কথিত আছে বিভাণ্ডক মুনির তপস্যা ভঙ্গ করতে দেবরাজ ইন্দ্র স্বৰ্গবেশ্যা উর্বশীকে পাঠালে উর্বশী মুনিকে প্রেমজালে আবদ্ধ করেন ও মুনির ঔরসে উর্বশীর গর্ভে ঋষ্যশৃঙ্গ জন্মায়। পুত্রের জন্মের পর স্বর্গের বেশ্যা (অপ্সরা) স্বর্গে ফিরে গেলে বিভাণ্ডকের খুব ক্ৰোধ জন্মায়। তাই সে নিজের পুত্রকে নারীদের সংস্রব থেকে দূরে রাখার জন্য এক নির্জন ও গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেন। সেই থেকে ঋষ্যশৃঙ্গ একা বেড়ে ওঠে প্রকৃতির কোলে। রোমপাদ একবার এক ব্রাহ্মণকে অপমান করায় সে তাকে অভিশাপ দেয় যে রাজ্যে খরা নেমে আসুক। তখন শান্তা অনেক অনুনয় করলে ব্রাহ্মণ বলেন যে জন্মের পরমূহুর্ত থেকে যে পুরুষ কোনো নারীকে দর্শন করেনি সে যদি অঙ্গরাজ্যে এসে শান্তাকে বিবাহ করে তবেই বৃষ্টি নামবে। ফলে অনেক তপস্যা ও কষ্ট স্বীকার করে শান্তা ঋষ্যশৃঙ্গকে পরিণয় করে ও অবশেষে ব্রাক্ষ্মণের অভিশাপ থেকে রাজ্যকে রক্ষা করেন। শুধু রামায়ণে নয়, মহাভারত-পুরাণগুলিতে অবশ্য এরকম অজাচার সম্পর্কের কাহিনি পাওয়া যায়। বৌদ্ধ দশরথজাতকে তো রাম সীতা একে অপরের ভাই-বোন। এই রামায়ণে দশরথ অযোধ্যা নয়, বারানসীর রাজা। রাম পণ্ডিত, লক্ষ্মণ পণ্ডিত এবং সীতা দশরথের বড়ো রানির গর্ভে জন্ম নেন। বড়ো রানির মৃত্যু হলে দশরথ পুনরায় বিয়ে করেন এবং সেই নতুন রানির আবদারে ভাই-বোনদের হিমালয়ে নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য হন। অবশ্য বৌদ্ধদের রামায়ণে বানর নেই, মুনিঋষি নেই, রাবণ নেই, সীতার অপহরণও নেই। এ রামায়ণে হিমালয়ের নির্বাসন জীবন কাটিয়ে বারানসী ফিরে রাম রাজা হন, সীতা রানি হন। জাতক অনুসারে সীতা একদিকে রামের সহদোরা, অপরদিকে ভার্যাও। আবার অন্য এক রামকাহিনিতে পাওয়া যায় সীতা মন্দোদরীর কন্যা, মন্দোদরীর কন্যা হলে তো রাবণেরও কন্যা। যদি তাই-ই হয় তবে কি রাবণ সীতাকে ধর্ষণ করেছেন এ সন্দেহ ন্যায্যত হয়? সেযুগে হয়তো হত, না-হলে রাম সন্দেহ করবেন কেন! তবে অবশ্য রামায়ণে ঋষ্যশৃঙ্গ ঋষির ভূমিকা আর বিশেষ কিছু নয়। রামজন্মের পর কোনো ঘটনাতেই এই ঋষির উল্লেখ করা হয়নি। সেটার একটা কারণে হতে পারে–চিত্রনাট্যের ডিমান্ডে শান্তাকে বিয়ে এবং রামের জন্ম যে উপায়ে হয়েছে, সেটা কবি চাননি মানুষ মনে রাখুক। তাই হয়তো ঋষ্যশৃঙ্গকে আর ফিরিয়ে আনা হয়নি। শান্তাকেও বিশেষ কেউ মনে রাখেনি।
মন্থরা : দশরথ যে অত্যন্ত গোপনে রামের রাজ্যাভিষেকের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সে কথা যেভাবেই হোক মন্থরার মাধ্যমে অন্দরমহলের কৈকিয়ের কাছে পৌঁছে যায়। দশরথের পরিকল্পনাকে কেঁচিয়ে দিতে দশরথের কাছ থেকে বর চাওয়ার ব্যাপারটা কৈকেয়ীকে মনে করিয়ে দেন মন্থরাই। রাজপ্রাসাদের ভিতরে রাম ও ভরতের বিভাজন–রাজনীতিটা মন্থরাও জানতেন, সেইজন্যই কৈকেয়ীর কানে মন্ত্র দেওয়ার সাহসটা তিনি পেয়েছেন।
