অপর দিকে, দেশের এক-চতুর্থাংশ অধিবাসী দশ কোটি মুসলমান। সংখ্যায় তুলনায় কম হইলেও ধর্মীয় ও সামাজিক সাম্যে যেথিত ঐক্যে শক্তিমান। মাত্র দেড়শ’ বছর আগে দীর্ঘ সাড়ে ছয়শ বছর ধরিয়া এরা গোটা উপমহাদেশে সগৌরবে প্রবল প্রতাপে শাসন করিয়াছে বিদেশী দখলকারী শক্তি হিসাবে নয়, দেশবাসী হিসাবে। এটা করিয়াছে তারা বিপ্লবাত্মক সাম্য-ভিত্তিক মানবাধিকারে নয়া জীবন-বাণীর পতাকাবাহী এক নবজাগ্রত বিশ্ব-মুসলিমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে। নয়াযিন্দেগির এই পতাকাবাহীরা পুরা এক হাজার বছর ধরিয়া গোটা এশিয়া-আফ্রিকা ও ইউরোপের উপর অখণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করিয়াছে। বিজ্ঞান-দর্শন-সাহিত্যে শিল্পে স্থাপত্যে এরা সারা বিশ্বে সভ্যতার শিক্ষকতা করিয়াছে। এই উপমহাদেশকে এরা কৃষ্টি-শিলে, আটে-স্থপতিতে কাব্যে-সংগীতে তৎকালীন সভ্য জগতের শীর্ষ স্থানে উন্নীত করিয়াছে। গিয়াসুদ্দিন বুলবন, আলাউদ্দিন খিলজী, শেরশাহ, আকবর, শাহজাহান, আওরংজেব, হুসেন শাহ, ইলিয়াস শাহের মত সুশাসকের ও আমির খসরু-তানসেনের মত কবি-শিল্পীর জন্ম দিয়াছে এরাই। ইতিহাসের পাতা এদের এমনি উজ্জ্বল।
এরা উভয়ে আজ ইংরেজের পদানত সত্য, কিন্তু পুনরুজ্জীবনের স্বপ্নে পুনর্জাগরণের উদ্যমে উভয়েই তন্ময় ও উদ্দীপ্ত। এক দিকে হিন্দুরা উনিশ শতকের ইউরোপের নবজাগরণের আলোকচ্ছটায় জাগ্রত, রাজা রাম মোহন রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ ও দয়ানন্দের অনুপ্রেরণায় ধর্মীয় রিভাইভ্যালের উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত, বংকিম-রবীন্দ্রনাথের প্রেরণায় ইউরোপীয় আট-সাহিত্যে নব-দীক্ষিত, নওরোজী গোখেল-তিলক-সুরেন্দ্রনাথ-চিত্তরঞ্জন-গান্ধী-নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার বাণীতে উদ্বুদ্ধ; স্বাধীকার প্রতিষ্ঠায় প্রাণ বিসর্জন দিতে এদের হাজার হাজার তরুণ প্রস্তুত। যে-কোনও প্রতিবন্ধক নির্মূল করিতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
মুসলমানরাও আজ জাগ্রত। শাহ উয়ালি উল্লা-সৈয়দ আহমদ শহীদ-সার সৈয়দের শিক্ষায় তারা অনুপ্রাণিত। ওহাবী বিপ্লব, সিপাহী যুদ্ধ ও খিলাফত-আন্দোলনের মধ্যে তাদের আত্ম-প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সংকল্প পরিস্ফুট।
এই নব জাগ্রত, নয়া জীবন-বাণীতে প্রবুদ্ধ, দুই মহাজাতি স্বভাবতঃই যার তার পূর্ব-গৌরবের স্বর্ণ-স্মৃতির দিকেই তাকাইয়া আছে। যার-তার সেই ঐতিহ্যের রেনেসাঁতেই তাদের ভবিষ্যৎ মুক্তি ও উন্নতি নিহিত, এই সত্য স্বভাবতঃই তারা উপলব্ধি করিয়াছে। এ উপলব্ধি লজ্জার নয় গৌরবের। কাজেই তাতে প্রতিবন্ধকতা করা সম্ভবও ছিল না, উচিতও হইত না। বিজ্ঞানোন্বত বিশ শতকের বিশ্বব্যাপী নব চেতনায় উদ্বুদ্ধ নব্য-হিন্দুত্ব স্বাধীন ভারতের মানস-সরোবরে একটি ফুটনোম্মুখ পদ্মফুল। ঐ একই