান্ত্বনা পাইতে পারিত। সেজন্য শহীদ সাহেব তার শাস্তি সেনায় দেবতোষ দাশগুপ্ত, দেব নাথ সেন, সুব্রত রায় প্রভৃতির মত জনপ্রিয় হিন্দু নেতাদেরে লইয়াই শান্তিবাহিনী গঠন করিয়াছিলেন। একটু ধীরভাবে তলাইয়া বিচার করিলেই দেখা যাইবে, এটা পশ্চিমবাংলা বা ভারতের চেয়ে পূর্ব-বাংলা বা পাকিস্তানের জন্যই বেশি আবশ্যক ও উপকারী ছিল। মোহাজের সমস্যাটা শুধু আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের জন্য একটা অর্থনৈতিক বোঝা এবং পুনর্বাসনের রাজনীতির পাশবর বিপুল দায়িত্বই নয়। মোহাজের মোহাজের বাড়ায়। এক দেশ হইতে বাস্তু-ত্যাগী আসিয়া অপর দেশে বাস্তু-ত্যাগী বানায়। বাস্তু-ত্যাগীদের সত্য-সত্যই অনেক অভিযোগ থাকে বটে, কিন্তু নিজেদের বাস্তু-ত্যাগ জাস্টিফাই করিবার উদ্দেশ্যে তারা অনেক মিথ্যা গুজব ও গালগল্পও তৈয়ার করে। ফলে মোহাজের-অধ্যুষিত অঞ্চলেই সাম্প্রদায়িক তিক্ততা চরমে উঠে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব দাঙ্গা উস্কানীমূলক একতরফা হয়। মোহাজেররাই উভয় বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বেশির ভাগ ঘটাইয়াছিল, এটা আজ সাধারণ অভিজ্ঞতা।