মন্থরা হলেন রাজা দশরথের স্ত্রী রানি কৈকেয়ীর বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা কুজা দাসী। তিনি বিকৃতাকার, বক্ৰদেহা, ঈর্ষাপরায়ণা এবং কূটবুদ্ধিসম্পন্না ছিলেন। কুমন্ত্রণা দানে নিপুণ হলেও তিনি কৈকেয়ীর প্রকৃত হিতৈষী ছিল। স্বৰ্গবেশ্যাদের নৃত্যের সঙ্গে এঁরা বাদ্যযন্ত্রাদি বাজাতেন ও গাইতেন। হাহা, হুহু, চিত্ররথ (অঙ্গারপর্ণ), হংস, বিশ্বাবসু, গোমায়ু, নন্দি, তুম্বুরু ও মাদ্য–গন্ধর্ব হিসেবে প্রসিদ্ধ। গন্ধর্বীদের মধ্যে কুম্ভীনসী (অঙ্গারপর্ণের পত্নী), দুন্দভী (ইনিই মন্থরা’ নাম নিয়ে পিঠে কুঁজ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন দশরথপত্নী কৈকেয়ীকে কুমন্ত্রণা দিয়েছিলেন)। কুজা মন্থরা কৈকেয়ীর মাতৃসমা, আবার ভরতের ধাত্রীমাতাও। কেকয়রাজ অশ্বপতির স্নেহভাজন গুপ্তচরী। মন্থরা প্রিয়ভাষিণী কৌতুকপ্রিয়া, এক আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। রঙ্গকৌতুকে রাজপ্রাসাদের প্রতিটি মানুষকেই সহজেই আপন করে নিয়েছিলেন। গোপন সংবাদ সংগ্রহের জন্যে যে সকলেরই প্রয়োজন! মন্থরা অতি সুচতুর রাজনীতিক, ক্ষুরধার বুদ্ধিমতী ধৈর্যশীলা এবং চারুদর্শিনী। দশরথ জ্যেষ্ঠপুত্র রামকে রাজ্যাভিষিক্ত করতে চাইলে কৈকেয়ীকে মন্থরা নানাভাবে উত্তেজিত করতে থাকে। প্রথমদিকে কৈকেয়ী এসবে কান না দিলেও অবশেষে মন্থরার যুক্তিতে তাঁর বুদ্ধি নাশ হয়। তিনি কৈকেয়ীকে মনে করিয়ে দেন দশরথ শম্বুরাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে আহত হলে কৈকেয়ী তাঁকে রণভূমি থেকে সরিয়ে এনেছিলেন এবং সেবা দিয়ে সুস্থ করেছিলেন। তখন দশরথ তাঁকে একই সঙ্গে দুটি বর দিতে রাজি হয়েছিলেন। এখন সেইসময় উপস্থিত হয়েছে, তাঁর উচিত প্রথম বরে ভরতকে রাজ্যে অভিষিক্ত করা এবং দ্বিতীয় বরে রামকে চোদ্দো বছরের জন্য বনবাসে পাঠানো। রাম বনের পথে লক্ষ্মণ ও সস্ত্রীক যাত্রা করলে ভরতের উপস্থিতিতে শত্রুঘ্নর হাতে লাঞ্ছনার পর মন্থরার আর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। অথচ মন্থরাই রামকথার অন্যতম নিয়ন্ত্রকই ছিলেন। কৈকেয়ী তো বরের কথা ভুলেই গিয়েছিল। মন্থরাই মনে করিয়ে দিয়েছে উপর্যুপরি কান ভাঙানিতে। মন্থরা যে মন্ত্র কৈকেয়ীর কানে দিয়েছিলেন, তা দশরথ নিজের মুখে রামকে বলতে পারেননি। কৈকেয়ীর মুখ থেকে সব শুনে রাম বনবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শুধু পিতৃসত্য পালনই নয়, বিমাতার মনোবাঞ্ছাও পূরণ করেছেন রামচন্দ্র।