চেতনায় প্রবুদ্ধ বিশ্ব-মুসলিমের অবিচ্ছেদ্য অংশ রেনেসাঁর আযানে উদ্দীপিত ভারতীয় ইসলামী জাগরণ মুসলিম-তারতের গুলবাগিচায় একটি ফুটনোখ গোলাপ। উভয়টাই গণতন্ত্রের শুভ বাণী। বিশ্ব সভ্যতার নবীন রূপে অবদান করিবার মত সম্ভাবনা উভয়ের মধ্যেই প্রচুর। অতএব একদিকে অখণ্ড ভারতের মাথা-গুনতির একঢালা গণতান্ত্রিক মেজরিটি শাসনের বিশ্বভারতীর নামে। ইফুটনোম্মুখ গোলাপ ফুল, অপর দিকে প্যান-ইসলামিক বিশ্ব-মুসলিম হেগিমনির নামে ঐ ফুটনোম্মুখ পদ্মফুল, নিষ্পেষিত করার চেষ্টা সফলও হইত না; বিশ্ব মানবের জন্য সাধারণভাবে, ভারতবাসীর জন্য বিশেষভাবে, কল্যাণকরও হইত না।
তাই মানবকল্যাণের স্বর্গীয় ইংগিতে-অনুপ্রেরিত মহান নেতৃদ্বয় মহাত্মা গান্ধী ও কায়েদে-আযম জিন্না তাঁদের সুযোগ্য দূরদশী সহকর্মীদের সহযোগিতায় এই মহাভারতে দুইটি মহান আদর্শকেই স্বাধীনভাবে মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করিবার স্থান করিয়া দিয়াছেন। ইহাই দেশ-বিভাগের মূল কথা। এটাই নয়া দুনিয়ার ‘পিসফুল কো-একযিস্টেসের’ শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের জীবন-বাণী। এটাই স্পিরিট–অব-পার্টিশন।
এইভাবে একটা হিন্দু-প্রধান ও একটা মুসলিম-প্রধান রাষ্ট্র কায়েম হইল বটে, কিন্তু উভয় পক্ষ হইতে একত্রে এবং পৃথকভাবে ঘোষণা করা হইল : ‘হিন্দু মুসলমান কংগ্রেসী-মুসলিম লীগার যে-যেখানে আছে, সেইখানেই থাকিয়া যাও।’ এ কথার সোজা অর্থ এই যে দুইটা রাষ্ট্র হইল বটে, কিন্তু উভয়টাতে হিন্দু-মুসলমানের সমান অধিকার। আরও সোজা কথায়, দুইটার একটাও শুধু হিন্দুর দেশও নয়, শুধু মুসলমানের দেশও নয়। দুইটাই আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশ।
৬. সমাধান হিসাবে
এইভাবে নেতারা যে দুইটা রাষ্ট্র সৃষ্টি করিয়াছিলেন, স্পষ্টতঃই তা ছিল হিন্দু মুসলিম সমস্যার মীমাংসা হিসাবেই। হিন্দু-মুসলিম সমস্যার সমাধানের একশ একটা উপায় ছিল। সে সব পন্থায় সমাধানের চেষ্টাও বছরের পর বছর ধরিয়া চলিয়াছিল। অবশেষে ‘দুই রাষ্ট্র’ পন্থাটাই নেতাদের কাছে উভয় জাতির কাছে, গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হইয়াছিল। তাই তাঁরা টেবিলে বসিয়া এই সমাধান গ্রহণ করিয়াছিলেন। সমাধানটা বাস্তবানুগ যেমন হইয়াছিল, অভিজ্ঞতার দ্বারা তেমনি ইহা সমর্থিতও হইয়াছিল। এটা যেন রাষ্ট্রনেতাদের জন্য ছিল প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের সম্প্রসারণ। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনে বাংলার মুসলমানরা ও বিহারের হিন্দুরা গবর্নমেন্ট চালাইয়াছে। তাই বলিয়া বাংলার হিন্দুরা ও বিহারের মুসলমানরা যার-তার অধিকার হারায় নাই। এই নযিরে স্বায়ত্তশাসন প্রসারিত করিয়া ভারতে একটা হিন্দুস্থান একটা পাকিস্তান নামে দুইটা স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করিলে চলিবে নিশ্চয়ই।
